অসভ্য বাঙালির সভ্য হওয়ার প্রচেষ্টা, সমকাম অবৈধ!

0

শাকিল মাহমুদ:

– শেষে তুই!
– কী আমি?
– সমকামী হইলি?
– কীভাবে?
– এই যে ফেসবুকে সমকামীদের যৌন স্বাধীনতা চেয়ে এত এতো স্ট্যাটাস দিচ্ছিস!!
– এতেই আমি সমকামী?
– একজন সমকামী-ই তো সমকামীর অধিকারর চায়!
– একজন মানুষ কি মানুষের অধিকার চায় না?

সমকামীরা মানুষ?
– মানুষ নয়!(?) কেন এমনটা মনে হলো?
মানুষ হলে কি ছেলে-ছেলে, মেয়ে-মেয়ে যৌন মিলন করতে পারে? ওরা তো পশুর চাইতেও খারাপ।
– তাই নাকি? পশু-পাখিরাও তো অধিকাংশ সমকামী। তা তারা কী হবে?
– এতো কিছু বুঝি না। আমাদের সংস্কৃতিতে সমকাম গ্রহণযোগ্য না।
– আচ্ছা! এই অগ্রহণযোগ্য মানসিকতা সম্পন্ন সংস্কৃতি নিয়ে আবার সভ্য হওয়ার আকুতি-মিনতি? বেশ, বেশ।
– কী বলতে চাস? সমকাম মেনে নিলেই সভ্য হওয়া যায়?
-আমি তো মানতে বলিনি। আর কখনও বলবো না “সমকামিতাকে মেনে নাও” কেননা সত্য জোর করে মানানো যায় না।

-কোনটা সত্য! সমকামীরা বিকৃত মস্তিস্কের।
– প্রাকৃতিক প্রদত্ত অনুভূতি অর্থাৎ যৌন চাহিদা পূরণে একে অন্যের সহিত মিলিত হওয়া যদি বিকৃত মস্তিস্কের পরিচয় হয়, তবে পৃথিবীর প্রত্যেক প্রাণী-ই বিকৃত মস্তিস্কের পরিচায়ক। সমকামীরা নিজ পছন্দের মানুষ খুঁজে যৌন চাহিদা মেটায়, যেমনটা বিপরীতকামীরা মেটায়। তবে এখানে বিকৃত মানসিকতা কোথায় পাওয়া গেলো?
নিরবতা….

একটা বাস্তব ঘটনা বলি। এটা থেকে খানিকটা বুঝবেন সমকামীদের কতটা হেয় করে দেখা হয়। তা পরিবার ও সমাজ-রাষ্ট্রে। 

আপনি একজন পুরুষ। আপনি একজন নারীর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন এবং এক পর্যায়ে ওই নারীর সাথে যৌন সম্পর্ক করেছেন।
তাহলে সমকামীদের নিয়ে এতো আপত্তি কেন আপনাদের? তারাও তো তাদের পছন্দমত সঙ্গী বেছে নেয় এবং যৌন সম্পর্ক করে। আপনার পছন্দ, যৌন সম্পর্ক যদি বৈধতা পায়, তবে সমকামীদের পছন্দ, যৌন সম্পর্ককে কেন অবৈধতার আঁচলে ঢেকে দেয়া হয়?

সমকামীদের নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে আমার এক্টিভিটি সচল দেখে অনেকেই ভাবছেন আমি সমকামী। ভাবতে পারেন, আমার কোনো আপত্তি নেই। শুধু আপত্তি আপনার যৌন মিলন বৈধ হলে সমকামীদের কেন অবৈধ!(?)

আপনি যদি আপনার পছন্দের মানুষের সাথে বিছানা ভাগ করতে পারেন এবং তা যদি বৈধ হয় তবে একজন সমকামী নিজের পছন্দ মত কারো সাথে বিছানা ভাগ করলে আপনাদের সমস্যা কী?

