কারো ভাদ্রমাস, কারো মাথায় হাত

0

সাদিয়া রহমান:

শাশ্বতী বিপ্লব ম্যাডামের লেখাটা পড়লাম। একবার, দুইবার, তিনবার। বার বার পড়েও এহেন প্রতিক্রিয়ার কারণ মাথায় ঢুকলো না।

অনেক ধরনের আপত্তি দেখলাম। কেনো গণহারে সকল পুরুষকে এইরকম করে বললেন উনি! কেনো জেনেরালাইজ করলেন! সব পুরুষ খারাপ না। উনার চরিত্র, উনার হেনো তেনো।

আমরা এমনই একটা জাতি যারা একটা মেয়ে চব্বিশ ঘন্টা বাসায় থেকে নেহাতই হিন্দি সিরিয়াল দেখে জীবন কাটালেও তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলি, আবার কেউ বাইরে ঘুরলেও চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলি। আমাদের জীবনটা জোর করে সম্মান সর্বস্ব জীবন করার চেষ্টা করা হয়। তাই এ নিয়ে নতুন করে কিছুই বলার নাই।

একটা প্রতিক্রিয়া দেখে অনেকক্ষণ থমকে থামলাম। সেটাতে এমন বলা ছিলো যে এইরকম একটা কথা লেখার সময় ম্যাডামের উনার বাবার কথা একবারও মনে হয়েছে কিনা! আমি সত্যিই মনে করি না, এই লেখার সাথে বাবার কথা মনে হওয়ার কোনো সম্পর্ক আছে। কেনো? কয়েকটি ঘটনা বলি তাহলে।

আমার ছোট বোনটার একটা বান্ধবী ছিলো। আছে এখনো। তাদের বাসায় যাতায়াত ছিলো। তাদের বাসায় গেলে সসম্মানে তার বাবাকে সালাম দিয়ে বাবার মতই সম্মান দিয়ে কথা বলতো। সেই লোক বাইরে দেখা হলে চিনতো না তো। সালাম নিতো না এবং অটোতে পাশে বসে গায়ে নানান ভাবে স্পর্শ করতো। তাকে কি কখনো বাবা ছাড়া আর কিছু হিসেবে ভাবার কথা ছিলো? দেখার কথা ছিলো? তার যে ঘরে একটা মেয়ে আছে তার মেয়েটা কি জানে তার বাবা কেমন? জানলে কি কখনো কুকুরের ভাদ্র মাসের তুলনায় তার বাবাকে বাদ দিতে পারতো?

এই দেশে মেয়েরা সর্বপ্রথম নির্যাতিত হয় তার নিজেরই নিকট আত্মীয়ের কাছে। আমার বাবার বাবা অর্থাৎ সম্পর্কে দাদা হত সেই লোকটা। আমাদের বাসার সব বোন গুলো সেই নোংরা ঘিনঘিনে অভিজ্ঞতা প্রথমবার সেই দাদা থেকেই পেয়েছে। স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী সম্মানিত হওয়ার কথা থাকলেও আমাদের চোখে সে ভাদ্র মাসের কুকুর থেকেও বেশি কিছু ছিলো। সে তো আমার বাবার বাবা, আমার ফুপুদের বাবা। একজন বাবা! তাতে কী এসে গেছে? বিভিন্ন সময় গল্পে গল্পে শুনেছি অনেক মেয়ে বন্ধুর এই একই জঘন্য অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু কেউ যদি তাদেরকেই ভুল বোঝে এই ভয়ে চুপ আছে আজন্ম।

রাস্তাঘাটে, বাসে, অটোতে, ভীড়ের মাঝে যারা গায়ে হাত দিয়ে বিকৃত আনন্দ লাভ করে তাদের মাঝে কোনো বাবা থাকে না বলতে চান? বাবা থাকে, অনেক মায়ের স্বামীরা থাকে, অনেক প্রেমিক থাকে, বাবা মায়েদের অসংখ্য লক্ষ্মী সন্তান থাকে। বিশ্বাস করুন, আমাদের জীবনটা এইসব লক্ষ্মী মানুষজন এতটা বিষাক্ত করে তুলেছে যে বাবা, ভাই, বন্ধু, সন্তান, প্রেমিক কারো সম্পর্কে নিখাদ সম্মান বা শ্রদ্ধা কাজ করেনা।

আর যারা গলা বাজাচ্ছেন এই বলে সব ছেলেরা এমন না, কেনো সবাইকে এক কাতারে ফেললেন, ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়াচ্ছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদের জন্য বলি। আপনারা তো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দিয়েই ম্যাডাম কে ধুয়ে দিচ্ছেন। গলা বাড়াচ্ছেন যে সবাই এক না। বলছেন যে এই লেখার মাধ্যমে ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে। আপনাদের জিজ্ঞেস করি এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতেই যখন দিনের পর দিন মেয়েদের নামে বাজে পেজ চালানো হয়, তাদের নামে নানান কুরুচিপূর্ণ  ট্রল করা হয় তখন আপনাদের মনে হয় না যে সেসবের মাধ্যমে মেয়েদের নিয়ে বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে? তখন এসব অনুভুতি কোথায় থাকে? এই যে সম্মিলিত মারাত্নক প্রতিবাদ(!!) তা কি জোর করে বানানো দুর্বলের ওপর স্বঘোষিত সবলের চোটপাট নয়?

এই ভাদ্র মাসের লেখা দিয়ে যাদের যাদের মাথায় হাত হয়ে গেছে তারা মর্ত্যের পৃথিবীতে নেমে এসে দেখুন যে কি ধরণী নিজের মা আর বোনের জন্য বানিয়ে রেখেছেন! আর ঠিক কোন জায়গায় প্রতিক্রিয়া করা প্রয়োজন সেই জায়গাটাও শিখুন।

লেখাটি ১,৫৩২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.