তসলিমাকে খোলা চিঠি এবং রোহতকের দুঃস্বপ্ন

0

নৈরঞ্জনা:

তসলিমা আমার বহুদিনের একতরফা প্রেম। তখন বছর পনের বয়েস, মা আর মাসিমণি দেখি ভদ্রমহিলাকে নিয়ে উচ্ছসিত প্রশংসা, আলোচনা। মাসিমণির আবার সবেতে গায়ে কাঁটা দেয়, চোখে জল এসে যায়। এসব দেখে টেখে পড়ে ফেললাম পরপর। মোটামুটি যা পাওয়া গেল গোগ্রাসে।

আমি পড়ছি ওনাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানো মানুষগুলোর কথা, কারুর নাম বলা বারণ, ক, খ, গ, ঘ, ঙ, চ, ছ আর ভাবছি, আহা আমি যদি এর মধ্যে একজন হতুম। কত দুপুর নিজেকে ক , খ ভেবে লম্বা কথোপকথনে কাটানো। তারপরে বড় হলাম, একটু প্যাখনা গজালো। গুটিকতক বই পড়ে নিজেকে বেজায় আঁতেল ঠাউরালাম এবং নাসরিনের সমালোচনা করতে থাকলুম এই বলে, “আমি ওঁর লেখার ভক্ত নই, কিন্তু লড়াই এর ভক্ত”।

ইন ফ্যাক্ট ওনার ওপর রাগ হতে থাকলো যে এতো পড়েছেন, এতো জানেন, এতো অভিজ্ঞতার পরেও লেখায় কোনো হেঁয়ালি নেই, ক্যানো ক্যানো ক্যানো? ক্যানো এতো সাদাসাপটা? সাহিত্যের প্রতি কি কোন দায় নেই ওঁর? তবু নিজস্ব সম্পত্তির মতো আরকি, আমি রেগে যেতে পারি, অন্য কেউ ওঁর বিরুদ্ধে এককণা ব্যাঁকা হাসতে গেলেও ফোঁস করে উঠি।

তারপরে জীবনে ফেসবুক এলো, ফলো টলো করলুম। ওঁর অনেক কথার সঙ্গে মতবিরোধ হতে থাকলো। বেশি বোদ্ধা হয়ে গেছিলুম কিনা! ওনার কথায় যেই রাগ হয়ে যায়, আনফলো করে দি, আবার নিজেই নিজের মানভঞ্জন করে ফলো করি। উনি জানতেও পারেন না। এখনো অব্দি ১৫১ বার (রেমন্যান্ট অফ হেঁদুত্ব) বিভিন্নমুখে শুনেছি,  “এই তোকে না তসলিমার মতো দেখায় মুখে বলিধুস!!” আর ভেতরে ভেতরে এট্টু রোমাঞ্চিত হই। দেখায়? এক্টুখানিও দেখায় বুঝি!! এখন বড় হয়ে গেছি (?!) বলে কথায় কথায় আনফলো করি না। 

দুমাস আগে একদিন ধাঁই করে মাথায় খেলে গেল এই সাদাসাপটা লেখার কারণ। তসলিমা কী চেয়েছেন? সাধারণ, অতি সাধারণ মেয়েগুলোর উন্নতি। তেলা মাথায় তেল দিতে চাননি। সহজ কথা সহজে না বলা গেলে কত ধোঁয়াশার আশ্রয় নিতে হয়। তসলিমা সাহিত্যিক হতে চেয়েছিলেন কি? জানি না। আমার যেমন মহাকাশ দেখবার জন্য নীল ডি গ্রাস টাইসনকে লাগে, সিমোন ডি বোভারকে বুঝতে হুমায়ুন আজাদকে লাগে (ভাষাজনিত কারণ, ইংরেজি কম বুঝি)। তেমনি তসলিমাকে কোটি কোটি মানুষের লাগে।

