লেবুর শরবত সমাচার (মা সম্বন্ধীয়)

0
উম্মে ফারহানা:
উইমেন চ্যাপ্টারের সম্পাদক সুপ্রীতি (ধর) দিদি একটা স্ট্যাটাস আপডেটে লিখছিলেন, মাতৃত্ব ও পিতৃত্বের তুলনামূলক আলোচনায় এক ঢাকাইয়া নারীর মন্তব্য – “গেলাশ আমার, পানি আমার, চিনি ভি আমার, তুমি হালায় দুই ফোঁটা লেম্বু চিপ্যা দিয়া সরবতের মালিক হইবার চাও?”
মন্তব্যটা মজার হইলেও হাসি আসার চাইতে রাগ লাগে বেশি। নারীর শরীর (কিংবা জরায়ু), রক্তমাংস আর ডিম্বাণু এই তিনের সঙ্গে সন্তান জন্মদানের জন্যে লাগে পুরুষের বীর্য। কিন্তু এই বীর্য বা শুক্রাণুর জোরে পুরুষই হইয়া ওঠেন সন্তানের অভিভাবক, নারী শুধুই মা যে কিনা শুধুই মমতার ভাণ্ডার, দায়িত্বের বোঝা তাঁর কান্ধে থাকলেও অধিকারের বেলায় শুভংকরের ফাঁকি। বাচ্চার অভিভাবকত্ব পান বাপে, বাচ্চার নামের পিছে বাপের নাম লাগে। বাচ্চার ২৩ ক্রমোজোম মায়ের কাছ থাইকা আসাতে মামা-খালা আর চাচা-ফুফুদের সঙ্গে সমান পরিমাণ মিল থাকে, কিন্তু বলার সময় শুধু দাদা-দাদি আর চাচা-ফুফুরা বলেন, “আমাদের ফ্যামিলির ছেলে/মেয়ে”।
পিতৃতান্ত্রিকতার মতোন এত বড় প্রতিষ্ঠিত অবিচার দুনিয়ায় আর একটা নাই। গত ১৪ মে আন্তর্জাতিক মা দিবসে ওমেরা এলপিজির বানানো টিভিসি দেইখা একটা নোট লিখছিলাম, “মা সম্বন্ধীয়”। সেই লেখায় যে যে ব্যাপারগুলা বিশদে বলতে পারি নাই, সেইগুলা বলার জন্যেই এই লেখার অবতারণা।
প্রথমত, ওমেরা এলপিজি তাঁদের কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি পালনের লাইগ্যা হোক কিংবা টার্গেট কাস্টমাররে খুশি করার নিমিত্তে হোক, একখানা অ্যাড বানাইছেন, সেইটারে এতো সিরিয়াসলি নেবার কিংবা অতি কঠোর মন্তব্য করার দরকার কী?
মা দিবসে মায়েদেরে শ্রদ্ধা জানাবার অধিকার উনাদের নিশ্চয়ই আছে। যে ব্যাপারটা নিয়া আমার আপত্তি সেইটা হইলো নারীরে নারীর বিরুদ্ধে দাঁড় করাইয়া দেওয়ার একটা চিকন ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাইছি আমি, এই বিজ্ঞাপনে।
গৃহিণী নারীদেরে করুণা দেখানের সুযোগ কর্মজীবী নারীদের নাই। আজকের জমানায়, যখন যৌথ পরিবার ভাইঙ্গা গেছে, অধিকাংশ পরিবারে নানি দাদি/ খালা ফুপুরা থাকেনা, মায়েরা কাজের লোকের কাছে বাচ্চা দিয়া ভয়ে ভয়ে অফিস করেন আর অফিস শেষে দৌড়াইয়া বাসায় ফিরা বাচ্চারে সহিসালামতে দেইখা হাঁফ ছাড়েন,সেই সময়ে স্টে অ্যাট হোম মাদার হইতে পারাটাই প্রিভিলেজ। সেই বিজ্ঞাপন নিয়া লেখাটা লেখার কথা আমার মাথায় আসছিলো একটা অনলাইন আর্টিকেল পইড়া, সেইখানে বলতেছে মায়েরা আসলে বাসায় থাকতে চান, বাসা অফিস দুইটা সামলানো যেকোনো নারীর জন্য কঠিন। হাতে সময় থাকলে লেখাটা পড়তে পারে, নতুন কথা না যদিও এটা।
