কত সহজেই একজন মেয়েকে ঘায়েল করা যায় – তাই না?

0

রুনা নাসরীন:

জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সবকিছু মেয়েদেরকেই মেনে নিতে হবে – এমনই নিয়ম হয়ে গেছে আমাদের সমাজের। যে কোনো ঘটনাই ঘটুক না কেন ঘুরে ফিরে দোষের আঙ্গুলটা মেয়েদের দিকে উঠে। দোষী প্রমাণ না হলেও কেমন যেনো একটা সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা হয়।

সাধারণত মুরব্বিরা মেয়েদেরকে সবসময় এই উপদেশ বাণী শোনায়, সহনশীল হও, মানিয়ে চলো, মেনে নাও, সব ঠিক হয়ে যাবে। মানতেই হবে, আমাদের সমাজে ছেলে এবং মেয়েদের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেক কিছুই শুধু মুখে মুখে কাগজে কলমে শব্দে শব্দে আটকে আছে। মেয়েদের স্বাধীনতা এবং আধুনিকতার বাস্তবতা  অনেকাংশেই ভিন্ন যতই শিক্ষার হার বাড়ুক না কেন, যতই স্বাধীনতার পায়রা উড়ুক না কেন, মেয়েদেরকে প্রতিনিয়ত প্রতিটি ক্ষেত্রে পরাধীনতার বেড়াজাল টপকাতে হয়। অলিখিত জবাবদিহিতার মধ্যে থাকতে হয়। ঘরে-বাইরে সব জায়গায় অনুশাসনের রক্তচুক্ষুর মুখোমুখি হতে হয় এবং সবখানেই মেয়েদেরকে তার অবস্থান চড়া মূল্য দিয়ে পেতে হয়

ছেলেদের নির্দেশিত অনুশাসনে থাকলে কোন সমস্যা নেইসমস্যা তখনই হয়, যখন মেয়েরা ছেলেদের দেওয়া সীমারেখার বাইরে কিছু করে বা করতে পারে। তখন আশেপাশের অতি পরিচিত মানুষের মাঝে ‘যায় যায়’ রব উঠে। তাকে কথায় কাজে ও দৃষ্টিতে হেয় করার পাঁয়তারা করতে থাকে, চলতে থাকে আলোচনা সমালোচনা, দলবদ্ধ হয়ে অপদস্থ করা।

এসব কাজে ছেলেদের উৎসাহ উদ্দীপনার কোনও অভাব হয় না। খুব কম মেয়ে পারে এইসব পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে। নিজের অজান্তেই অবসাদে ভুগতে থাকে। এটাই যেন তার স্বাভাবিক পরিণতি ভেবে ভিতরে ভিতরে মরতে থাকে। মেনে নাও মেয়ে, মেনে নাও, সহ্য করো – এই শুনে শুনে তার বড় হওয়া। এ থেকে বের হওয়ার রাস্তা সে শিখেনি, বলা ভালো শেখানো হয়নি। পরিবার সমাজ তাকে প্রতিনিয়ত লোকলজ্জার ভয়ে গুটিয়ে থাকা শিখিয়েছে।    

সমাজে প্রতিষ্ঠিত এমন কোনও মেয়ে পাওয়া যাবে না যাদেরকে নিজ অবস্থানে আসতে কটাক্ষ বা বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নিএ সমাজে মেয়েদেরকে হেয় বা অপদস্থ করার মোক্ষম অস্ত্র হচ্ছে, খুব সহজে বলে ফেলা, মেয়েটা চরিত্রহীন। ভাবখানা এটিই হচ্ছে মেয়েদেরকে বিচারের আসল মানদণ্ড। ঘরে-বাইরে সবখানেই মেয়েদেরকে মানুষ ভাবার মানসিকতার বড়ই অভাব। মেয়েরা যেন মানুষ না, অন্য জীব। সমাজ বা পরিবারের দেওয়া নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে তারা কিছু করতে পারবে না। আসলে, যা অমানবিক, অন্যায় এবং অসুন্দর  তা  সবার জন্যই সমান হওয়া উচিছেলে বা মেয়ে বলে একই কাজের বা ভুলের জন্য ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বা মানদণ্ড হওয়া উচিৎ নয়। একই অপরাধের জন্য ছেলেদের প্রতি ঘরে-বাইরে সবার একটা উন্নাসিক ভাব থাকে, এড়িয়ে যাবার মানসিকতা থাকে। তাদের সব দোষ, সব অপরাধ সবকিছু লুকিয়ে রাখার একটা প্রবণতা থাকে। ছেলে বলে কথা। ভুল করে ফেলেছে বা হয়ে গেছে, পরবর্তীতে আর হবে না। পরিবার থেকেই শুরু হয় এই সমর্থনের প্রক্রিয়া এবং ধীরে ধীরে সে যা খুশী তা করার সুপ্ত বাসনা লুকিয়ে রাখে মনে। পরিবারেই ছেলেরা ছোটবেলা থেকে সেই পার্থক্যটা দেখে শুনে বুঝে বড় হয়।

