আমি একটি ‘বেয়াদব’ কন্যাসন্তান চাই

0

আয়শা শারমিন:

একটা সময় ছিল যখন পারিবারিক শিক্ষা হিসাবে কন্যা সন্তানকে আদব-কায়দা, গুরুজনদের সম্মান, ছোটদের ভালোবাসা, রান্নাবান্না, সেলাইকর্ম শেখানো হতো। সহনশীলতা, ধৈর্য্যশক্তি, ক্ষমা মেয়েদের মেয়েলী গুণ হিসাবে বলা হতো।

আরো শেখানো হতো, মেয়েদের মুখফুটে কিচ্ছু চাইতে নেই; বেশী কথা বলতে নেই; লাফাতে নেই; দৌড়াতে নেই। মেয়েদের চিৎকার করতে নেই; ঘুড়ি ওড়াতে নেই; গুলি খেলতে নেই, ছাদে যেতে নেই, রাস্তায় হেঁটে গেলে মাথা নিচু করে যেতে হয়।

এতসব বিধিনিষেধ শুনতে আর মানতে গিয়ে মেয়েদেরও যে একটা মত প্রকাশ কিংবা প্রতিবাদ করার অধিকার আছে, তা আমরা বেমালুম ভুলেই যাই। এমনকি মেয়েটা নিজেও ভুলে যায়।

এদের মাঝে কিছু মেয়ে যারা নিয়মভঙ্গ করে, তাদেরকে  আমরা বেয়াদব বলি। বেয়াদবি আর প্রতিবাদির মাঝে অনেক ফারাক।

সাম্প্রতিক ঘটনার প্রেক্ষিতে বলছি, “মেয়ে দুইটা হোটেলে গেলো কেনো? মেয়েরা খোলা কলার মতো, মাছি তো বসবেই, এতো রাতে কেন গেলোএসব বলে যারা কুলাঙ্গারদের সাইড নিচ্ছেন, তারা আমার কাছে ধর্ষকের মতই অপরাধী। কুলাঙ্গারগুলা শারীরিকভাবে নির্যাতন করেছে আর আপনি মানসিকভাবে করছেন। যারা বলছেন ইঙ্গিত না দিলে কি আর আগায় ছেলেরা, তাদের জন্য বলছি, একটা মেয়ের শরীর পুরোটাই তার সম্পদ। মেয়েটা যদি না বলে তাহলে তার অর্থনা মেয়েদের মৌনতা সম্মতির লক্ষণ, ‘নাচক্ষুলজ্জার কারণে বলছে এসব ভাবার অধিকার সমাজকে কে দিয়েছে! মেয়েদের মুখের না শব্দের অর্থনা হবে। যেমন একটা ছেলেরনাবলা।

মত প্রকাশের অধিকার যেমন মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার, ঠিক তেমনি প্রতিবাদ করাও তার অধিকার। যা কিনা মেয়েদের কাছ থেকে খুব ছোটবেলায় কেড়ে নেয়া হয় সুকৌশলে। আর যারা প্রতিবাদ করছে তাদেরকে আমরা ভিন্ন কথা বলছি।

স্যালুট টু দেম, যারা দীর্ঘ একমাস ধরে মানসিক শক্তি তিল তিল করে জড়ো করে প্রতিবাদ করেছে। হয়তো বন্ধু, প্রিয়জনের কাছ থেকেও হয়তো কতোই না ধিক্কার শুনেছে। এমনকি খারাপ মেয়ে হিসাবে কথা শুনেছে।

জানি ওদের বিচার হবে না, আমি এরকম দুরাশাও করি না। প্রতিদিন নিউজপেপারে এরকম কত শিশু, টিনএজার, ছাত্রী, কাজের মেয়ে, গৃহবধু ধর্ষণের খবর পড়েন, বলেন তো এপর্যন্ত কতটা ধর্ষণের বিচারের খবর পড়েছ্ন?!

আমার পাঁচ বছর বয়সী একটি মেয়ে আছে। তার প্রতি জন্মদিনে একটা উইশ করি। প্রতিবছর ভিন্ন ভিন্ন উইশ। তাকে এবছর উইশ করতে গিয়ে আমি কেমন পৃথিবী দিব তা নিয়ে ভাবছিলাম। সুন্দর মনের মানুষে ভরা নিরাপদ একটা পৃথিবী দিতে পারাটা আমার একটা আশা তার জন্য। কিন্তু তার কাছে আমার প্রত্যাশা ভিন্ন।

আমি একটি বেয়াদব মেয়ে চাই। জ্বী, যে প্রতিবাদ করতে জানবে এমন একটি সমাজের চোখে বেয়াদব মেয়ে চাই। হোক তাতে সমাজ ওকে বেয়াদব বলবে, আর আমাকে বলবে মেয়ে মানুষ করতে পারেনি। আমার মা বেয়াদব মেয়ের মা শুনতে ভয় পেয়েছে, তাই মেয়েমানুষ করতে গিয়ে হাজারো বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, কিন্তু আমি পাই না। আমি গর্বিত হব যদি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শিখে, না কে না বলতে শেখে। আমি চাই তার প্রতিটা আঘাতের প্রতিবাদ প্রতিরোধ করতে শিখুক।

আমি চাই আমার মেয়ের মাঝে মেয়েলী গুণ না থেকে মানবীয় গুণাবলী থাকুক। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার প্রতি হওয়া অন্যায়কে প্রতিবাদ করতে পারে, ‘না’ কে যেন ‘না’ বলতে পারে, এমন একটি কন্যাসন্তান চাই। শুধু আমি না, আজ যেন এমন কন্যাসন্তানের দাবি ঘরে, ঘরে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

লেখাটি ৮,৮৪০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.