বাচ্চার জন্যে ক্যারিয়ার ছাইড়া দিলে বাচ্চা বড় হইবার পরে আবার ক্যারিয়ার শুরু করা ঝামেলা দেইখা হয়তো অনেকেই চাকরি ছাড়েন না। কিন্তু ‘আপাতত’ ছাড়তে পারলেও বাঁচতেন এমন নারীর সংখ্যা নেহাত কম না বইলা অনুমান করি। তো সেই বিজ্ঞাপনে যেমন দেখাইলো, গৃহিণী মায়ের চাকরিজীবী মাদের সামনে সংকুচিত হইয়া যাওয়া- এইটা আসলে নারীদের মধ্যে কম্পিটিশন তৈরি করার একটা পন্থা।
দ্বিতীয়ত, গৃহিণী নারীদের তুলনামূলক কম সুবিধা পাওয়া মা ধইরা নিয়া যদি উনারা মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত নারীদের বাইছা নিয়া থাকেন, তাইলেও কথা থাকে। স্বীকার করতেছি, অনেক ক্ষেত্রেই গৃহিণী নারী কর্মজীবী নারীর তুলনায় কম স্বাধীন, চাকরি করা মায়েরা অনেক সময় কিছু কনসিডারেশন পান,গৃহস্থালি কাজে সঙ্গীর সাহায্য পান, টাকা রোজগারের বিনিময়ে কিছু স্বাধীনতা ভোগ করেন, ঈদ-পরবে বাপের বাড়ির লোকজনের জন্যে উপহার কিনতে পারাটাও বিবাহিত নারীর জন্যে কম না, এই সমাজের সাপেক্ষে। তা হইলেও পাল্লাটা উনাদের বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যের দিকে একটু ঝুইকা থাকে। সমানভাবে সকল মায়েরে শ্রদ্ধা দেখানের সময় বঞ্চিত মাদেরই যদি দেখাইতে হবে, প্রান্তিক শ্রমজীবী মায়েদেরে দেখান নাই কেন উনারা? সেই ইট ভাঙ্গা, মাটি কাটা, ফুল বেচা মায়েরা উনাদের কনজ্যুমার না বইলাই কি?
তৃতীয়ত, গৃহিণী নারীরে বাড়ির ‘বস’ বানানের ধোঁকাবাজি আমার কাছে ভালো লাগে নাই- বাসার সব কাজ ‘মা একাই করে’ বইলা গৃহিণী মায়েরে সন্তানের জন্যে উৎসর্গীকৃত দাসী হিসাবে আশা করার প্রবণতাও লক্ষ্য করা গেলো। বাপ পয়সা কামায় দেইখা সে বাচ্চার কোনো যত্ন করবে না, জীবনেও থালাবাসন ধুবে না, কাপড় কাচবে না, বাচ্চার জ্বর হইলে স্যুপ খাওয়াইয়া দিবে না এইটা হইতে পারে না।
তর্কের খাতিরে ধইরা নিলাম আমি যেইটা বলতেছি সেইটা ইউটোপিয়ান আইডিয়া আর উনারা যেইটা দেখাইছেন সেইটা রিয়ালিটি। এবং গৃহিণী মায়েদের আনপেড লেবাররে স্বীকৃতি জানানের মাধ্যমে উনারা মায়েদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাইতেছেন, এতে অসুবিধাটা কী? কোন অসুবিধা নাই। উনাদের শ্রদ্ধা জানানের ইচ্ছার প্রতি পূর্ণ সম্মান রাইখাই বলি, শ্রদ্ধা জানানের সঙ্গে সঙ্গে অধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টাও করা দরকার।