কিন্তু মেয়েদের বেলায় যে শাসন-অনুশাসন, তার বেলায় তা নয়। পরিবারই তাকে মেয়েদেরকে অন্য জাতি বা আলাদা ভাবার একটা বিদ্বেষ ভাব তৈরি করে দেয়। দুঃখজনক হলেও সত্যি বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ছেলেদের প্রতি আদুরে আহ্লাদী মনোভাবের জন্য মা-বাবাই এই কাজটা করে থাকে।

অস্বীকার করার উপায় নেই, শিশুর আগমনে সবাই এখনও অধীর আগ্রহ নিয়ে শুনতে চায় ছেলে না মেয়ে। আমাদের সমাজ এখনো ছেলের মা হতে না পারলে বিভিন্নভাবে মেয়েদের জীবন বিপন্ন করে ফেলে। এই সমাজ প্রতিটি পদে পদে মেয়েদেরকে দাবিয়ে রাখার প্রক্রিয়া তৈরি করে রেখেছে। আমরা মেয়েরা অনেক সময় জেনে-বুঝে, ইচ্ছা-অনিচ্ছায় লোকলজ্জার ভয়ে সমঝোতা করে চলেছি যতক্ষণ না তা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে না যায়।

ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়, তবে সেগুলো উদাহরণ হিসেবেই বলা যায়, সাধারণ কোন ব্যাপার নয়। আসলে একজন মাকেই মানসিকভাবে শক্তিশালী হতে হবে, পরিবর্তন করতে হবে গতানুগতিক ধারা। ছেলেমেয়েদের জন্যআলাদা আলাদা শাসন অনুশাসন নয়, সমান মনোভাব পোষণ করতে হবে, ছেলে বা মেয়ে নয়,সন্তান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে ।

শুধু মেয়েকে নয়, আদরের ছেলেকেও না বলা এবং না শুনার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে । উচিৎ অনুচিত এর শিক্ষা শুধু মেয়েদের জন্য নয় । সময় বলছে অন্য কথা, চারিদিকে চোখ কান খোলা রাখুন বরং ছেলে বাচ্চার প্রতি বেশী মনোযোগী হতে হবে । ছেলের মা বলে কথা –  এই ভেবে উদাসীন থাকার এবং অহংকার করার সময় শেষ । উচ্চশিক্ষায় শুধু শিক্ষিত নয়, পাশাপাশি তার মানসিক গঠনের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে, বিশেষ করে মেয়েদের ব্যাপারে চিরাচরিত কুসংস্কার থেকে বের করে আনতে হবে এবং তা শুরুতেই । নানী দাদী মায়ের আদরে আহ্লাদেই ছোট থেকেই ছেলে বাচ্চাদের মধ্যে বেপরোয়া মনোভাব ও অস্বাভাবিক আচরণ করার প্রবণতা তৈরী হয়ে যায় এবং একসময় নিজেকে উচ্চ শ্রেণীর জীব মনে করতে থাকে। তার এই মনোভাবের উগ্র প্রকাশ ঘরেই করে প্রথম, কখনো মায়ের সাথে, কখনো বোনের সাথে এবং তা অন্যায় জেনেও সবাই মেনে নেয়, কারণ সে ছেলে, আদরের ছেলে বলে কথা, ভাই বলে কথা, তারপর যদি থাকে দাদী-নানী। তাদের হাঁক ডাক তো আছে – শাসন করার সময় কি শেষ নাকি? বাচ্চা ছেলে, বড় হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু ঠিক আর কখনো হয় না, কারণ আমরাই তাদের মনে স্বাতন্ত্র্যের বীজ রোপণ করে দেই।

আর নয়, অনেক হয়েছে। সময় হয়েছে চিরাচরিত চিত্রটা বদলাবার। শুরু করতে হবে পরিবার থেকে আজই, এখনই এবং তা আমাদেরকেই, মাকেই। শুধু মেয়েকে নয়, ছেলেমেয়ে দুইজনকেই একই শাসনে গড়ে তুলতে হবে, একই মূল্যবোধে। ছেলে বা মেয়ে হিসেবে নয়, সন্তান হিসেবে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ২,৭৬২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.