আপনি যে ভালো পুরুষ, তার নিশানা কী?

0

বৈশালী রহমান:

লেখক শাশ্বতী বিপ্লব একটা বিরাট ” অন্যায়” করে ফেলেছেন। তিনি “কুকুরেরও ভাদ্রমাস ফুরোয়, পুরুষের ফুরোয় না” শিরোনামে একটা লেখা লিখে ফেলেছেন। অন্যায়টা চক্রবৃদ্ধি হারে দ্বিগুণ হয়েছে, কারণ লেখাটা প্রকাশ করেছে “উইমেন চ্যাপ্টার” নামের একটা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম।

কতোবড়ো অন্যায় বলুন তো! উইমেনদের জন্য রান্নাঘর আছে, সংসার আছে, বাচ্চাকাচ্চার গু মুতের কাঁথা ধোয়া আছে, শ্বশুর-শাশুড়ির দাসীগিরি আছে, সোয়ামির খাট আছে, আর সেইসব বাদ দিয়ে কিনা উইমেনদের জন্য আবার লেখালেখির জায়গা! ব্যস্ আর যায় কোথায়! এই প্রবন্ধ দেখার পরে বাংলার “আসল পুরুষ”দের লেজে (মানে, লেজ থাকলে যেইখানে থাকতো আরকী) আগুন ধরে গেছে। লেখিকারে শাস্তি দাও (শাস্তি মানে রেপ!), উইমেন চ্যাপ্টারের সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলা করো, হামলা করো, উরেব্বাস রে! কারণ? কারণ, লেখক এইখানে “পুরুষ” বললেন কেন, “কিছু পুরুষ” বলতে পারেন নাই? “সব পুরুষ কি এমন নাকি” ইত্যাদি ইত্যাদি।

চলুন দেখি, কী কী কারণে লেখকের এই লেখা লিখে “সম্পূর্ণ পুরুষজাতিকে” অভিযুক্ত করা “অন্যায় হয়েছে”।

বাংলাদেশে কোনো মেয়ে সন্ধ্যায় তো দূরে থাক, দিনের বেলাও খুব নিশ্চিন্তে বের হতে পারে না। কেন পারে না? কিসের ভয়ে? বাঘ? সিংহ? কুত্তা? জ্বি না, পুরুষের ভয়ে। এই “ভালো পুরুষেরা” তখন কোথায় লুকিয়ে থাকেন? বলতে পারেন না, মেয়েরা, তোমরা নিশ্চিন্তে বের হও, “ধর্ষক পুরুষরা” আক্রমণ করলে নির্দ্বিধায় বিচি ফাটিয়ে দিও, আমরা তোমাদের সাথে আছি। কিন্তু না, তাঁরা কী করেন? তাঁরা বলেন, ও মেয়ে, সাবধানে থেকো। অমুক জায়গায় যেও না, তমুক জায়গায় যেও না, অন্ধকারে যেও না, ভিড়ের মধ্যে যেও না, ইত্যাদি ইত্যাদি। নিজের ঘরের মেয়েরা গভীর রাত পর্যন্ত ঘরে না ফিরলে তাঁরাও চিন্তিত হয়ে পড়েন। পুরুষের ভয়ে। পুরুষ তাদের ধর্ষণ করলো কিনা এই ভয়ে। কেন? তাঁরা কি জানেন না দুনিয়াতে ভালো পুরুষও আছে? এইভাবে পুরুষের ভয়ে নিজ পরিবারের নারীদের জন্য চিন্তিত হয়ে পুরা পুরুষজাতিকে অপমান করার অধিকার তাঁদের কে দিয়েছে?

কোনো কোনো ভালো পুরুষ আছেন, নিজ পরিবারের নারীদের বোরকা হিজাব ঘোমটা ছাড়া বাইরে যেতে দেন না। কারণ? পুরুষেরা লোভী দৃষ্টিতে তাকাবে। ক্যান রে ভাই? আপনারা তো ভালো পুরুষ! আপনার মতো ভালো পুরুষ তো দুনিয়ায় আরো অনেক আছে। মেয়েদের বুরকা হিজাব পরালে তো খারাপ পুরুষগুলোর পাশাপাশি এই ভালো পুরুষগুলারেও অপমান করা হয়! যেন আপনি ভালো পুরুষগুলোর নজরকে বিশ্বাস করতে পারছেন না! আপনার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা হয় না ক্যান?