অনেক মানুষ নারী দিবস আইলেই এড়ে তর্ক করে, নারী দিবসের দরকার কী? দিবস নারীরে ইনফিরিয়র কইরা রাখে ইত্যাদি প্রভৃতি… ব্যাপার হইলো নারী যেদিন সকল ব্যাপারে সমান অধিকার পাবে, বাপের সম্পত্তি ভায়ের সমান পাবে, সকল প্রকার অত্যাচার নির্যাতন আর সহিংসতার বিচার পাবে সেদিন নিশ্চয়ই এই দিবসের গুরুত্ব থাকবে না। এখনো তো সেই দিন আসে নাই।
আবার তর্কের খাতিরে ধইরা নিলাম ‘মা দিবস’ কিংবা ‘বাবা দিবস’ আসলে শ্রমিক দিবসের মতন অধিকার আদায়ের দিবস না, ভালোবাসা জানানের দিবস। সেই হিসাবে যুগে যুগে মায়েরা যে নিঃস্বার্থ সেবা সন্তানরে দিয়া যাইতেছেন সেইটার জন্যে উনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ‘মা দিবসে’র প্রতিপাদ্য হইতেই পারে। তবে কিনা উনাদের শ্রদ্ধা জানানো আনরিকগনাইজড লেইবাররে স্বীকৃতি দেওনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে। বঞ্চনার বিরুদ্ধে কথা কওয়ারে উনারা দায়িত্ব ভাবেন না।
ঠিক আছে, সেই ক্ষেত্রে বাকী কথা আমি বলতে চাই- এই শ্রদ্ধা জানানোর লগে লগে মায়েদের তাঁদের অধিকার দিতে হবে। অবিবাহিত কিংবা বিবাহ-বিচ্ছিন্ন মায়েরা বাচ্চাদের ইশকুলে ভর্তি করাইতে গেলে ঝামেলায় পড়েন। বিবাহবিচ্ছিন্ন মা হিসাবে আমি জানি বাচ্চারে দেশের বাইরে নিতে চাইলে বাচ্চার আসল অভিভাবকের (মানে জৈবিক পিতার আর কী) কাছ থাইকা এনওসি নিতে হয়। অনেক সময় সেই পিতার জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি লাগে। বিচ্ছিন্ন সম্পর্কের যেকোনো কারণেই স্মরণ করতে হইলে সেইটা গ্লানিকর কিংবা পীড়াদায়ক হইতে পারে। এই পীড়া থাইকা মায়েদের মুক্তি দিতে হবে।
সকল মায়েরে ‘সমানভাবে’ শ্রদ্ধা জানানের সময় আমরা আরেক ধরনের মায়েদের কথা ভুইল্যা যাই। তাঁরা হইলেন বেশ্যা বা যৌনকর্মী মা। অবিবাহিত মায়ের কনসিভ করা আমাদের দেশে একটু মুশকিলের, কিন্তু বেশ্যাদের যে সন্তান হয় সেইটা তো আমরা জানি। অধিকার দূরের কথা, শ্রদ্ধা জানানের সময়ও সেই তথাকথিত ‘পতিতা’ নারীদের আমরা গুনি না (উলটা কাউরে অপমান করতে হইলে বলি উনার মা বেশ্যা ছিলেন। পুরুষেরা উনার মায়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন) ‘মাতৃত্ব’ নামের যে জিনিস অত মহান, তা পুরুষের দেওয়া সার্টিফিকেটের উপরে নির্ভর করবে কেন? বিবাহের (এবং ক্ষেত্রবিশেষে তালাকের) কাগজ না থাকলে সেই মায়ের মাতৃত্ব যদি মহান কোনকিছু না হয়, শ্রদ্ধার যোগ্য না হয়, তাইলে সেই আপেক্ষিক শ্রদ্ধা আর সম্মান দিয়া মায়েদের কী কচুর ঘন্ট হইবো?
