মেয়েটির বাবার বন্ধুটি!

0

প্রান্ত পলাশ:

মেয়েটি ইন্টারমিডিয়েটে পড়ে। গ্রামের স্কুল ছেড়ে রাজধানী ঢাকায় নবাগত। কীই বা চেনে পথঘাট। গ্রামে মা-বাবা। তারাও সবসময় দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকে। একা একা মেয়েটি কী করছে। ঠিকমত খাচ্ছে তো? পথ ভুলে অন্য পথে যাচ্ছে না তো? রাস্তায় কারা শিস দিচ্ছে, কটুকথা বলে কারা ভিড়ে মিশে যাচ্ছে, কারা কনুইয়ের গুঁতো দিয়ে ভিড়ে লুকোচ্ছে…

মেয়েকে নিয়ে মা-বাবার দুশ্চিন্তার শেষ নেই। মার উদ্বেগ একটু বেশিই। সে নিজেই ‘কনুইয়ের গুঁতো’ খেতে খেতে বড় হয়েছে। পুরুষকে চেনে। স্বামীকেও হাড়ে হাড়ে চেনে।

গ্রাম থেকে কেউ ঢাকায় এলে, মা-বাবা তাকে বলে মেয়েকে যেন একটু দেখে আসে। তার হাতে এটা-ওটা পাঠায়। মেয়েটি কলেজ হোস্টেলে থাকে। একদিন বাবা মেয়েটিকে ফোনে জানায়, তার এক বন্ধু ঢাকায় যাবে। সে যেন দেখা করে, সুবিধা-অসুবিধা জানায়। বন্ধুর চোখে বাবা একবার মেয়েটিকে দেখবে। আদরের ছোট মেয়েটি কেমন আছে জানবে। হয়ত উদ্বেগও কিছুটা কমবে। কিন্তু হায় বাবার বন্ধুটি!

বাবার বন্ধুটি হোস্টেলের সামনে এসে মেয়েটিকে ফোন দেয়। মেয়েটি নিচে নেমে আসে। মা-বাবার খোঁজ-খবর নেয়। বাবার বন্ধু তো বাবাই! হোস্টেলের সামনেই এক দোকানে তারা বসে। চিকেন ফ্রাই অর্ডার দেয় বাবার বন্ধুটি। দুজনেই খাচ্ছে। হঠাৎ বাবার বন্ধুটি ফিসফিস করে বলে ওঠে, ‘ইশ, চিকেনের মতো আমরাও যদি শরীর ভাগাভাগি করে খাই তবে কেমন হবে?’

মেয়েটি হতভম্ব। গলায় আর চিকেন ঢুকছে না। এ কী বলল বাবার বন্ধুটি! কিভাবে বলতে পারল! দ্রুতই মেয়েটি উঠে যায়। বাবার বন্ধুটিও। হোস্টেলের সামনেই বাবার বন্ধুটি তাকে আবার বলে, ‘দু’ঘণ্টা সময় দেবে আমাকে? তোমাকে ভাল অ্যামাউন্ট দেব। অনর করব।’ মেয়েটি হোস্টেলে ঢুকে পড়ে। একা একা কাঁদে। বাবাকে সে কী বলবে এখন? এ কেমন বন্ধু বাবার?

মেয়েটির একটাই জোর প্রশ্ন : এত সাহস পায় কোত্থেকে, পুরুষ ব’লে?

পরে ফোনে বাবাকে তার ‘বন্ধুকৃত্য’ বলে। বাবা গ্রামের মুরব্বি দু’একজনকে সঙ্গে নিয়ে ওই ‘বন্ধুটিকে’ ডাকে। বসে। কিন্তু লোকটি সব অস্বীকার করে। মুরব্বিরা বাবাকে বলে, ‘থাক চেপে যাও। তোমারই মানসম্মান যাবে!’ সত্যিই, মানসম্মান এক আজব বস্তু এ সমাজের মানুষের কাছে। যে অন্যায় করল, তার মানসম্মান অটুট থাকল; আর যে অন্যায়ের শিকার, তার মানসম্মান গেল গেল রব!