তসলিমা আসলে পাব্লিক এডুকেটর। তত্ত্ব ও অভিজ্ঞতার মিশেলের এনালাইসিস করে সঠিক লক্ষ্যের তীরন্দাজ। যত দিন যাচ্ছে বুঝতে পারছি, বুঝতে আমার অনেক দেরী, অনেক বাকি। যা যা নিয়ে ওঁর বিরোধিতা করেছি, মা’র বিরোধিতা করেছি, তার সত্যতা ধরা দেয়। না অন্ধভক্ত আমি নই কারুর। তাই দিনকতক আগেও সম্পূর্ণ সহমত হইনি কয়েক লাইন নিয়ে।

হয়তো বছর দশেক বাদে, ওঁর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার একাংশ অর্জন করতে পারলে। আসলে আমার মনে হয় তসলিমার খোলা ক্যানভাসের কারণ স্বচ্ছযাপন। হ্যাঁ, কদিন আগে বলা কথা আবার রিপিট করি। নারীবাদী বলে ট্যাগান নিজেকে অনেকেই, কিন্তু স্বচ্ছতাই যে কোনো আইডিওলজি যাপনের একমাত্র পথ (ঝাড়নের নহে) এইটে যান ভুলে। তাই নিজেরে পার্মানেন্টলি ট্যাগাইতে আমার ২৫ বছর লাগছিল। তাড়াহুড়া করি নাই। করসি যখন আর সরি নাই।

কয়েকটা মানুষের হাত আমি ফিজিকালি ছুঁতে চেয়েছি, চুপ করে বসে থেকে একটু কাঁদতে চেয়েছি। সঞ্চয় করে নিতে চেয়েছি প্রাণশক্তি। তার মধ্যে ঋতুপর্ণ ঘোষ পট করে চলে গেলেন, আর নির্বাসিতার কাছে কোনদিনও পৌঁছনো হবে না। লিখতে গিয়েও কান্না পায়। তার ওপরে এই উদ্গান্ডু ট্রাম্প সরকার কাড়তে চাইছে ওনার আমেরিকান গ্রিনকার্ড। নাঃ বাল্যপ্রেম কি আর যায়!! মাথাখানা সরল ছিল যখন, তখনকার ভালোবাসারাই সত্যি দেখি।

তসলিমা, রোহতকের খুনটা বড্ড কাঁদায়, সবকটা নৃশংস খুন কাঁদায়। প্রায় রোজ রাতে দুঃস্বপ্ন আসে নিরাপদ আমার। ধর্ষণ করেও হারাতে পারছে না দেখে মেরে ফেলছে আমাদের। যশোর রোডের গাছেদের জন্য সুমন একবার লেখাতে খুব আশান্বিত হয়ে বারবার লেখার জন্য অনুরোধ করেছি। কোথায় কী? উনি শুধু দুনিয়াশুদ্ধু মানুষকে গালি দিতে ব্যস্ত, রাগের চেয়ে বেশি আমার কেমন কষ্ট হয়।

কে যেন একবার বলেছিল আপনার মস্তিষ্কবিকৃতি ঘটেছে (তাতো বটেই, অমন বিকৃতি বেঁচে থাক), অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী (!!), সলমন রুশদিও তো থ্রেট খেয়েছেন, এক্সাইল্ড, বাজে বকতে দেখেছে কেউ ইত্যাদি? আমি সেই মানুষটির ধৃষ্টতায় হেসেছি, রেগেছি, প্রতিবাদ করেছি। তারপরে বেরিয়েছে রুশদির আসল রূপ, বিকট পুরুষতান্ত্রিকতা। তাঁর সমালোচনারও যোগ্য আমি নই যদিও।

তবে স্বচ্ছযাপন খুব কম মানুষের হয় তসলিমা, আমার বিশ্বাস আপনার আছে তা। ভারতবর্ষ আপনাকে চায় না, কিন্তু গোটা পৃথিবীর সব অত্যাচারিত মেয়েরাই তো আপনার দেশ। ওই খুনটার জন্য একটু লিখবেন প্লিজ। কেন চিৎকার করে উঠছে না গোটা দেশ আমার?

#ইন্ডিয়াসডটার নৈরঞ্জনা

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 238
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    238
    Shares

লেখাটি ২,৪৩১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.