এখন প্রশ্ন করবেন, ওকে, আমাদের কোনো সমস্যা নেই। তবে আমাদের সংস্কৃতিতে কি সমকামিতা গ্রহণযোগ্য?
এখন কথা হচ্ছে, যে সংস্কৃতি কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয়ে আজও মান্ধাতার আমলে পড়ে আছে, সে সংস্কৃতিতে আধুনিক কিছুই মানান সই নয়।
অথচ পশ্চিমবঙ্গ যেখানে বাঙালি সংস্কৃতি এই বঙ্গের চাইতে প্রবল, সেখানেও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে, আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে। ভারতের আদালতে সমকামিতাকে বৈধতা দেয়া হয়। সেখানে এই বঙ্গে সমকাম বৈধতা তো দূরে থাক, সমকামীদের গ্রেফতার করা হয়, বিনা বিচারে আটক রাখা হয়।

সভ্যতার আধুনিকায়ন ঠিকই হয়েছে। কিন্তু এই বঙ্গের বাঙালিরা আজও ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সংস্কৃতির মান্দাতার আমলের কুসংস্কারে অসভ্যই রয়ে গেছে।

যৌনতা যদি মানসিক রোগ হয় তবে নিঃসন্দেহে প্রচলিত তথা নারী-পুরুষের যৌনতাও মানসিক রোগ।
সমকাম বিজ্ঞান সম্মত এবং প্রকৃতি প্রদত্ত। ১৯৭৩ সালের ১৫ ই ডিসেম্বর American Psychiatric Aassociation বিজ্ঞানসম্মত আলোচনার মাধ্যমে একমত হন যে, সমকামিতা কোনো নোংরা ব্যাপার নয়, নয় কোনো মানসিক ব্যাধি। এ হলো যৌনতার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি।
অথচ সমকামিতাকে অপরাধ গণ্য করে শাস্তিস্বরূপ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বিরাজমান!

আশ্চর্য হই যেখানে ধর্ষণের শাস্তি যাবজ্জীবন সেখানে ভালবাসার শাস্তিও যাবজ্জীবন!
অথচ ধর্ষক ধর্ষণ করে বহাল তবিয়তে থাকে আর ভালবেসে সমকামীরা লাঞ্ছিত হয়, কারাভোগ করে।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সমকাম বৈধতা পেলেও ধর্ম-সংস্কৃতির ধোঁয়া তুলেও সমকামকে অপরাধ বলে গণ্য করা হচ্ছে এবং ধর্ষণের অপরাধস্বরূপ শাস্তি দেয়া হচ্ছে!

সমকাম প্রকৃতি প্রদত্ত স্বাভাবিক যৌন প্রবৃত্তি। মানসিক রোগ, শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে ভালবাসাকে রাষ্ট্রের কলুষিত করার প্রবণতা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সামিল।

সাম্প্রতিক সময়ে বাঙলাদেশে ধর্ষণের তোড়জোড় বেশ। ধর্ষক ধর্ষণ করছে, প্রসাশন খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিন্তু ধর্ষক যে প্রশাসনের নাকের ডগায় তা প্রশাসন দেখেই না। দেখে না নাকি, না দেখার ভান করে, ঠিক বুঝি না। অথচ সমকামীদের বিনা অজুহাতে কেবল সমকামী বলে গ্রেফতার করে আটক রাখা হয়! কেন? সমকামীদের অপরাধ কী?
হোমোসেক্সুয়াল বা সমকামিতা!

আমরা বাঙলাদেশে সমকামীদের দেখতে পাই না, এমন না যে দেশে সমকামী নেই।
আমাদের দেশে অসংখ্য সমকামী আছে, কিন্তু তারা স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে না।
এর পেছনে কারণ কী? কী কারণে সমকামীরা স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে না? যেখানে ধর্ষকদের জন্য এই দেশ অভয়ারণ্য, সেখানে সমকামীদের জন্য বিপদ স্থান কেন?

এর মূল কারণ অজ্ঞতা। বিজ্ঞানের পরিপূর্ণ আলোর ছোঁয়া আমাদের দেশের জনগণের ওপর পড়েনি। তাছাড়াও এদেশের প্রগতিবাদী সুশীল সমকামিতাকে আমাদের সংস্কৃতি না বলে তিরস্কার করে সমকামীদের প্রতি নোংরা মানসিকতার পরিচয় দেয়।
যেখানে বিপরীতকামীরা বা বিষমকামীরা নিজ ইচ্ছায় যৌন সুখ উপভোগ করতে পারে সেখানেসমকামীরা কেন নিজ ইচ্ছায় যৌন সুখ উপভোগ করতে পারে না?

পরিশেষে প্রশ্ন চলমান। লড়াই জারি থাকলো….

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 323
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    323
    Shares

লেখাটি ৬,৪১৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.