অন্যায়ের অনুমোদন নয়, সুবিচারের দৃষ্টান্ত প্রয়োজন

0

জিনাত হাসিবা স্বর্ণা:

কিছু ‘সংগ্রামী’ মানুষ ‘বঞ্চিত’ মানুষের কথা ভাবতে গিয়ে এমন হারে শ্রেণী বিদ্বেষী হয়ে উঠছেন যে অনেক সময় মনে করছেন যেহেতু ‘শোষিত’ মানুষের পাশে আমরা এখনো ঠিকঠাক দাঁড়াতে পারিনি তাই আর কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার আমাদের প্রয়োজন নেই। বাকি সব অন্যায় ‘হালাল’ হয়ে গেছে।

ছোট্ট এক টুকরো ফেটে পড়লাম সেদিন সকালে। প্রসঙ্গ বনানী ধর্ষণ এবং দুই শিক্ষার্থী। আশপাশের পরিচিত জনদের কাছে ন্যুনতম কিছু প্রত্যাশা থাকে, অসংবেদনশীল মন্তব্য নিতে পারি না তাদের কাছ থেকে। কিছুক্ষণ দাঁতে দাঁত চেপে কথোপকথন, তারপর চিৎকার। এঘর ছাড়িয়ে ওঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলাম। অপর পক্ষের গুটিয়ে যাওয়া দেখলাম। যা কিছু বলার বলা শেষে সামলে নিয়ে এহেন অসহনীয় মন্তব্যে ক্ষ্যান্ত দেওয়ার অনুরোধ রাখলাম। শেষমেষ অঝোরে ঝরলাম, মিনিট কয়েক।

বছর পাঁচেক আগে একশনএইড বাংলাদেশে কাজে ঢুকে প্রথম দিকে একটা শব্দ এবং এর ব্যাখ্যা শিখেছিলাম। এখানে ‘দরিদ্র‍’ শব্দটা এড়ানো হয়। কাউকে দরিদ্র বলা হয়না কারণ দারিদ্র‍্য একটা অবস্থা এবং মানুষ এখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারে; সুতরাং কোনো মানুষ দরিদ্র বলে চিহ্নিত করাটা ভুল। ‘দরিদ্র‍ জনগোষ্ঠী’ শব্দটার বিকল্প হিসেবে তাই ব্যবহার করা হয় ‘দারিদ্র‍্যে বসবাসরত মানুষ’। পুরো ব্যাপারটা আমার খুব ভালো লেগেছিলো কারণ এই বিষয়টা আমি রন্ধ্রে রন্ধ্রে জানি।

দারিদ্র‍্যে পড়েছিলাম আমিও, পড়েছিলাম পারিবারিক ধ্বসে। বহু সাধনায় কাটিয়ে উঠেছি। বের হয়ে এসেছি নিজের চেষ্টা, দৃঢ়তা আর অনেকের সহযোগিতায়। এই যে বের হয়ে এসেছি, এটা নিশ্চয়ই আমার অন্যায় নয়?

অন্যায়ের কথা আসছে কারণ কেউ যখন বলেন “এতো সব ‘সেন্সিটিভ’ রেপ এর ঘটনা ঘটছে সেগুলো নিয়ে তো এতো আকাশ বাতাস কাঁপায় না লোকে? বনানীর শিক্ষার্থীদের জন্য এতো কী? এক মাস পরে জানাইসে, ওরা রেপড হইসে তার তো কোনো প্রমাণ নাই”; তখন মনে হয় আমি দারিদ্র‍্য থেকে বের হয়ে এসে বিরাট ‘অন্যায়’ করে ফেলেছি (ধর্ষণের কথা মানুষ আজীবন চেপে যেতে পারে শুধুমাত্র এইসব কটুকথা এড়াতে, একমাস তো কিছুই না!)।

আমাকে আজ প্রভাবশালী কেউ নির্যাতনের চূড়ান্ত করে গেলেও আমার আশপাশের ‘বন্ধু-সহকর্মী-আত্মীয়-পরিজন-অনাত্মীয়’ অনেক মানুষই তাতে এমন প্রশ্ন তুলে অনুমোদন দিবেন। প্রতিবাদ না করা আর চুপ থাকার পক্ষে তারা নানারকম যুক্তি দিবেন এবং বুঝতেই পারবেন না এতে ধর্ষণকারীকে কিংবা কোনো প্রতাপশালীকে কী করে আরো ক্ষমতাবান করে তুলছেন এই আচরণের মাধ্যমে।

