উইমেন চ্যাপ্টার, নারীর লেখা বনাম পুরুষের প্রতিক্রিয়া

0

সালমা লুনা:

আমি খুব অনিয়মিত লিখি অনলাইন পোর্টাল উইমেন চ্যাপ্টারে। লিখি ফেসবুকে মনের আনন্দে।
সুপ্রীতি দিদির ভালো লাগলে নিয়ে ছেপে দেন চ্যাপ্টারে। নানা প্রতিক্রিয়া পাই- ভালো লাগে। কখনো নিজেও পাঠাই। সমাজে নারীর অবস্থান, নারীর প্রতি লাগাতার ঘটতে থাকা অন্যায়, নারীর করণীয় নিয়ে একজন সচেতন নারী হিসেবে যা ভাবি – লিখি। সেই লেখাটা কেউ পড়ছে, একটু হলেও সেটি নিয়ে ভাবছে বা কথা বলছে এটুকুই প্রাপ্তি। 
এই পোর্টালে কত নারীরাই লিখেন। অনেকেই খুব ভালো লেখেন। তাতে পর্যবেক্ষণ থাকে। উচিত-অনুচিতের চুলচেরা বিশ্লেষণ থাকে। কেউ কেউ খুব বিদ্রোহী হয়ে লেখেন। কেউ আবার অভিমানী লেখক। 
সব লেখাই মানুষের কাছে পৌঁছায়। কারো ভালো লাগে, কারো লাগে না। 
খুব স্বাভাবিক। 
সব লেখা সবার ভালো লাগবে এটা হতেই পারে না। কেউ প্রতিবাদ করতে চাইলে করতেই পারেন। সেটাও অস্বাভাবিক না। লেখার কনটেন্ট নিয়ে আপত্তি থাকলে সেটি তো লেখা দিয়েই হবে। লেখাটি যদি রাষ্ট্রীয়, সামাজিক বা কোনো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হয়, তাহলে সেটি সম্পর্কে লেখক বা প্রতিষ্ঠানকে আলোচনা বা সতর্কও করা যেতে পারে। এটিই উচিত কর্ম।
কিন্তু কেউ যদি শুধু নারী বলেই, নারীর সীমানা পেরিয়ে যাওয়া সত্য কথনে বেসামাল হয়ে পড়েন, নিজেকে ওই ভয়াবহ সত্যের কুশীলব ভেবে আপনাতেই ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেন এবং অসম্মান করতে ব্যক্তি আক্রমণে আগ্রাসী হয়ে উঠেন, সেটি এই সময়ে এই খুবই বেমানান। বিশেষ করে যখন নারীকে লাগাতার একটা বিশেষ অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে। যে লড়াইয়ে সমমনা হিসেবে পুরুষদের একেবারে পাশটিতে থাকার কথা ছিলো, অথচ দেখা যাচ্ছে লিঙ্গের অহমিকা তাদের অপরাধীর কাতারে দাঁড় করিয়েই ছেড়েছে। 
এতো কথা বলছি এজন্য যে প্রিয় উইমেন চ্যাপ্টারে একটি লেখার যে প্রতিক্রিয়া দেখলাম, এবং সেই প্রতিক্রিয়ার পক্ষে কিছু মানুষের যে চেহারা উন্মোচিত হলো, তা সুস্থ একজন মানুষকে স্তম্ভিত করে দেবার জন্য যথেষ্ট।
উইমেন চ্যাপ্টারের আলোচ্য লেখাটির শিরোনাম ছিলো “কুকুরেরও ভাদ্র মাস ফুরোয়, ফুরোয় না পুরুষের” – এরকম। 
যার মূল ভাব ছিলো পুরুষের নারীর প্রতি বিকৃত কাম। লেখক তার নিজের মতো করে বিশ্লেষণ করেছেন। সেটি ঠিক কী বেঠিক তা নিয়ে আলোচনা না করে প্রতিষ্ঠিত এক পত্রিকার সাংবাদিক ফেসবুকে পোর্টালটির বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দিয়েছেন। তিনি ওই বিকৃত পুরুষদের একজন কীনা, এবং তা আলোচ্য বিষয় কীনা সেটি বাদ দেই আপাতত।
সাংবাদিক ওই লেখাটি নিজের গায়ে মেখে মামলা করা যায় কীনা এটি বলতেই কিছু পুরুষের মন্তব্য চলে আসে পোস্টে, এবং মন্তব্যের আলোকে বর্তমানে নারীর বিরুদ্ধে লাগাতার সহিংসতার ভবিষ্যত –  সেটিই আপাতত ভাবনার বিষয়। 
তবে পরিচিত প্রতিভাবান মানুষগুলোর এইরূপ নিঃসন্দেহে একটা চমক দেয়। সেখানে দু’চারজন শুভবুদ্ধির যে কেউ ছিলেন না, তা নয়। তারা সাধ্যমতো প্রতিবাদও করেছেন। এও আশার কথা, কেননা এখনো আমরা মনে করি অবিবেচক বিকৃত পুরুষই সমাজ নয়। এছাড়াও অবশ্যই বিবেকবান মানুষ আছেন।