আমার বলতে দ্বিধা নেই, ইন্টারমিডিয়েট-পড়া ওই মেয়েটিই আমার পূর্ণাঙ্গিণী। ওর মুখে যখন তার বাবার বন্ধুর এ কা- শুনি, তখন সহ্য করতে পারি না। মাথায় খুন চাপে। প্রতিটি মেয়ের জীবনেই এত অসংখ্য নির্যাতনের গল্প। আমার মনে হয়, প্রতিটি মেয়ে যদি তার জীবনে ঘটে যাওয়া নির্যাতনগুলো লেখে, তবে পৃথিবীর ইতিহাস হবে নারী নির্যাতনের ইতিহাস।

‘এত সাহস পায় কোত্থেকে, পুরুষ ব’লে?’ যুগ যুগ ধরে পুরুষ নারীকে ভোগ্যবস্তু ভেবে এসেছে। দাসী ভেবেছে। ধর্মগুলোও নারীকে দাসী ছাড়া ন্যূনতম সম্মান দেয়নি। নারীকে লেখাপড়া থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। ধর্মগ্রন্থগুলো যেহেতু পুরুষের লেখা, তাই যতরকম উপায় আছে নারীকে দমিয়ে রাখার, সবগুলোই লিখেছে তারা। শিক্ষাহীনতা আর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা নারীকে শারীরিক-মানসিকভাবে দুর্বল করেছে। পুরুষ হয়েছে একচ্ছত্র ক্ষমতাবান। ক্ষমতার সমার্থক হয়েছে পুরুষ। তাই বাবার বন্ধুটিও সাহস পায়। কন্যাসম মেয়েটির সামনে সে আর ‘বাবার বন্ধু’ থাকে না, হয়ে ওঠে শুধুই পুরুষ!

এখন পত্রিকার পাতা খুললেই ধর্ষণ। এক হিশাব অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ত্রিশ নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে বাংলাদেশে। ধর্ষণের পর খুনও হচ্ছে নারী। সারা পৃথিবীতেই নারীর প্রতি নৃশংস হওয়ার খবর হররোজ পাওয়া যায়। নির্যাতনের শিকার শিশুও। পায়ুপথে বায়ু ঢুকিয়ে শিশুহত্যার মতো বর্বরদৃশ্য আমাদেরকে দেখতে হয়েছে। গতকালও এক সংবাদে পড়লাম, চুরির অভিযোগে এক শিশুকে বস্তার ভেতর ঢুকিয়ে বেদম পেটানো হয়েছে। তাও গ্রাম্য সালিশে, সবার উপস্থিতিতে। মানুষের এহেন ‘সহনশীলতায়’ আমি স্তম্ভিত হয়ে গেছি, হতাশ হয়ে গেছি। অশ্রু বিসর্জন ছাড়া কী করার আছে, জানা নেই!

ওদিকে, গতকাল সমকামিতার অভিযোগ এনে ২৮ তরুণকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রাষ্ট্র মানুষের যৌনতাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। মানুষের যৌনতাকে আইন দ্বারা অপরাধ গণ্য করিয়ে মানুষের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে রাষ্ট্র। বাংলাদেশের আইনের চোখে সমকামিতা অপরাধ। আমরা এ ধরনের আইনের বাতিল চাই। রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রত্যেক নাগরিককে সুরক্ষা দেওয়া, নির্যাতন-হয়রানি করা নয়। বছর বছর ভ্যাট বাড়ছে, সেইসাথে নির্যাতনও। আমরা কি তবে ভ্যাট দিয়ে নির্যাতন কিনছি?

কুমিল্লার ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় তনু ধর্ষণ-হত্যার ঘটনায় বাংলাদেশে আনাচে-কানাচেও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। তারপরও আমরা খুনিদের শাস্তি হতে দেখিনি। এরপর আরও কত তনু ধর্ষণের শিকার হল, আমাদের মন থেকে মুছে গেল একটার পর একটা নাম। প্রতিদিন বাসায়, রাস্তায়, অফিসে, উঠতে-বসতে কত নারী নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। সেই নারীর মন থেকেও হয়ত মুছে যাচ্ছে টুকরো টুকরো নির্যাতনগুলো। বিচারহীনতার সংস্কৃতি বাংলাদেশকে বিপন্ন করে তুলেছে।

প্রত্যেক শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে তাই এগিয়ে আসতে হবে। যে যার অবস্থান থেকে প্রতিবাদ করতে হবে। জোরগলায় বিচার চাইতে হবে। আমরা যদি বাধ্য না করি, রাষ্ট্র দেবে কেন?

লেখক : কবি ও সাংবাদিক

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.