আমি বেশ্যা নই-২

0

তামান্না ইসলাম:

মাকে জামান আঙ্কেলের সাথে ওই অবস্থায় দেখে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিল রুমকি, সে যখন ডাইনিং রুম থেকে ড্রয়িং রুমে এসেছে তখনো ভয়ে থর থর করে কাঁপছে, তার অবচেতন মন বলছে কিছু একটা অন্যায় হচ্ছে, ভয়ঙ্কর অন্যায়। সেটা কী সে হয়তো জানে, তবে ভীষণ অস্পষ্ট ভাবে, আর  পুরোটা নয়। ততক্ষণে কিছুটা সামলে নিয়েছে রেবা আর জামান সাহেব। হতভম্ব রেবা উঠে এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরতেই আটকে রাখা কান্নার দমকটা ছিটকে বেরিয়ে এলো রুমকির গলা থেকে। মাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে দুহাতে মুখ ঢেকে দৌড়ে চলে গেলো নিজের রুমে। 
পরদিন থেকে মেয়েটা যেন বোবা হয়ে গেছে। প্রয়োজনের বাইরে একটি কথাও বলে না, হাসে না। আর স্কুল থেকে এসে পুরোটা সময় বাবাকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকে। রেবা তারেকের রুমে ঢুকলেই মুখ শক্ত করে উঠে চলে আসে। একদিন তো রেবাকে বেরই করে দিল নিষ্ঠুরভাবে ‘বাবা এখন ঘুমুচ্ছে, তোমার এখানে কোনো প্রয়োজন নেই।’ আর হ্যাঁ, রেবাকে সে একবারও আর ভুলেও ‘মা’ বলে ডাকছে না। 
সেই ভয়ঙ্কর রাতের পর থেকে খুনের চিন্তাটা মাথা থেকে নামাতে পারছে না রেবা। মেয়ের সামনে সে আর চোখ তুলে তাকাতে পারে না। কতবার ইচ্ছে করে ওর মুখে ‘মা’ ডাক শুনতে। কিন্তু মেয়েটা যেন এক ধাক্কায় যোজন যোজন দূরে চলে গেছে। আর বয়সও বেড়ে গেছে কয়েক বছর।
রেবার মাঝে মাঝে পাগল পাগল লাগে। ইচ্ছে করে নিজেই যদি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে পারতো। রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটে, ওর এলোমেলো ভাবনায় বাঁধা দিয়ে ছোট্ট রনি হয়তো ঘুমের মধ্যে কেঁদে উঠে ওর গলা জড়িয়ে ধরে ছোট ছোট হাত দুটি দিয়ে। ও চলে গেলে এই বাচ্চা দুটোর কী হবে? রুমকি, ওর অনেক আদরের রুমকি সোনার কী হবে? ওকেও যদি শেয়াল-কুকুররা ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়? আর ভাবতে পারে না রেবা। তার দম বন্ধ হয়ে আসে। বিছানা থেকে উঠে বার বার রুমকির ঘরের দরজা থেকে উঁকি মেরে দেখে, ও ঠিক আছে কিনা, ভেতরে ঢোকার সাহস হয় না, মেয়েটা এক কঠিন দেয়াল তুলে দিয়েছে। 
কিছুদিন পর গভীর রাতে  ঘুম  আসছে না, হঠাৎ কানে আসলো তারেকের ঘর থেকে একটা অদ্ভুত আওয়াজ। খুব অস্পষ্ট, অনেকটা গোঙ্গানির মতো। প্রচণ্ড ভয়ে দৌড়ে গেলো রেবা। তারেক ভীষণ ঘামছে, চোখ দুটো ঘোলাটে। তীব্র ব্যাথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে শরীর। রেবার মাথায় কিছুই আসছে না। 