আমি পোস্ট এবং তৎসঙ্গে যে মন্তব্যগুলো দেখেছি এখানে ধারাবাহিকভাবে দিচ্ছি সেগুলো।
একজন লিখলেন, উইমেন চ্যাপ্টার পুরুষের বিরুদ্ধে বিষ ছড়াচ্ছে এবং দিনে দিনে এটি বাড়ছেই – হ্যাঁ, বাড়ছে। বাড়বেই তো! এই সমাজে ধর্ষকও যে বাড়ছে অবিরাম। নারীকে ভোগ্য বস্তু হিসেবে দেখার প্রবণতা তো কমছে না। কাজেই বিষেই তো বিষক্ষয় হবে।
মন্তব্য: এটেনশন সিকার!
এটেনশন সিকার তো হতেই হবে, নইলে পুরুষরা আয়নায় নিজেদের অথবা তাদের স্বজাতির কীর্তিকলাপ দেখবে কী করে! মেয়েগুলোই বা সচেতন হবে কীকরে!
লেখকের রুচি আর ধর্ষকের রুচি নাকি একই ! – নিশ্চিতভাবেই ! নইলে কখনো কখনো বুনো ওলের জন্য বাঘা তেঁতুল থেরাপি মিথ্যে হয়ে যেতো যে! 
এটি নাকি উগ্রবাদ!
নারীর বিরুদ্ধে যে উগ্রবাদ অনাদিকাল থেকে জারি আছে সেটি তো আরেকটি উগ্রবাদ দিয়েই এখন সমাপ্ত করতে হয়, যেহেতু নাকি কান্নায় আর হচ্ছে না। নাকি কেঁদে-কেটে অধিকার ভিক্ষে চাইলেই সুবিধা হয় পুরুষের? অস্ত্র তো সেটিই মোক্ষম, যা দিয়ে বিজয় প্রাপ্তি হয়।
কেউ কেউ বলেছেন, এইসব নারীরা ব্যক্তিজীবনে ডিপ্রাইভড। অন্যের সোশ্যাল স্ট্যাটাস দেখে মাথা ঠিক থাকে না। – হাসি পেলো দেখে। এই নারীদের বেশীরভাগই নিজে রোজগার করে সম্মানের সাথে নিজের জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। আর যারা এমনটা করে তাদের অন্যের সম্পদ দেখার সময়টা পর্যন্ত থাকে না।
একজনের তো লেখকদের ছবি দেয়াতেও আপত্তি। সুন্দর সুবেশী নারী ফটোগ্রাফ তার নিজের লেখার সাথে সংযুক্ত থাকলে সেই নারীই পণ্য!
অদ্ভুত যুক্তি ! 
যিনি সেই আনন্দময় ছবিটিকে ভাবেন এটি একটি উত্তেজক ছবি – ধর্ষকের সাথে, পোর্টালের সেই আপত্তিকর লেখার উল্লেখিত লোলুপ পুরুষের সাথে তিনি কোথায় যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যান।
একজন সাংবাদিকের পোস্টে যখন নারীদের একটি পোর্টালের লেখা নিয়ে আপত্তি জানানোর ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয় ‘বেশ্যা’ শব্দটি তখন মানহানির মামলা কার করা উচিত বলে মনে হয়?
আসলে সমস্যা কোথায়?
আসলে একটা নারী পোর্টালে লেখা থাকার কথা ছিলো পোশাক গহনা বুটিক সাজগোজ মেকাপ শেকাপ মেহেদির ডিজাইন রান্নার রেসিপি ইত্যাদি নিয়ে। তাহলেই সেই পুরুষদের শান্তি হতো যারা নারীকে প্রতিবাদীর চরিত্রে দেখতে চায় না।
নারী যখন গভীর ব্যথায় চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে চায় কোথায় তাঁর ব্যথা, কোথায় আপত্তি, পুরুষ তোমার কোন আচরণে তোমাদের আমরা ঘৃণা করি – তখন সেই পুরুষটির পুরুষ-কার খেপে উঠে বেশ্যা বেশ্যা বলে গাল দিয়ে উঠে।
মামলা যদি করতেই হয় তবে ওই কথার জন্য যে নারীর মানের হানী হয় তার জন্য করা উচিত।
অবশ্য আমার বিবেচনায় – যে একজন মানুষকে পৃথিবীর আলো দেখাতে নয়মাস নিজের জঠরে রাখতে পারে তীব্র বেদনা সয়ে জন্ম দিতে পারে তার মান এত সহজেই যায় না।

লেখাটি ১,৩৩৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.