‘দেশ-কাল-পাত্র ভেদেও দেখি, মেয়েদের কান্নাগুলো একই’

0

জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা:

বেশ কিছুদিন আগের কথা| তখন ইউনিভার্সিটি অফ মেলবোর্নে পড়ি| আর দশজন ফাঁকিবাজ স্টুডেন্টের মতো আমারও টিউটোরিয়ালে যাবার আগ মুহূর্তে মনে পড়ে যেত, দু/একটা হোমওয়ার্ক এখনো বাকি রয়ে গেছে! নিদেনপক্ষে এক-আধটা আর্টিকেলের রিডিং তো বাকি থাকেই থাকে! ট্রেনে উঠেই তাই নিরিবিলি একটা কোণ খুঁজে নিতে হয়, যেন পড়তে পারি| তো, সেদিনও তেমন বসেছি| কিন্তু এক স্টপেজ যেতেই, একটা খুব সুন্দরী টাইপ মেয়ে এসে মুখোমুখি সিটটায় বসলো|

রাগে গা জ্বলে গেল; কারণ ঐ মেয়ে কানে ফোন গুজে  ফিসফিস করছে তো করছেই! আমার রিডিং এর বারো নয়, একবারে পুরো চব্বিশটা বাজিয়ে ছাড়লো!  জোর চেষ্টা চালিয়েছিলাম কিন্তু পড়া এগুনো গেল না, কারণ তার সব কথা কানে আসছে| সাথে আবার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে! একটুও কৌতুহলী না হয়েও প্রায় পুরোটাই শুনতে পেলাম| যতই শুনলাম ততই অবাক হলাম| ধীরে ধীরে ঢুকে গেলাম তার ‘হাহাকারে ভরা’ মুঠো-বার্তায়|

এপাশ থেকে ক্রমাগত শুনে, ঘটনা যা বুঝলাম তা হলো ~ মেয়েটার বিশেষ কোনো এক সম্পর্ক ভেঙ্গে যাচ্ছে| তার সাথের সম্পর্কিত মানুষটা ছিল বিবাহিত| মেয়েটা প্রথমে এই সম্পর্কের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র আগ্রহী ছিল না; কিন্তু ‘এখনকার এই ছেড়ে যেতে চাওয়া পুরুষ’টির ‘তখনকার ব্যাকুলতা’য় মেয়েটাও শেষ পর্যন্ত আর নিজেকে দূরে রাখতে পারেনি| মেয়ের যখন প্রেমে পুরোই ‘পাগল অবস্থা’, তখন এই ‘প্রেমিক পুরুষ’টির মনে পড়ে গেছে তার বৌ এবং সন্তানাদির কথা! শুনছি ~ মেয়েটা আকুল হয়ে প্রেমিককে তার দিকে ফেরানোর চেষ্টা করছে, তার কষ্টগুলোর কথা তার তাকে আরেকটু ভেবে দেখতে বলছে….|

… শুনতে শুনতে, কখন যে আমার সব রাগ/বিরক্তি উবে গেল! বরং মায়া হতে থাকলো মেয়েটার প্রতি! … যদিও সম্পর্কটা গোলমেলে, ভেঙ্গে যাওয়াই হয়তো ভালো| কিন্তু মেয়েটার কষ্টটা তো সত্যি! মেয়েটার জন্য হঠাৎ এতো অদ্ভুত কষ্ট হতে লাগলো! কেন কে জানে? কাছের একজনের কষ্টের সাথে তার এমন কষ্ট পাওয়ার মিল আছে দেখে?

… নীল-নয়না, ঝাঁকড়া স্বর্ণকেশী এই মেয়ের কান্নাটা অনেক দূরে ফেলে আসা আমার বাংলাদেশী এক শ্যামাঙ্গিনী বন্ধু’র কান্নার সাথে হুবহু মিলে গেল বলে? কে জানে? কারণ যেটাই হোক; যৌক্তিক/অযৌক্তিক, নৈতিক/অনৈতিক সব সম্পর্কের দায় কিভাবে কিভাবে যেন শেষমেশ মেয়েদের ঘাড়েই বর্তায়| কান্নার ভাগটা তাই মেয়েদের অংশেই চলে আসে| দেশ/কালের সীমানায় এর কোনো পার্থক্যই বোধ হয় ঘটে না!

… জানি না, বুঝি না এতকিছু| কিন্তু সেই থেকে আজ অবধি প্রায়ই মেয়েটার কান্না-ভেজা, বিষন্ন-নীল শেষ কথা গুলো উঁকি দেয় মনে –  “…জানো, তোমার মাকে দেখার খুব শখ ছিল! ইচ্ছা ছিল তার সাথে গোটা একটা দিন কাটাবো তাঁর সোয়ান হিলের ফার্মহাউসে, এই সামারেই!  আর হলো না, তাই না?

… … আচ্ছা তোমার কি মনে আছে,  একদিন অভিমান ভাঙ্গাতে গিয়ে বলেছিলে আমার এই কোঁকড়া চুল তুমি নিজের হাতে আঁচড়ে দেবে? টেনে পনি-টেল করে বেঁধে দেবে? সেটাও আর হবে না! আর কখনোই হবে না, তাই না?”

লেখাটি ১,৭৬৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.