বনানী ধর্ষণ মামলা এবং একজন ফারহানা নিশো

0

দেব প্রসাদ দেবু:

সুচিত্রা ভট্টাচার্যের গল্প অবলম্বনে ঋতুপর্ণ ঘোষের পরিচালনায় ১৯৯৭ সালে টালিউডে একটা সিনেমা মুক্তি পেয়েছিলো “দহন” নামে। বেশ প্র্যাকটিক্যাল একটা ছবি। অনেকেই দেখে থাকার কথা। এক গৃহবধূকে ইভ টিজারের হাত থেকে বাঁচাতে এগিয়ে গিয়েছিলেন এক স্কুল শিক্ষিকা। ইভ টিজাররা ছিলো প্রভাবশালী লোকের সন্তান। সেই ঘটনায় শুরুতে অভিনন্দনের বন্যায় ভাসলেও সেই ইভটিজিং এর শিকার গৃহবধূর পরিবারও পরে স্কুল শিক্ষিকার উপর থেকে সাপোর্ট তুলে নেয়, সহযোগিতা বন্ধ করে দেয় সামাজিক পরিস্থিতির কারণে।

আদালতে যেভাবে ভিক্টিমকে প্রশ্ন করা হয় সেটি ছিলো ইভটিজিং-এর চেয়ে বেশি কিছু, অনেকটা প্রকাশ্যে পরিবারের লোকের সামনে কথা দিয়ে ধর্ষণ করার মতো। এই হচ্ছে আমাদের সমাজ। এই হচ্ছে আমাদের চারপাশ। আমরা এখনো সভ্যতার আড়ালে ধারণ করি অসভ্যতা। শ্লীলতাহানির কারণ অনুসন্ধানে সবার আগে আমরা বিবেচনায় নেই ভুক্তভোগী মেয়েটির কী কী দোষ ছিলো। মেয়েটির পোশাক পরিচ্ছদ ঠিক ছিলো কিনা। ‘অড’ সময়ে বাড়ির বাইরে গিয়েছিলো কিনা, ‘অনিরাপদ’ স্থানে গিয়েছিলো কিনা- এইসব। আমাদের মনোজগৎ, রুচিবোধ, সামাজিক শিক্ষা এমন যে আমরা ক্রন্দনরত নারীকেও ‘ওই ছুড়ি তোর ওড়না ঠিক কর’ বলে শাসাই।

সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া বনানী ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। আমরা গভীর ভাবে অনুসন্ধানে নেমেছি ছাত্রী দুটির কী কী ভুল ছিলো, কেনো ওরা রাতের বেলা হোটেলে গিয়েছিলো- এইসবে। আমাদের কিছু মিডিয়া ভিক্টিমের বাড়ির সামনে ‘সাংবাদিক’ বসিয়ে রেখেছিলো খবর নেয়ার জন্য। কিছু মিডিয়া ছাত্রীদের নাম ধাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সব প্রকাশ করে ‘এগিয়ে’ যাওয়ার প্রচেষ্টা করতেও আমরা দেখেছি। আমরা দেখেছি লাঞ্ছনার শিকার ছাত্রীদের জবানবন্দী নিয়ে সেটা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল করে দেয়া হয়েছে। এগুলো উদ্দেশ্যবিহীন বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এগুলো সবই সমাজের প্রতিচ্ছবি, সমাজের প্রতি-আয়নাই। আমরা মুখে বা প্রকাশ্যে যা-ই বলি না কেনো মনোজাগতিক ভাবে কেমন, কতোটা পুরুষতান্ত্রিক, নারীকে আমরা কীভাবে দেখতে চাই কিংবা কীভাবে দেখি সেটা খুবই স্পষ্ট ভাবে ফুটে উঠে একেকটা ঘটনার পর।

শুরুতে খামখেয়ালি দেখালেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তীব্র ক্ষোভের মুখে পরবর্তীতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও বেশ তৎপর হতে আমরা দেখেছি। অভিনন্দন তাঁদের। সমাজের তালে তালে প্রতিষ্ঠানগুলোও যখন কুলষিত হতে শুরু করে তখন তীব্র একটা ক্ষোভ, তীব্র একটা অসহায়ত্ব আমাদের গ্রাস করে নেয় চারপাশ থেকে। ইতোমধ্যে সবকটা অভিযুক্ত আসামী গ্রেফতার হওয়ায় সামাজিক মাধ্যমের আলোচনাও থিতু হয়ে এসেছে। অপেক্ষার পালা আইনের আওতায় অপরাধীদের শাস্তি দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিশ্চিত হওয়াটা দেখার।

