ওলো সই, ওলো সই

0

ফারহানা আনন্দময়ী:  

‘ওলো সই, ওলো সই… ছড়িয়ে দিয়ে পা দুখানি, কোণে ব’সে কানাকানি, কভু হেসে কভু কেঁদে চেয়ে বসে রই’ … এই সইটি আর কেউ নয়, আমার মতন অনেকের কাছেই এই সইয়ের নাম “উইমেন চ্যাপ্টার”। এই সইটি তার সইয়ের কথা, কোনো সুখ, কোনো ব্যথা মুখের ভাষায় শুনতে পায় না, তাকে লিখে জানাতে হয়। তবেই সে শোনে।

উইমেন চ্যাপ্টার শুধুই একটি ওয়েব পোর্টাল নয়। এ এক আকাশ, আর আমরা তার মাটি ছুঁয়ে থাকা বন্ধুরা যাদের অনেক কথা নিজেকে বলার থাকে, তারাই ঘরের সবচেয়ে প্রিয় জানালাটা একটু ফাঁক করে সেই আকাশের সাথে কথা বলি। উইমেন চ্যাপ্টারের অন্য নাম আকাশ, অন্ততঃ আমার কাছে।

এক’পা দু’পা করে চলতে চলতে চার বছর পার করলো উইমেন চ্যাপ্টার। চার বছরে তার বন্ধু তালিকা আরো ঋদ্ধ হয়েছে। সাধারণ বন্ধুদের লেখা সাধারণ গল্প নিয়েই সে অসাধারণ হয়ে উঠেছে। বেশিটাই দুঃখ, বেশিটাই বঞ্চনার গল্প… তবে সেই বঞ্চনার বিরুদ্ধে জ্বলে ওঠার জন্য অল্প কিছু বারুদমাখানো গল্প-ও সে শুনেছে, শুনিয়েছে। যাদের পিঠটা একেবারে দেয়ালে ঠেকে গিয়েছিল, তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে আবারো সামনে হেঁটে যাওয়ার সাহস পেয়েছেন। উইমেন চ্যাপ্টার তাকে দ্বিতীয় জন্ম দিয়েছে। হয়তো সে সংখ্যা হাজার-ছাড়ানো নয়, দু-দশ-পঞ্চাশজনের। তাও তো! উইমেন চ্যাপ্টারের গল্প ভাগাভাগিতে ঝড়ের মুখে নিভু নিভু একটা প্রাণও যদি নতুন করে সবুজ হয়ে জেগে ওঠে, সেখানেই উইমেন চ্যাপ্টারের সফলতা।

তবে একটা বিষয় লক্ষণীয়, এখানে বেশিরভাগই সমাজের নিম্ন এবং উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীরাই উইমেন চ্যাপ্টারকে সই হিসেবে মনে নিয়েছেন। উইমেন চ্যাপ্টার ওদের কাছে বিশ্বস্ততার প্রতিরূপ হয়ে সামনে দাঁড়িয়েছে, হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। কোনো উচ্চবিত্ত পরিবারের বঞ্চিত নারীর আর্তনাদ কখনো শোনা যায়নি। কেন? অভিজাত, সম্পদশালী পরিবারের নারীদের কি কোনোই বঞ্চনা নেই? নারী-নির্যাতন শব্দটি কি তাদের জীবনাচরণের অভিধানে নেই? নিশ্চয়ই আছে, খুব করুণভাবে আছে। আমার নিজে চোখে দ্যাখা, নিজের কানে শোনা। কই, তাদের কোনো গল্প তো আমরা উইমেন চ্যাপ্টারের সই-বইয়ে পড়ি না।

কেন পড়ি না তার কারণটাও খুব স্পষ্ট। তারা এই নির্যাতনকে স্বামীর প্রতিপত্তি আর ধন-সম্পদের তলায় কবর দিয়ে রাখে। তাদের বঞ্চনা তারা পুষিয়ে নিতে চায় অলংকার আর ঐশ্বর্যের বিনিময় দিয়ে। আমি অনেককেই জানি, যারা তাদের সমাজে সম্মানিত এবং সম্ভ্রান্ত ট্যাগ লাগানো স্বামীর লাম্পট্যের কাহিনী আদ্যপান্ত জানেন, কিন্তু কারো কাছেই মুখ খোলেন না, এমন কী স্বীকারও করেন না পাছে তার বিলাস-বসনে টান পড়ে। তাদের স্বামীরাও জানে, বাইরে মদ্যপান করে আমোদফূর্তি সেরে ঘরে এসে স্ত্রীকে দু’চার থাপ্পর দিয়ে জোরপূর্বক সঙ্গম করলেও কোনো সমস্যা নেই। কারণ রাত পোহালেই নতুন মডেলের গাড়িতে চড়িয়ে, নতুন এক সেট গহনা কিনে দিলেই তার স্ত্রী গত রাতের নির্যাতনকে স্বামীর সোহাগ ব’লেই মেনে নেবে। এভাবেই সমাজের উঁচুতলায় লাম্পট্য আর নির্যাতনের থাবা অবাধে বিস্তৃত হওয়ার সু্যোগ পায়।   

এই নারীরাও যদি একবার মুখ খুলতেন, আজকের সমাজের এই অবক্ষয় তাতে কিছুটা হলেও লাগাম টেনে ধরা যেত। সমাজের লম্পট পুরুষগুলো অন্ততঃ কিছুটা আতংকে থাকতো মুখোশ খুলে যাওয়ার। পাঁচ বছরে পা দেয়া উইমেন চ্যাপ্টারের পাতায় এবার তাদেরও কিছু কথা, ব্যথা শুনতে চাই। মুখ খুলুন, মনের জানালাটা খুলে দিন, উইমেন চ্যাপ্টারের সাথে সই পাতিয়ে নিন। আপনাদের মগজের ভেতরে পুরুষতন্ত্রের যে বীজটা রোপন করে দিয়েছে আপনারই নির্যাতক স্বামী, সেটাকে একটানে উপড়ে ফেলুন। আপনাদের দু’একটা দুঃখগাঁথা দেখবেন সমাজের ভিতটা নাড়িয়ে দেবে।

উইমেন চ্যাপ্টার ঋজুভঙ্গীতে আরো এগিয়ে যাক। নির্যাতিত, বঞ্চিত, লাঞ্ছিতদের পাশে সাহস হয়ে হেঁটে যাক। শুধু সমস্যা নয়, সমস্যার সমাধানবার্তাও যেন উঠে আসে সইদের গল্পে। এই প্রজন্মের তরুণীদের সাফল্যগাঁথা আসুক, এই সই-বইয়ে লড়াইয়ে জিতে আসার গল্প লিখে শোনাক আলো ঝলমল মুখগুলো। অন্ধকারের আর্তনাদের সাথে সাথে আলোর উল্লাসধ্বনিও যেন শোনায় উইমেন চ্যাপ্টার।

অভিবাদন, উইমেন চ্যাপ্টার। জয় হোক, সই।   

লেখাটি ৮০৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.