ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা, সব শিশুরই অন্তরে

0

পৃথা শারদী:

গতকাল ক্লাস ফোরে পড়া এক শিশু গাড়ি চালাতে চালাতে ছায়ানটের সামনে নালন্দা স্কুলের একটি মেয়ে এবং তার বাবাকে চাপা দেয়, মেয়েটিকে তার গাড়ি টেনে প্রায় হাত দশেক সামনে নিয়ে গেছে। ড্রাইভিং সিটে বসা বালক পুলিশের সম্মুখীন হলে পুলিশকে বালক বলে, “থানায় চলেন ,সেখানে ব্যবস্থা হবে।” এই বয়সেই সে শিখে গেছে, থানায় গেলে ‘ব্যবস্থা’ হবে। আর টাকা দিয়ে যে ব্যবস্থা করা যায়, এটাও সে এই বয়সেই শিখে গেছে। কে শেখালো? পরিবার? সমাজ?

সবাই বলছে, দোষ বালকের! দোষ কি আদৌ বালকের? বালকের অভিভাবকের দোষ কি কোথাও নেই? কেন একরত্তি এক ছেলেকে রাস্তায় গাড়ি চালাতে দেয়ার স্পর্ধা দেয়া হবে? এ সাহস পায় কোত্থেকে সেই শিশুটি?

ঐশী নামের এক কিশোরী তার মা-বাবাকে নির্মমভাবে খুন করেছিল, তাকে আমরা বলেছি বখে যাওয়া মেয়ে, অসভ্য মেয়ে, মা-বাবাকে খুন করেছে। দোষ আদতে ঐশী’র কতোটা ছিল? কেন সেই মেয়েটি নেশার সাগরে ডুবে যাবে? কেনই বা তার অভিভাবক এতোই ব্যস্ত হয়ে পড়বেন যে নিজের পরিবারকে, নিজের সন্তানকে সময় দেবেন না!

আমার কাজিনের ছেলেমেয়ে, যাদের বাবা বড় চাকুরে। ছয়-সাত বছরের ছোট্ট দুই শিশু, তাদের আচার-আচরণে এখনি প্রকাশ পায় ঔদ্ধত্য। তারা এখনই বোঝে তারা একটা ক্লাস মেনে চলে, উঁচু ক্লাস ! তারা জানে বাসায় কাজের লোক মানে কাজের লোক, পিয়ন মানে পিয়ন। তাদের বাবার মেজাজ কড়া, তাদের বাবা একে তাঁকে ধমকিয়ে কাজ আদায় করে, তাদের মা তাদের বাবার ভয়ে কাঁপে, শিশু দুটি বুঝেছে, ত্রাস সৃষ্টি করে, ভয় দেখিয়ে কাজ আদায় করা সম্ভব। তারাও ভয় দেখিয়ে চকোলেট চিপস আদায় করে, এমনকি তাদের মাকেও বলে, “এটা করে দাও, নয়তো বাবাকে বলে দেব!”

তারা বোঝে, বয়সে বড় হলেও যারা ছুটা-ফুটা কাজের জন্য আছেন, তাদের সাথে ব্যবহারটা করতে হবে নিম্নমানের, আবার বাসায় যারা বেড়াতে আসবেন তাদের দেখিয়ে দিতে হবে তারা কতোটা পশ ! আমার চক্ষু ছানাবড়া হয় এই কড়ে আংগুলে বাচ্চাদের মানসিক পরিপক্কতা (!) দেখে, আর তাদের অভিভাবকের চিন্তার অপরিপক্কতা দেখে।

অনেক সময় আমরা দেখি, ক্লাসের কিছু বাচ্চা খুব মারদাঙ্গা হয়,কিছু বাচ্চা খুব বিধ্বংসী মনোভাবের হয়, একটা পেনসিল ইচ্ছা করে বেঞ্চে ঠুকে ভেংগে ফেলে, কারণ তারা বাড়িতে এমন ঘটনার সম্মুখীন হয়। না, আমি এটা বলছিনা যে বাড়িতে তার মা-বাবা পেন্সিল ঠুকে নষ্ট করে, তবে বাড়িতে তার মা-বাবার কোন আচরণের প্রভাবের ফলেই শিশুটি এমন কাজ করছে।

