লুকানো ডায়েরি থেকে – শেষ পর্ব

0

চেনা অপরিচিতা:

আমার রাত-দিনগুলো আহাজারিতে পরিণত হয়। বুকের ভেতর থেকে ডাক আসে, “আম্মা! আম্মা!” আমার আম্মা ঠাণ্ডায় শুয়ে আছে। এখনও শীতকালে ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করতে গেলে ভাবি আমার আম্মাকে যখন গোসল করিয়েছিল তখন আম্মার ও হয়তো ঠাণ্ডা লেগেছিল, তার তুলনায় এই ঠাণ্ডা কিছুই না। আমার ভেতরটা ঝাঁঝরা হয়ে থাকে, আমার সাথে আমার ব্যথায় আমার স্বামীও কাতরায়।

আমার শিশুটিকে খালার কাছে রেখে আমি বাবার কাছে যাই। কিন্তু ও বাড়ি থাকি না। দুপুর পর্যন্ত থেকে ফিরে আসি বাচ্চার কাছে। ঐ বাড়িতে থাকলে সবকিছুতে আম্মাকে মনে পড়ে। আমি অসুস্থ হয়ে যাই। তখন নতুন করে বুঝতে পারি আমার শ্বাস কষ্ট আছে। সেখানে না পাই কাঁদার জন্য একটা বুক না পরিপূর্ণ সহানুভুতি নিয়ে থাকে কোন কাছের লোক। আমার বাবা এত শোকেও বৈষয়িক দিক দিয়ে চরম সতর্কতায় কিছু সই করিয়ে নেয় যাতে আমার মায়ের সম্পত্তিতে সম অংশীদার  হন আমাদের দুই ভাইবোনের সাথে।

আমার মাকে যেদিন দাফন করা হয় সেদিন বাড়িতে অনেক লোক। আমার স্বামী আর ভাই আমার মাকে আনতে যায়। এ সময় আমার বাবা আমার এক মামাকে ডেকে নানা কথা বলেন। তার মাঝে এও বলেন আমার বিয়ে অবৈধ আমার বাচ্চা অবৈধ। আমার স্বামীর উপস্থিতিতে তিনি আড়ালে চলে যান এবং বিরক্তিসূচক কথা বলতে থাকেন।

একটা মানুষ যখন চলে যায় পাড়া প্রতিবেশি সেই নাটকটা বেশ এনজয় করে। আমার মাকে যখন শেষবারের মতো দেখতে গেলাম তখন আমি আমার মধ্যে ছিলাম না। আমার বুকের ভেতর থেকে একটা পাগলি আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে চেঁচায়, অ্যাম্বুলেন্সের জানলা ভেঙ্গে ফেলতে চায়। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। আমার মায়ের কাছের বন্ধুটিকেই দেখলাম কুলখানির দিন আড়ালে এক প্যাকেট খাবার সরিয়ে আরেকটি প্যাকেট চেয়ে নিল। এই মহিলা আমার শ্বশুরবাড়ির তথ্য আমার বাবা-মাকে এনে দিত যা ভাল কিছু ছিল না।

পাড়া প্রতিবেশীর সান্ত্বনার চেয়ে আমার ব্যাপারে কৌতূহল ছিল আসীম। আমার স্বামীকে মেনে নেবে কিনা অথবা আমার বাবা মা’র ছড়ানো তথ্যগুলো মিলিয়ে দেখার আনন্দ তো অল্প না।     

যাই হোক, আমার মাকে নিয়ে গেল। বিবেকের তাড়নায় দাফনের দিন বাচ্চাটিকে নিয়ে রয়ে গেলাম মায়ের বাড়ি। কিন্তু বাচ্চা তো এখানে কাউকে চেনে না। সে আমার গায়ে সুপার গ্লু হয়ে সেঁটে রইল। কারো কাছে যায় না। কাজের লোকরা অনেক চেষ্টা করলেও আমার ভাইয়ের স্ত্রী চেষ্টা করেননি। একদিক দিয়ে ভালই হয়েছে।

আমি পরদিন সন্ধ্যায় চলে এলাম না খেয়ে। আমার স্বামী অবাক হল। কিন্তু, আমার লোক দেখানো কর্তব্য পালনের চেয়ে আমার ছোট্ট ঘরের স্বস্তি আমার কাছে অধিক জরুরি মনে হল। আমার বাবাও আটকাননি। আমার স্বামী কুলখানির দিন আসতে চেয়েছিল। আমি নির্লজ্জের মত বলেছি, “ থাক আসতে হবে না।” কারন আমার বাবা চায়নি।

তারপর অনেক কিছুই হয়েছে। এতকিছু আর লিখতে ইচ্ছে করছে না। নানান জনের নানা অপমান, অবহেলা দেখেছি, সয়েছি। সেসব আর না লিখি। লুকানো ডায়েরি থেকে আমি বিদায় নিচ্ছি। তবে, জীবনের অনেকগুলো বছর পেরিয়ে আজ কিছু উপলব্ধি হয়েছে, যেগুলো বলে ইতি টানতে চাই-

*  কারো উপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজের কাজ নিজে করাটাই যুক্তিযুক্ত। অনেক কাছের সম্পর্ক পিঠ ফিরিয়ে চমকে দিতে পারে, ব্যাথিত করতে পারে। তাই যেকোন কিছুর জন্য তৈরি থাকা ভাল।

* বাবা-মা বা যে কাউকে তখনই সাহায্য করা সম্ভব যখন তিনি আপনার সাহায্য নিতে ঘৃণা বোধ না করবেন। রক্তীয় কেউ আপনার খোঁজ রাখবেন এই জমানা এখন নাই। হাই হ্যালো ফেসবুক পর্যন্ত। কেউ আপনার বিপদে ডাকলে আসবে না।

* বাচ্চাকে দয়া করে অতিরিক্ত প্রেশারে রাখবেন না।

* মেয়ে বাচ্চাকে কোন ছেলেমানুষের কোলে দেওয়ার ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করুন।

* বাচ্চাদের নিয়ে আমরা অনেকেই ঠাট্টা তামাশা করি। কিন্তু ও ছোট হলেও ওর নিজস্ব ব্যক্তিত্ব আছে, আছে মান অপমান বোধ। ছোটবেলা থেকে যারা তাচ্ছিল্য পেয়ে বড় হয় তারা বড় হয়ে কোন কাজে কনফিডেন্স পায় না।

পৃথিবী এখন অনেক উদার। যে কন্টকাকীর্ণ পথ আমি পেরিয়েছি তা যেন আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে পেরোতে  না হয়।   

লেখাটি ২,৯৬০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.