এইখানে একজন যৌনকর্মীর অপর যৌনকর্মীদের সন্তানদের লালনপালন বিষয়ক একটা ভিডিও আছে, দেইখা নিতে পারেন –
কিছুদিন আগে ফেইসবুকে দেখছি একজন অবিবাহিত মেয়ে একটা মেয়ে বাচ্চার অভিভাবকত্ব পাইছেন। উনি সম্ভবত আমার ফেইসবুকে নাই, কোন মিউচুয়াল ফ্রেন্ডের বরাতে জানতে পাইছিলাম। এইটা খুব ভালো খবর। আমি যতদূর জানতাম, বাংলাদেশে দত্তক সন্তান নেওয়ার জন্য উপযুক্ত আইন নাই বিধায় এইটা বেশ জটিল প্রক্রিয়া, দত্তক বাচ্চারা সম্পত্তির উত্তরাধিকারও পায় না আর নারীরা সন্তান দত্তক নিতে চাইলে স্বামীর অনুমতি লাগে-আমার জানা ভুলও হইতে পারে। সম্ভবত সেই আইনে সংশোধন হইছে। তা হইলে জৈবিক মাতা নিশ্চয়ই সন্তানের অভিভাবক হইবার যোগ্যতা রাখেন। কিন্তু বাপের নাম ছাড়া এই দেশে বাচ্চারে টিকা দেওয়াও সম্ভব হয় না। প্রতিবেশী দেশ ভারতের অভিনেত্রী নীনা গুপ্তা মামলা করাতে সরকার নাকি অবিবাহিত মাদেরে অভিভাবকত্ব দিতে বাধ্য হইছেন। আমাদের দেশে এমন কবে হবে?
ভারতের মধ্যপ্রদেশে শবনম নামে একজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ পার্লামেন্ট মেম্বার হইছেন ভোটে জিত্যা। আমাদের দেশে হিজড়াদের মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করাই সম্ভব হয় নাই এখনো, তাঁদের শিক্ষার অধিকার, কাজের অধিকার নাই, মানুষ হিসাবে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নাই।। কাজেই হিজড়া মায়েদের দত্তক সন্তানের উপরের অধিকার নিয়া কথা বলাটা হবে ঘোড়ার আগে গাড়ি জুইতা দেওয়ার মতন ব্যাপার।
ভারতের একটা কোম্পানির সেই হিজড়া মাকে নিয়া বানানো বিজ্ঞাপন না দেইখা থাকলে দেইখা নিতে পারেন-
এতোগুলি কথা বলার দরকার হইলো এই জন্যে যে, সুন্দর কইরা বানানো একটা বিজ্ঞাপনের ভুল ধইরা নিন্দা কইরা ছাইড়া দেওয়া যথেষ্ট না। আমাদের নিজেদের বক্তব্যও বলতে হবে। যেইভাবে সেই ঢাকাইয়া নারী লেবুর শরবতের পুরা কৃতিত্ব শুধুমাত্র লেবুরে দিতে নারাজ হইতেছিলেন, সেই একইভাবে মায়েগর অধিকার নিশ্চিত করতে গিয়া পুরুষরে শুধু স্পার্ম ব্যাংক হিসাবে বিবেচনা করলেও চলবে না।
পরিশেষে বলি, আমি সামান্য মানুষ, কোনো এক্সপার্ট না। দেশে যারা নারী অধিকার কর্মী আর জেন্ডার এক্সপার্ট আছেন, নারী আইনজীবী সংগঠন আছে তাঁদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে এই তিক্ত ব্যাপারগুলা নিয়া কথা বলা। তিতা বললাম এইজন্যে যে,  নারীর মাতৃত্ব, নারীর অধিকার, নারীর প্রতি সহিংসতা এইসকল ইস্যুগুলা অধিকাংশের কাছে তিতা লাগে। যারা বলতে বলতে গলা ব্যথা কইরা ফেলছেন তাঁদের কাছেও তিতা লাগে, যে নারী আর পুরুষেরা শুনতে শুনতে আর অন্য কান দিয়া বাইর কইরা দিতে দিতে বিরক্ত হইয়া গেছেন তাঁদের কাছেও লাগে। আমার মনে হয় সেই ঢাকাইয়া নারীর লেবুর রসের মেটাফোরটা অতি লাগসই হইছে। লেবুটারে ব্যক্তি পুরুষ হিসাবে না নিয়া পিতৃতান্ত্রিকতা হিসাবে চিন্তা করলে আমার কথার লগেও মিলে। লেবু কচলাইলে তো তিতাই হয়।
লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 326
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    326
    Shares

লেখাটি ২,৭৮৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.