যৌনতার প্রসঙ্গে ট্যাবু থাকলে ধর্ষণ বুঝবো ক্যামনে?

0

মির্জা তাসলিমা সুলতানা:

সাম্প্রতিক ধর্ষণ ও ধর্ষণসমূহ নিয়ে তর্ক বিতর্ক/গালাগালি/ট্রল দেখে শুনে, ৯৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত একটা প্রতিবাদ সভার কথা মনে পড়ছে। ঐ সভাটি আয়োজিত হয়েছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে এক ছাত্রীর যৌন হয়রানীর অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায় বিচারের দাবীর অংশ হিসাবে। তখন সদ্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন শেষ হয়েছে।

বলা বাহুল্য প্রতিবাদ সমাবেশটির কলেবর ছিল খুব ছোট। জনা বিশেক লোকের বেশী উপস্থিতি হবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকসহ আমরা জাহাঙ্গীরনগরের জনাকয় শিক্ষক সেখানে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য দিয়েছিলাম।

আমি বলেছিলাম, কীভাবে আমরা নারীরা নানান যৌন নিপীড়নের শিকার হই সেই অভিজ্ঞতাগুলো। মনে রাখবেন ঐসময় ‘যৌন হয়রানী’ প্রত্যয়টি প্রতিষ্ঠিত করতে আমাদের লড়াই করতে হচ্ছিল। ‘যৌন’ কথাটি শুনতেই জানি কেমন লাগে এমন কথাও আলোচিত হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি নির্ধারণী বৈঠকে। শিক্ষক রেহনুমা আহমেদ ও মানস চৌধুরী “যৌন হয়রানীকে কি বলবো গোলাপফুল?” শিরোনামে এক লেখাও লিখেছিলেন।

সে যাই হোক, ঐদিন আমার বক্তব্যের পর উপস্থিত একজন প্রতিবাদকারী বললেন, “এই বোনটির সাথে যা ঘটেছে, তা দুঃখজনক….”। আমি তো হতভম্ব, কারণ আমার বক্তব্যে ঘটনাগুলো আমার সাথেই ঘটেছে, তেমনটা বলিনি, নারীর অভিজ্ঞতার সাধারণ চিত্র উপস্থাপন করেছিলাম। ঐ বক্তার বক্তব্যে আমাকেই সরাসরি ভিক্টিম হিসাবে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়। উপস্থিত অনেকে আহা-উহু’র চোখ নিয়ে যেমন আমাকে ফিরে দেখলো একইসাথে কৌতুকের ও লালসার চোখেও দেখতে থাকলো। আমি সম্মুখ অনুভব করলাম নারীর যৌন হয়রানীর অভিজ্ঞতা শোনা-বোঝার কানের অভাব আছে, অভাব আছে বুঝতে চাওয়ার ইচ্ছারও। মনে হচ্ছিল যৌন হয়রানীর প্রতিবাদ করতে উপস্থিত হয়ে যৌন হয়রানীর অভিজ্ঞতা শুনে অনেকে সম্ভোবতঃ ‘চটি’ পড়বার ও পর্ণো দেখার স্বাদ পাচ্ছিলেন।  

এই অবস্থার আমুল বদল এখনও ঘটেনি। তবে এখন নারী, নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার অনেক বেশী। নারীকে বুদ্ধিসুদ্ধিহীন ও অনুভূতিহীন যৌন বস্তু বা যোনি সর্বস্ব ধরে নেওয়ায় বাধা আসছে নারীর কাছ থেকে এবং কিছু পুরুষের কাছ থেকেও। যেহেতু নারী, ঘরে বাইরে পুরুষের যৌন লালসা শিকার হয়, ফলে তাকে কোন কোন পুরুষের বিকৃত, ধর্ষকামী যৌন চাহিদার কথা বারংবার উল্লেখ করতেই হয়। এতে পুরুষেরা হরেদরে আক্রান্ত হচ্ছেন! কেন? সমাজে এইরকম যৌন চাহিদা কি তবে অতি সাধারণ? যৌনতা প্রসঙ্গটির প্রকাশ্য আলোচনা যখন সাধারণভাবে সমাজে ট্যাবু, তখন নারী-পুরুষের যৌনতা প্রসঙ্গে নির্মোহ আলোচনা সহজ নয়। কিন্তু প্রকাশ্য আলোচনা, বোঝাবুঝি দরকার।

যৌনতাকে সাধারণত কেবল শরীরি ধরে নেওয়া হয়, অথচ যৌনতা যে মস্তিষ্কের সাথে, মননের সাথে যুক্ত, শরীরে তার প্রকাশ হয় মাত্র, তা আমরা কয়জন স্পষ্ট বুঝি? এক্স রেটেড পর্ণোগ্রাফিতে শরীরী যৌনতারই উপস্থাপন হয় সবচেয়ে বেশী। নারী-পুরুষের যৌনতার প্রতি আগ্রহ থাকাটাই স্বাভাবিক, কিন্তু ট্যাবুর কারণে এই আগ্রহ মেটানোর যথাযথ পথ নেই, ফলে চিন্তাজগতে অনেকের জন্যই পর্ণোগ্রাফিক/চটির উপস্থাপনই হয়ে উঠে একমাত্র বাস্তব। যেহেতু যৌনতার অবশ্যম্ভাবী অংশ চিন্তা, ফলে যৌনতায় ফ্যান্টাসি আবশ্যকীয় উপাদান। তাই আদর্শ যৌন আচরণ নির্ধারণ সম্ভব নয়; স্থান. কাল, সমাজ ভেদে এই আচরণ, বোঝাবুঝির মধ্যে পার্থক্য থাকবে। কিন্তু ‘সম্মতি’ সকলপক্ষের আনন্দময় যৌন সম্পর্কের পূর্ব শর্ত।

যে কোনো পর্যায়ে অসম্মতিতে যে কোন ধরনের যৌন কাজে বাধ্য করা অন্যায়। নারী-পুরুষ সকলেরই স্বতস্ফুর্ত স্বাধীন আনন্দময় জীবনের অধিকার আছে, আরো অধিকার আছে কারো সাথে আনন্দময়, ফ্যান্টাসিময় সম্পর্ক স্থাপনের। এর একমাত্র পরিণতি ‘জোর করা’ ‘অসম্মতিতে বাধ্য’ করা ইত্যাদি ধারণা ঠিক নয়। বরং ধর্ষকের সহযোগী/সহায়ক ভাবনা এসব। অসম্মতিকে চিনতে ও স্বীকৃতি দিতে খোলামেলা স্পষ্ট কথাবার্তা জারি রাখা তাই অতীব জরুরী।

অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

লেখাটি ৪,০৩৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.