প্রত্যেক ঘটনার কিছু পার্শ্ব ঘটনা থাকে, পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া থাকে। যেমন বনানী মামলায় আমরা দেখেছি বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামলা নিতে গড়িমসি করেছেন, দিলদার সাহেবকে (অভিযুক্ত ধর্ষক সাফাতের পিতা) দেখেছি অর্থের দম্ভে অশ্লীল বক্তব্য নিয়ে মিডিয়ার সামনে আসতে। আমরা দেখেছি রেইনট্রি হোটেল কর্তৃপক্ষ শুরুতেই ধর্ষণসহ সেইদিনের যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা অস্বীকার করেছে এবং পরবর্তীতে ধর্ষকদেরই বিচার দাবি করতে।

বনানী ঘটনার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত নাঈম আশরাফ ওরফে হালিম বেশ আলোচিত শুরু থেকেই। এই কালপ্রিটটা জীবনের প্রতিটি ধাপেই কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে মানুষকে প্রতারিত করেছে এবং নিজেকে এগিয়ে নেয়ার ধান্ধায় থেকেছে বলে মিডিয়ায় বেশ কিছু খবর বেরিয়েছে। এছাড়া সমাজের প্রভাবশালী কিংবা আলোচিত মানুষের সাথে বিভিন্ন অজুহাতে ছবি তুলে সেগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড করতো নিজেকে প্রচার করার জন্য। এতে তার বেশ কিছু লাভ ছিলো।

রাজনৈতিক নেতার সাথে ছবি দেখালে মানুষ সখ্যতা ভেবে সমীহ করে, প্রশাসনের লোকের সাথে ছবি দেখলেও কাজ আদায়ে দাপ্তরিক সাপোর্ট কাজ করে, মিডিয়ার আলোচিত কারো সাথে ছবি দিলে সংশ্লিষ্ট মহলে কদর বাড়ে। কথা হচ্ছে সে চাইলেই কেনো এঁরা ছবি তুলবেন? মিডিয়ার লোকের কাছে সে যেতো ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের নাম করে (কয়েকটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বও সে পালন করেছে) বিভিন্ন কাজের অজুহাতে। প্রশাসনের কাছে সে যেতে পারে স্বেচ্ছাসেবক লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা হিসেবে। এছাড়া অর্থ-বিত্তের মালিক দিলদার সাহেবের ছেলে ধর্ষক সাফাতের সাথে দোস্তির পরিচয় দিয়েও ঐ লবির বিভিন্ন লেভেলে সে ঢুকে পড়েছে।

এটা অনেকটা সেই চুটকির মতো। এক ছেলে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়ে বললো আমাকে একটা ভালো পদে চাকরি দেন। প্রেসিডেন্ট বললো কেন দিবো? কী যোগ্যতা? ছেলেটি বললো, যোগ্যতা হচ্ছে আমি বিল গেটস এর মেয়ের জামাই। তার চাকরি হলো। এবার সে বিল গেটসের কাছে গিয়ে বললো আমি আপনার মেয়েকে বিয়ে করতে চাই। কী যোগ্যতা? আমি ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ফাইন্যান্স ডিরেক্টর। ঠিক এই কূটকৌশলেই হালিম ওরফে নাঈম উদ্দিষ্ট ব্যক্তি কিংবা ব্যক্তিনির সাথে সেলফি তুলে নিজের প্রচার কাজ চালিয়েছে। ফলে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সাথেই তার ছবি পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে আছেন মন্ত্রী, এমপি, মন্ত্রী-পুত্র, ক্রিকেটার, মিডিয়ার আলোচিতজন।