এখন হে ভালো পুরুষেরা, আপনারাই বলেন, আপনারা যে ভালো পুরুষ, এইটা বোঝার নিশানা কী? কোনো বিশেষ চিহ্ণ নিয়ে কি আপনারা ঘুরেন? আপনাদের কপালে বা কোনো দ্রষ্টব্য স্থানে কি এমন কোনো কিছু লেখা থাকে যে আমি বুঝতে পারবো, লোকালয়ে দশটা মানুষের সামনে এই সভ্য আপনি রাত বারোটার পরে রাস্তায় একা কোনো মেয়ে দেখলে রেপিস্ট হয়ে যাবেন না?

সমাজের চোখে অতি বিখ্যাত, অতি জ্ঞানী, অতি মহৎ মানুষ আপনি আড়ালে আপনার পাঁচ বছর বয়সী ভাতিজি বা ভাগ্নির গায়ে কু উদ্দেশ্যে হাত দেবেন না? আপনার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী আপনার জন্মদিনের পার্টিতে গিয়ে আপনার হাতেই ধর্ষিত হবে না? কিভাবে বুঝবো? কিভাবে? আপনি কারো স্বামী, বাবা, পুত্র ইত্যাদি কারণে আপনাকে সম্ভাব্য ধর্ষক বলে মনে করবো না? কেন? পাঁচ বছরের বাচ্চা মেয়েটাকে যে লোক ধর্ষণ করলো, সেও তো কারো স্বামী ছিল, কারো বাবা ছিল। সাত মাসের বাচ্চার জন্য খাবার আনতে দিয়ে যে নারী ধর্ষিত হলেন, খুন হলেন, তাঁকে ধর্ষণকারীরাও তো ছিল কারো সন্তান! আপনি ধার্মিক বলে আপনাকে সম্ভাব্য ধর্ষক ভাববো না? কেন?

মসজিদে কুরান যে শিক্ষা দেয়, যার পেছনে লোকে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ে, মন্দিরে যে পূজা করে, ধর্ষণ করার আগ পর্যন্ত সেও তো সমাজের চোখে ধার্মিকদের অগ্রগণ্য ছিল! তার ধার্মিকতা তো তারে ধর্ষণ করা থেকে আটকাতে পারে নাই! আমারও বাপ ভাই আছে, স্বামী আছে, তারাও যে সুযোগ পেলে নারী ধর্ষণ করবে না, মলেস্টেশন করবে না, এই গ্যারান্টি আমি কেমনে দেই? কিসের বলে? আপনারাও কেমনে দেন? আমাদেরও শেখান কেমনে “ধর্ষণ করে না” এমন পুরুষ চিনতে হয়! আমাদেরও শেখান কেমনে “অমুক পুরুষ সুযোগ পাইলেও ধর্ষণ করবে না” এই গ্যারান্টি দিতে হয়! তাহলে আর আমরা “জেনারালাইজেশন” করবো না, আমরাও আমাদের লেখায় বলবো, “অমুক অমুক পুরুষ, অমুকের বাপ, ভাই, স্বামী, প্রেমিক ছাড়া আর সকল পুরুষই সম্ভাব্য ধর্ষক।”

অতএব বন্ধুগণ, হয় আপনারা “আমি ধর্ষক না” এই টাইপের গ্রহণযোগ্য, আই রিপিট, গ্রহণযোগ্য নিশানা নিয়ে ঘুরেন, নয়তো এই “সকল পুরুষ এক না” এই ডিসক্লেইমার থেকে আমাগোরে রেহাই দেন। পুরুষ কী, এইটা আপনারা চিনেন না। চিনি আমরা মেয়েরা। যারা জ্ঞান হওয়ার পর থেকে ধর্ষণের ভয় মাথায় নিয়ে দুনিয়ার সব কাজ করি। বাইরে যাই, হাসি খেলি, ভাব দেখাই যেন কতো সুখি আমরা।

“সকল পুরুষ এক না” বাদী গণ, আমরা আপনাদের ভয় পাই, আপনাদের। পুরুষ জাতিটার ভয়ে আমরা রাস্তাঘাটে সতর্ক থাকি। কারণ কোন পুরুষ সুযোগ পেলে ধর্ষক হয়ে উঠবে, এটা কেউ জানে না। এইটা আপনাদের জন্য কতোবড়ো লজ্জার ব্যাপার বুঝেন এইটা, বুঝেন?

বন্ধু শাশ্বতী, আপনি আসলেই বিরাট অন্যায় করে ফেলেছেন। পুরুষের লজ্জা, পুরুষের দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছেন। পুরুষ ধর্ষণ করতে পারে, এই তার লজ্জা, এই তার দুর্বলতা। এতো সরাসরি সব কথা বলতে হয় না। সম্ভবত এটাই আপনার অপরাধ।

লেখাটি ৪,৫৫৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.