যেহেতু আমাকে ‘দরিদ্র’ বলে সহানুভূতি দেখানো যায়না, যেহেতু আমার জন্য সোচ্চার হলে নিজেকে বেশ ‘মানবিক’ বলে বোধ করার আত্মতৃপ্তিটুকু পাওয়া যায়না, যেহেতু আমার গায়ে ‘শোষিত’ সীলটি মারা নেই, যেহেতু আমাকে দেখেই ‘মানবিক লোকের’ চোখ ছলছল করে ওঠেনা, এবং যেহেতু আমি প্রতিবাদ করার সাহস এবং সুযোগ রাখি- সুতরাং আমার পাশে না দাঁড়ানোটা যায়েজ। শুধু তাই নয়, আমার পাশে না দাঁড়ানোর জন্য অন্যদেরো হাজারটা যুক্তি দেখিয়ে আমাকে কোণঠাসা করে ফেলবার পূর্ণ ‘অধিকার’ এই তথাকথিত ‘মানবিক’ লোকেরা রাখেন।

ব্যাপারটা এই রকম: “শোষিত মানুষের প্রতিবাদ করার শক্তি, সাহস আর সুযোগ নেই” বলে আমরা ক’দিন তাদের জন্য গলা ফাটাবো, তারপর “ওরা নিজেরা দাঁড়ালোনা আর সিস্টেম এতো ‘দূষিত’ যে ওরা কম্প্রোমাইজ করে ফেললো” বলে নিজেদের আত্মতৃপ্তিটুকু নিয়ে মহাসুখে নিজ নিজ জীবনে মনোনিবেশ করবো। এই ‘দরিদ্র আর শোষিত’ সীল মেরে দিয়ে যাদের অবস্থানের সুযোগ নিয়ে প্রতিনিয়ত করুণা করে আমরা নিজেদের ‘মানবিক’ ভাবার সুখ পাচ্ছি, তারা তাদের অবস্থান থেকে বের হয়ে আসুক এই মনোবাসনা আমাদের যেমন নেই; একই ভাবে উচ্চতর অবস্থানে আছে এমন কাউকে সুযোগ পেলেই হেয় করে, বায়বীয় লাথি মেরে, নিজের চেয়ে ভালো অবস্থানে থাকার পুরো রোষটুকু ঢেলে দিয়ে এক ধরনের সুখও আমরা পূর্ণ মাত্রায় উপভোগ করতে চাই।

মোট কথা ‘যে আমাকে’ দুরবস্থায় দেখে আপনি আপ্লুত হচ্ছেন আর গদগদ হচ্ছেন সহানুভূতিতে, ‘সেই আমাকেই’ সচ্ছল আর আত্মবিশ্বাসী দেখলে যতোভাবে সম্ভব হেয় প্রতিপন্ন করে বেশ একটা আরাম পাচ্ছেন আপনি। হ্যা আপনি, তথাকথিত ‘মানবিক’ মানুষটিকে বলছি- যে কিনা নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়ে ধর্ষণকে অনুমোদন দিচ্ছেন, যে মানুষটিকে আগাগোড়া বঞ্চিত ভেবে কষ্টে আর্দ্র হয়ে আপনি নিজেকে মহান ভাবার সুখ পান, তার বাইরে যে কারো ক্ষেত্রে। আপনিই, যে ভাবছেন বস্তির বা প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়েটির ধর্ষণের যেহেতু সুরাহা হয়নি তাই এ শহরে আত্মবিশ্বাসের সাথে চলাফেরা করা মেয়েটির সাথে ঘটে যাওয়া চরম অন্যায়টুর বিচার হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। যদি আপনি ভেবে থাকেন বনানীর দুই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণে উচ্চবাচ্য নিষ্প্রয়োজন- আপনাকে বলছি, নিজেকে ‘মানবিক’ ভাবার যে সুখে আপনি সুখী, তার পুরোটাই ফাঁপা!

একটা অন্যায়কে অন্য একটা অন্যায় দিয়ে অনুমোদন দেওয়ায় নয়, বরং একটা ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে আরো অনেক ক্ষেত্রে ন্যায় বিচারের জন্য উদাহরণ তৈরীতে আমাদের মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

চারদিকে অনাচারের দৌরাত্ম্য, তবু হতাশা চাইনা। চাই সুদিন আসুক। যে যার জায়গায় দাঁড়িয়ে ন্যায়ের শপথ নিক, হাত বাড়িয়ে দিক একে অন্যের প্রতি!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 170
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    170
    Shares

লেখাটি ৩৯২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.