কিন্তু মজার বিষয় হলো এই আলোচিত ব্যক্তিদের কারো কিছুই পোহাতে হলো না শুধু খড়গ নেমে আসলো ফারহানা নিশোর জন্য। একুশে টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ কোনো কারণ না দেখিয়েই তাঁকে হেড অব প্রোগ্রাম এর পদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। ‘অব্যাহতি’ শব্দটা অফিসিয়াল, সৌজন্যমূলক। সৌজন্যতা বাদ দিয়ে বলতে গেলে বলতে হয় ফারহানা নিশোকে একুশে টিভি কর্তৃপক্ষ বহিষ্কার করেছে।

কারণ কী? প্রদর্শিত কোন কারণ নেই। আবার অপ্রদর্শিতও কোনো কারণ নেই। কারণ একটাই যে, ফারহানা নিশোর সাথে ধর্ষক নাঈম ওরফে হালিমের ছবি ভাইরাল হয়েছে। তাতে কী প্রমাণ হয়? ফারহানা নিশো ধর্ষক হয়ে যায়? নাকি ধর্ষকের সহযোগী প্রমাণ হয়? ইয়াবা ব্যবসা নিয়ে অভিযুক্ত সাংসদ বদি’র সাথে হাস্যোজ্জ্বল ছবি মিডিয়ায় এসেছে। তাতে কী ফারাক পড়েছে? নাঈমের সাথে সাকিব আল হাসানের ছবিও মিডিয়ায় এসেছে, নাসিম পুত্রের ছবিও মিডিয়ায় এসেছে। তাতে কী ফারাক পড়েছে। এঁদের কাউকে কি কেউ ভাবছে ধর্ষক কিংবা ধর্ষকের সহযোগী কিংবা নাঈমের কাছ থেকে সুবিধা নেয়া কেউ? ভাবছে না। তাহলে কেনো শুধু নিশোর ক্ষেত্রে খড়গ নেমে এলো।

কোনো কারণ নেই? আছে। অবশ্যই আছে। সেই অবধারিত কারণটি হলো নিশো একটি মেয়ে এবং আলোচিত একটি মেয়ে। আমাদের সমাজের বিবেচনায় মেয়েদের কোন দৃষ্টিতে দেখতে হবে সেটি লেখার শুরুতে কিছুটা উল্লেখ করেছি। এর বাইরে ‘মিডিয়ার মেয়ে’দের জন্য আলোচনার দ্বার আরো খানিকটা বৃহৎ। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ মিডিয়ার মেয়েকে কামের দৃষ্টিতে দেখে, কিন্তু সেই কামকে চেপে মুখে বলে মিডিয়ার মেয়ে মানেই ‘খারাপ’। আমরা ধর্ষণ করে এসে ধর্ষিতাকে চরিত্রহীন বলে তৃপ্তি পাই, ধর্ষণ করে এসে ধর্ষিতাকে বেশ্যা বলে গালি দিয়ে মানসিক তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলি। কারণ আমারা মনোজাগতিকভাবে, সামাজিকভাবে, পারিবারিকভাবে এমন কি প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে পুরুষতান্ত্রিক। আমরা নারীকে অধনস্ত, পদদলিত দেখতে পছন্দ করি।

ফারহানা নিশো’র অব্যাহতিপত্রটিও একটু অস্বাভাবিক। কর্পোরেট কোনো প্রতিষ্ঠানে কাউকে চাকুরিচ্যুত করা হলে উক্ত ব্যক্তিকে চিঠির মাধ্যমে জানানো হয় নোটিশ বোর্ডে নোটিশ টাঙানো হয় না, মিডিয়ার কাছে সেটি ফ্যাক্স করে পাঠানো হয় না। কিন্তু নিশোর ক্ষেত্রে হয়েছে উল্টো। নিশোকে কোনো চিঠি গতকাল পর্যন্ত ইস্যু করা হয়নি বা জানানো হয়নি, জানানো হয়েছে মিডিয়াকে। কারণ কী? কারণ একটাই। একটা মেয়েকে ‘শিক্ষা’ দেয়া হলো। যেই শিক্ষার ধারাপাত হলো পুরুষতন্ত্র। পূর্ণ হলো নারীর দোষ খোঁজার আজন্ম লালিত বাসনা। যতোদিন সমাজ কিংবা রাষ্ট্র নারীকে মানুষ না ভাববে, যতোদিন পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা পরিহার না করবে ততোদিন এভাবেই বিভিন্ন পরিসরে বঞ্চনার শিকার হবে নারীরা।   

লেখাটি ৯,৪৮১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.