‘রুমকি ইইইই, তোর বাবা যেন কেমন করছে।’ ওর ডাকে ঘুম ভেঙ্গে ছুটে এসেছে রুমকিও। দুজনের একজন পানি আনছে, আরেকজন ওর গায়ের কাপড় সরিয়ে দিচ্ছে। অসহায় মা-মেয়ে কী করবে কোন দিশা পাচ্ছে না। রেবা ভাবছে, ওকে হাসপাতালে নেওয়া দরকার এখনই, এম্বুলেন্স ডাকলে কতক্ষণ লাগে, তাছাড়া ওর হাত একদম খালি। সেদিনের পর থেকে জামান সাহেবের কাছ থেকে টাকা আসা কমে গেছে অনেক। কোনো উপায় না দেখে মেয়ের দিকে আড় চোখে তাকিয়ে সে জামান সাহবকেই ফোন দিল, মনে মনে ভাবছে এই টাকাটা সে ধার হিসাবেই নেবে, গুনে গুনে শোধ করবে, কিন্তু তারেককে তো সে চোখের সামনে মরে যেতে দিতে পারে না। জামান সাহবকে ঘটনাটা বুঝিয়ে বলে টাকা আর গাড়ি পাঠানোর কথা বলতেই সে কেমন করে যেন রাজি হয়ে গেলো। 
ফোনটা রেখে রুমকির দিকে সে আর তাকাতে পারছে না। ভাগ্যিস আগে থেকেই চোখ ভরা জল ছিল। নতুন চোখের পানিটা আর মেয়ের সামনে লুকাতে হচ্ছে না। ওর দিকে না তাকিয়েও রেবা বুঝতে পারছে ওর তীব্র দৃষ্টি রেবার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টি কষ্টে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাওয়া দৃষ্টি, অবিশ্বাসের দৃষ্টি। 
বিশ মিনিট সময়কে মনে হচ্ছিল অনন্তকাল। একদিকে প্রতিটা মুহূর্তে মনে হচ্ছে তারেকের কিছু হয়ে গেলো নাকি, অন্যদিকে রুমকির সেই দৃশটির সামনে মাটির সাথে মিশে যাচ্ছিল রেবা। কী করার ছিল তার? একদিন না একদিন রুমকি বুঝবে, সেদিন মায়ের প্রতি তীব্র ঘৃণাটা হয়তো আর থাকবে না। 
কলিংবেলের শব্দে দৌড়ে গেলো রেবা। একি, এতো রাতে জামান সাহেব নিজেই চলে এসেছেন? 
‘এতোগুলো টাকা ড্রাইভারের হাতে পাঠানো সেফ না, তাছাড়া তোমার এই অবস্থায় তোমার তো মানসিক সাপোর্টও দরকার।’ বলতে বলতেই রেবাকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে ঘরে ঢুকেছেন  তিনি। দরজায় কখন যেন নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছে রুমকি। রেবা জোর করে নিজেকে ছাড়াতে চেষ্টা করছে, ‘কী করছেন আপনি? আপনার মনে কি একটুও মায়া দয়া  নেই?’ 
‘দয়া আছে বলেই তো গভীর রাতে ছুটে ……’ কথাটা শেষ করতে পারলো না জামান সাহেব, কখন যেন রুমকি রান্না ঘরের বড় ধারালো ছুরিটা পিছন থেকে ঢুকিয়ে দিয়েছে ওনাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে। 
পুলিশ আর এম্বুলেন্স একই সাথে এসেছে, তাদেরকে ভীষণ দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ফেলে দিয়েছে এই পরিবার। তারেক নামের ভদ্রলোক অচেতন, তাকে এখনই হাসপাতালে নিতে হবে। তার স্ত্রী রেবার কথায় কিছুই বোঝা যাচ্ছে না, এলোমেলো ভাবে বার বার বলছে, ‘খুনটা আমি করেছি, আমি, আপনারা আমাকে শাস্তি দিন। আর ওকে শিগগিরই হাসপাতালে নিয়ে যান।’ ওদিকে কিশোরী মেয়েটির ফ্রক রক্তে ভেসে যাচ্ছে। ছোট্ট ছেলেটি অঘোরে ঘুমুচ্ছিল, এই মাত্র ঘুম ভেঙ্গে ‘মা মা’ বলে ভয় পেয়ে কাঁদছে।    
আগের পর্বটির লিংক:
লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

লেখাটি ১০,১৩৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.