স্ল্যাং, এবিউস এবং ধর্ষণ: থিওরি নয়, অভিজ্ঞতার জেরই বৃহত্তম শিক্ষা

নৈরঞ্জনা:
গালাগালি বা স্ল্যাং সমাজের “নীচুতলা”-র মানুষের ভাষা নেই আর। না থাকার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট বুঝেছিলাম ২০১৪ সালে এক তৎকালীন বন্ধু তথা ফ্লিং এর থেকে। (তিনি আমাকে কখনও এবিউস করেন নি বলে রাখা ভালো)। জন্ম থেকে ব্যবহৃত সুশীল ভাষার কঠিন বর্ম ভেঙ্গে স্ল্যাং কে এক্সেপ্ট করে প্রয়োগ ও শুরু করি, কিন্তু মাদারচোদ বাঞ্চোত মাগি খানকি ইত্যাদি কে বাদ দিয়ে। শুধুমাত্র নিরপেক্ষ স্ল্যাং এ ধীরে ধীরে স্বচ্ছন্দ হচ্ছি। তখনও সদ্য শেখা জ্ঞান এবং এবিউস এর পার্থক্য শিখিনি, শিখেছি পরবর্তীতে নিজে এবিউসড হওয়াকালীন।
হাস্যকরভাবেই ‘খানকি’ বা ‘মাল’ কেন বলা উচিত নয় এ নিয়ে ঘন্টাখানিক লেকচার শোনার পরবর্তীতে লেকচারদাতার কাছ থেকেই ‘খানকি’, ‘মাগী’ ইত্যাদি উপাধি তে ভূষিত হবার অসীম সৌভাগ্য হয়, ফলস্বরূপ প্রবল শীত ও ফ্রস্ট বাইট নেমে আসে শরীর মনে। প্রথম উপলব্ধি করি স্ল্যাং ও এবিউস এর পার্থক্য। চুপ করে থাকা বাচাল ও নারীবাদীদের স্বভাব  নয়। আশীর্বাদ। 
বছরখানিক আগে এখানে (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে) একটা টিচার্স ট্রেনিং এ যাই। একজন ট্রেনি-র প্রশ্ন ছিল “কতখানি স্ল্যাং আমরা ক্লাসে পড়ানোর সময় ব্যবহার করতে পারি?”।প্রশ্ন শুনে চমকিত হই! ভাষা বা সাহিত্যের ক্লাসের প্রয়োজনীয়তায় নয়, “বিয়িং নাইস” যে জায়গা ও অধিবাসীদের কালচারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সেখানে একাডেমিয়ার মত সুঠাম নিয়ম বাঁধা পরিমন্ডলে স্ল্যাং!! ক্লাসে? ট্রেনার (প্রত্যেকেই এক্লেইমড প্রফেসর) দের উত্তর ছিল “যতখানি স্ল্যাং কোনরকম সেক্সুয়ালিটি, রেস বা ডিসেবিলিটি কে ডিমিন করেনা, বি কেয়ারফুল, বি অলওয়েজ কেয়ারফুল”। খেয়াল করি ষাটোর্দ্ধ প্রফেসর ‘ফাক’, ‘শিট’ ইত্যাদি অনায়াসে ব্যবহার করছেন “পার্ডন মাই ফ্রেঞ্চ” ফরমালিটির সঙ্গে মৃদু হাসি জুড়ে। নিশ্চিন্ত হই নিজস্ব উপলব্ধির রেফারেন্স পেয়ে। নিশ্চিন্ত হই টাইটল নাইন দুরূহ বর্ম তৈরি করে রেখেছে বলে। 
বন্ধুবান্ধব মহলে অষ্টপ্রহর মাদারচোদ, খানকি, বাঞ্চোত, মাগী, রেন্ডি শরীরে শিরশির ও মস্তিষ্কে প্রবল জ্বালা নিয়ে প্রায় চুপচাপ শুনে গেছি। শুনে গেছি আমার সুন্দরী রুমমেটের বুকের মাপ নিয়ে আলোচনা, তাকে দেখামাত্রই তার বুক লক্ষ্য না করলে নাকি কোন ফারগোবাসী সাচ্চা পুরুষ নয় এহেন মন্তব্য। (মন্তব্যকারী আসলে সত্যি বলছেন, না লুকিয়ে মনের কথা বলছেন। ভয় তো লুকিয়ে রাখা মানুষদের আরো বেশি)।
আমার মোটা কালো আফ্রিকান রুমমেট এর হ্যান্ডসাম ইরানিয়ান বয়ফ্রেন্ড কি দেখে যে তার সঙ্গে প্রেম করে তা আমার বুদ্ধিমত্তা ও শিক্ষায় সমাজের নরম সুস্বাদু স্তরে থাকা বন্ধুরা বুঝতে পারেন না। একসময় অব্দি এসবে গম্ভীর হয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করিনি। আমার অজুহাতের একমাত্র কারণ ছিল একা হয়ে যাবার ভয়। বিশ্বাস করুন না করুন একা হয়ে যাওয়া এদেশে খুব সহজ এবং ভয়ংকর যন্ত্রণাদায়ক। একঘরে হয়ে যাবার অভিজ্ঞতা জন্ম থেকে আমার বিস্তর। সলিচিউড কয়েকটি নিজস্ব ঘন্টার বেশি আমি ভালোবাসিনা। সুতরাং ভয় ছিল। যথেষ্ট প্রতিবাদ না করার কারণ হিসেবে অজুহাত খাড়া করি ১) আমাকে বলা হচ্ছে না। তারা আমাকে প্রকাশ্যে অসম্মান করে না। ২) তারা কেউই ধর্ষক নয়। বেসিক্যালি খুব খারাপ মানুষ নয়, জাস্ট অভ্যেসে বলে।