দেখবেন, কোন শিশু ইচ্ছে করে গাছের পাতা ছিঁড়ে, ফুল ছিঁড়ে পিষে ফেলে, প্রজাপতির পাখাও কেউ কেউ টেনে প্রজাপতিকে কষ্ট দিয়ে মেরে ফেলে। কেন করে শিশুরা এসব? ভেবে দেখেছেন কি? একটা ছোট্ট বাচ্চা যখন এসব করে তখন বুঝতে হবে মা-বাবা তাদের শেখাচ্ছেন না কোথায় খর হতে হবে কিংবা কোথায় আর্দ্র!

অনেক ছোট্ট বাচ্চা আছে তারা জানেও না, বোঝেও না, কাকে কী বলতে হবে,কথা নেই বার্তা নেই একে অন্যকে তুই-তোকারি করে যাচ্ছে, এমনও অনেকে আছে কথায় কথায় গায়ে হাত তুলছে, গাল দিচ্ছে, কোত্থেকে শিখছে সে এসব আচরণ? ভেবে দেখছেন কি? কিছু বাচ্চা খুব জেদী হয়, যা চায় তা-ই তাদের দিতে হয়, এমন শিশুরা পরিবারের বাইরে গিয়েও সবসময় এটা আশা করে তারাই মধ্যমনি হবে। কেউ কেউ আবার ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সে ভোগে, কেউ কেউ খুব অহংকারী হয়।

কেউ কেউ ছোটবেলা থেকেই ঘরকুনো হচ্ছে, কেউ বর্হিমুখী, কাউকে ছোট্টবেলা থেকে বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে তার খুঁতগুলো। এই নানাবিধ মানসিক আচরণে পরিবারের ভূমিকা কি কম নয়? তারাই তো এখানে মূল হোতা!
কেন একজন কোমলমতি শিশু বিধ্বংসী মনোভাবের হবে? কেন তার মাথায় আঘাত করার চিন্তা আসবে, কেনই বা সে এতটা জেদী হবে যে তার জেদের কাছে আপনি কাবু হবেন? আপনি আপনার সন্তানের সামনে মণ্ডা-মিঠাই তুলে দিচ্ছেন, আপনার সন্তান চাওয়ার আগেই তাকে আইফোন দিচ্ছেন, অথচ সন্তানকে শিষ্টাচার কী তাই বোঝাচ্ছেন না।

বলতেই পারেন,“আমার একমাত্র সন্তান ও। ওকে যদি আদর না দেই! তবে কাকে দেব! আমার এতো কামাই ওর জন্যই তো!” আপনাদের বলছি, সবার কাছেই সবার সন্তান অত্যন্ত আদরের। কেউ তো কারো সন্তানকে অবহেলায় অযত্নে মানুষ করে না! আপনি আপনার সন্তানের সামনে অধ:স্তন কমর্চারীদের গালাগাল করছেন, আপনি আপনার সন্তানের সামনে অবৈধ কাজ করছেন, আপনি তার সামনেই মিথ্যা কথা অবিরাম বলে যাচ্ছেন, তার সামনেই দাম্পত্য কলহ চালিয়ে যাচ্ছেন, তার সামনেই ইন্টারনেটে আসক্ত হচ্ছেন।

আপনি ভাবছেন ,আপনার সন্তান ছোট্ট! কিছুই সে বোঝে না, হয়তো সে বোঝে না তবুও তার অবচেতন মন আপনার এহেন আচার-আচরণ নিজের মধ্যে নিয়ে নিচ্ছে। পরিবার সর্বদাই একজন শিশুর মানসিক বিকাশে ভূমিকা পালন করে। কী করতে হবে, কী করতে হবে না, কোথায় শিশুর রাশ টানতে হবে, মানুষকে শ্রদ্ধা করতে হবে, এসব তো পরিবার থেকেই শিশুরা শিখে নেবে! পরিবার যদি শিশুর প্রি-স্কুল না হতো, তবে কেউ আমরা বিয়ের সময় ভালো পরিবার খুঁজতাম না, সাতাশ-আটাশ বয়সে মানসিকতা বদলায় না, মানসিকতা তৈরি হয় দশ বছরের ভেতর, ধীরে ধীরে তাতে ভালো মন্দের প্রলেপ পড়ে।