হ্যাঁ তাঁরা অভ্যেসে বলেন। অবশ্যই অভ্যেসে। তাঁদের হাতে আমি আমার সিক্রেট থেকে অচৈতন্যতা সবকিছু দিয়ে নিশ্চিন্ত বোধ করি শুধু আমার সেক্স অ্যাপিল মাইনাসের কোঠায় বলে নয়, তাঁরা যৌনাংগগতভাবে নৃশংস অত্যাচার করে ধর্ষণ কাউকেই করবেন না বলে আমার খান ৭০-৮০% আস্থা আছে। কিন্তু এই অভ্যেস গুলো হাজার হাজার বছরে কেন কিভাবে তৈরি হয়েছে তাঁরা জানেন কিন্তু মানেন না। আমাদের সব বায়াস, ভুল,  ঠিক গুণ বেগুণ খানিকটা অভেসেই। অভ্যেসবদল জরুরী। কিন্তু এ হিমশৈল ভাঙ্গা কঠিন।  
ভারতবর্ষকে বর্তমানে বেশিরভাগ মানুষ ভালো জিনিসের পাশাপাশি চেনে গরু এবং ধর্ষণ দিয়ে। কঠিন সত্য। যেকোন অন্য দেশের সামান্য ওয়ার্ল্ড নিউজ পড়া মানুষের সঙ্গে নতুন পরিচয়ে এই দুটি প্রশ্নের সম্মুখীন অন্তত আমি হয়েছি। এই গরু এবং ধর্ষণাক্রান্ত  সমাজে উচ্চকিত আঁতলামি বা ডিনায়াল বা একগুঁয়েপনার ঘোরে আপনারা বুঝতে পারছেন না শব্দগুলোকে অবসোলিট করে দেবার প্রয়োজনীয়তা। কারণ ভয় পাচ্ছেন, ক্ষমতা হারানোর ভয়। আপনার ভেতরের পাশবিকতা কে সাপ্রেস করে রাখার অক্ষমতাকে ঢাকছেন অবজ্ঞা দিয়ে। 
এবারে করণীয় কি? কেউ কেউ বলেছেন নিজেকে ‘তেমন জায়গায়’ নিয়ে যাও দেন রেইজ ইওর ভয়েস। সমস্যা হচ্ছে এই “তেমন জায়গা” র সংজ্ঞা টা আমি বুঝে উঠতে পারিনি। অর্থাৎ আপনার কোন সমাজগ্রহীত পরিমাপসম্পন্ন এচিভমেন্ট না থাকলে আপনি চুপ করে থাকবেন!! অথচ আপনি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন আম আদ্মি ইত্যাদি!! 
আপনি যেই হোন, আপনাকে অন্তত একটি মানুষ শুনছেই। সেখানেই আপনার কর্তব্য।
না মানুষ বেসিক্যালি বদলায় না। ভাষা ও শব্দকে অবসোলিট ঝট করে করে দেওয়া যায়না। সুতরাং আপনারা, যাঁরা যাঁরা এই প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন, অন্ততঃ আপনার সামনে যেকোন প্রজাতি সম্পর্কে ডিমিনিং কোন মন্তব্য করার আগে যেন আপনার পরিচিত মানুষ দের একবার ভাবতে হয় এমন আবহাওয়া তৈরি করুন। হ্যাঁ বিদ্রুপের ইঁট পাটকেল আসবে গ্যারান্টি। খান না দু একটা।
তবু ওই একবার থমকে যাওয়া আপনাকে বিদ্রুপ ছুঁড়ে দিতে, আটকাবে। দেখবেন আপনাকে শোনাতে আরো বেশি বলা হচ্ছে, একটু হাসুন তাদের অবুঝপনা ও ভয় গুলো দেখে, একটু একটু করে আটকাতে আটকাতে কমে আসবে অনেকখানি দূষণ। খেয়াল রাখুন এরকম আপনির সংখ্যাও কিছু কম নয়, এবং আপনারা জলে স্থলে নভে সর্বত্র বিচরণ করছেন। একা হয়ে যাবার ভয় পাবেন না, কারণ একা হয়ে যাওয়া ৭ বিলিওনের জগতে বস্তুতঃ অসম্ভব আপনি নিজে না চাইলে। আপনার এই স্ট্যান্ড ও যাপনে যারা আপনার থেকে দূরে যাচ্ছে যেতে দিন, তাদের ছাড়া আপনি সত্যি ভালো থাকবেন। আর অবশ্যই নিজে গুড় খাওয়া আগে বন্ধ করুন, সচেতন থাকুন নিজের ভুল টুকুকে শনাক্ত করে সারিয়ে তুলতে। ইগো অতি বিষম বস্তু।
শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.