একজন বাচ্চা ছোটবেলায় যা শেখে, তা-ই সে আদর্শ হিসেবে ধরে নেয়, যে শিশু ছোটবেলা থেকেই মিথ্যা বলে সে সহজে সত্যবাদী হয় না, আবার যে শিশু সহজেই শিষ্টাচার বোঝে, সে চাইলেই নিষ্ঠুর, উগ্র মেজাজের মানুষ হতে পারে না। যে পরিবার খুব টিপটপ, যে পরিবার খুব গোছানো, যে পরিবার খুব সংস্কৃতিমনা, সে পরিবারের কোনো সন্তানকে আপনি অগোছালো কোনো পরিবেশে ছেড়ে দিলে সে যথাসম্ভব চেষ্টা করবে গুছিয়ে চলতে। আবার আপনি যদি দু’হাতে টাকা ওড়ানো, উচ্ছৃংখল, টালমাটাল পরিবারের কোন সন্তানকে কোন সাধারণ পরিবেশে নিয়ে আসেন, দেখবেন সে মানিয়ে চলতে পারবে না!

সন্তানের যা দরকার তা দিচ্ছেন সন্তানকে, যা দরকার নয় তাও দিচ্ছেন, তবে তার জেদের সময় তাঁকে শাসন করছেন না, তো আপনার সন্তান উগ্র হবে না তো কে হবে! সন্তান দোষ করলে তাঁকে শাসন করুন, যা-ই চায় তাই তাকে দিতে কেন হবে? তাকে বোঝান, কষ্ট করে অর্জন করতে হয়, তাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে শেখান মানুষকে ভালোবাসতে, তাকে উপলব্ধি করান দুনিয়াতে ভালো কাজ করলেই ভালো হবে, তার ভালো গুণগুলোকে বাহবা দিন খারাপগুলোকে ছাড়িয়ে দিন। শুধু টাকা দিয়ে, স্নেহ দিয়ে কি ভালো কিছু তৈরি হয়? যদি তাই হতো তবে তো এতো উগ্র মানসিকতার শিশুর জন্ম হতো না! 

শিশু যখন জন্মায় তখন প্রাণদেয়া এক পুতুল থাকে, এ এমনই এক আশ্চর্য পুতুল যে কিনা চোখ পিটপিট করে চারদিকে তাকিয়ে  নিজের ভেতর নিজের জগত গড়ে তোলে । শিশুরা বলে , “আমি আমার বাবার মতো হবো! আমি আমার মায়ের মতো হবো।”

কেন বলে ? কারণ শিশুদের জগত খুব ছোট ! এইযে মা ! এইযে বাবা ! এঁরাই তার ছোট্ট জগত !আপনি তাঁকে যা শেখাবেন তাই সে শিখবে !আজ আপনি যা আজ থেকে বিশ বছর পর আপনার সন্তান আপনার হয়ে এ পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব করবে ,আপনি যদি অসৎ হোন, আপনি যদি খারাপ হোন, আপনার সন্তান ভালো মানসিকতার না হবার সম্ভাবনাই বেশি।

আপনি শিশুর সামনে যদি ভালো থাকেন, ভালো আচরণ করেন, শিশুর মানসিকতা সেভাবেই তৈরি হবে। তাই শিশুর মানসিকতা ভালো করতে নিজেরা বদলান, ঘরের ছোট্ট প্রাণটিও আপন লয়ে তালে বদলাবে। প্রাণ দিয়েছেন তাকে, মানুষ তো বানাবেন !
জানেনই তো যে, “ ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে ”

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 658
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    658
    Shares

লেখাটি ২,১১৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.