হালিম টেস্টিমনি

0

মাসকাওয়াথ আহসান:

হোটেল দ্য রেইনট্রিতে ধর্ষণের অভিযোগে নাঈম আশরাফ ওরফে গান্ধাইলের হালিম গ্রেফতার হবার পর হালিম সোসাইটি আতংকে পড়ে যায়। হালিমের জিজ্ঞাসাবাদে “বৃষ্টি ও আসল পুরুষ”দের ক্ষমতার প্যান্ডোরার বাক্সটি খুলে যাবে এই আশংকায় নির্ঘুম রাত কাটায় নানামহলের বাসিন্দা।

হালিম যেন স্বেচ্ছাসেবী বিনোদক হিসেবে ক্ষমতার নেমেসিস হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। তৈরি হয়েছে হালিম সোসাইটি; সমসাময়িক নব্য বাবু কালচারের ক্ষমতার বুলবুলি আখড়াই যেন কাল হলো। গান্ধাইলের হালিম পুলিশের সামনে কথা বলতে শুরু করার আগেই হালিম সোসাইটি হেমলক সোসাইটির মতো একযোগে হারিকিরি করবে কীনা ভাবতে থাকে। কিন্তু আত্মহত্যা করার সাহস পায় না অনেকে; তাই আত্মপক্ষ সমর্থনের পথ খোঁজে।

ফেসবুকে হালিমের টাইমলাইন যেন প্যান্ডোরার টাইম লাইন; যা থেকে অনায়াসে বেরিয়ে আসে হালিম সোসাইটির বাকি অর্ধেক জীবন; যে অর্ধেক জীবনের কথা তাদের নিজেদের বাসার মানুষের কাছে অজানা। সুতরাং হালিমের টাইমলাইনে যাদের সঙ্গে হালিমের সেলফি রয়েছে তারা অনিশ্চয়তায় পায়চারি করতে থাকে। একজন মিডিয়া কর্মী মিডিয়া থেকে বরখাস্ত হলে; হালিমের টাইমলাইনে হালিমের সঙ্গে তার ছবি পাওয়া যায়। সুতরাং হালিম সোসাইটির আরো অনেকে দাপ্তরিক, দলীয় ও পারিবারিক বরখাস্তের ভয়ে কুঁকড়ে যায়। বিছানায় শুয়ে ছটফট করে হালিম সোসাইটি।

লোকজন হালিমের টাইমলাইনের সেলফিতে যাদের ছবি দেখছে, তাদেরকেই হালিম সোসাইটির লোক বলে ধরে নিয়েছে। অনেকে যুক্তি দেখায়, মন্ত্রী, নেতা, পুলিশ, শোবিজের মানুষকে ভক্তদের মন জোগাতে সবার সঙ্গে ছবি তুলতে হয়; সেলফি তোলার আগে তো কারো পুলিশ ভেরিফিকেশান করিয়ে নেবার সুযোগ নেই। কেউ কেউ প্রতিযুক্তি আনে, পুলিশের সঙ্গে হালিমের ছবিই তো পুলিশ ভেরিফিকেশান। কিন্তু হালিম সোসাইটির গৃহদাহ থেমে থাকে না তাতে; কারো বাবা, কারো মা, কারো স্ত্রী, কারো স্বামী, কারো গার্লফ্রেন্ড, কারো বয়ফ্রেন্ড তাদের গৃহ থেকে বরখাস্ত করে। হোটেল দ্য রেইনট্রি কেলেংকারির কারণে হালিম সোসাইটির কারো পক্ষে কোন হোটেলে রুম ভাড়া পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

প্রত্যেকটি হোটেলে হালিমের সঙ্গে যাদের সেলফি রয়েছে; তাদের ছবির ফাইল খোলা হয়। হালিম সোসাইটির অধিকাংশ সদস্যের একটা সুবিধা হলো; অতীতে তাদের আসল কান খোয়া গেছে; এখন প্লাস্টিকের কান নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে; এ তাদের অভ্যাস হয়ে গেছে। কিন্তু যাদের কান দুটো রয়ে গেছে তারা পড়েছে অপার বিপদে। এখন আশা একটাই, পুলিশের সঙ্গে যেহেতু হালিমের ছবি আছে; পুলিশ নিজেই বাধ্য হবে হালিমের স্বীকারোক্তি সেন্সর করে ছাড়তে। পুলিশ হালিমের সামনে প্যান্ডোরার টাইমলাইন খুলে তাকে বলে, যাদের সঙ্গে সেলফি তুলেছিলেন; তারা কেউই আপনার সঙ্গে কোন সম্পর্ক স্বীকার করছে না। আপনি আতরাফ ঘরের ছেলে আশরাফ সেজে নাকি আশরাফদের বেপথু করেছেন!

–ঐসব আশরাফরা তো ফিডার বেবি না স্যার; ওরা বেপথেই ছিলো। আপনাদের দোয়ায় আমি কাউরে বেপথু করি নাই; আমার কাছে সে তথ্য আছে মাশাল্লাহ; ইনশাল্লাহ আসছে বইমেলায় তা দিয়ে বেস্ট সেলার উপন্যাস ছাড়তে পারবেন স্যার। হালিম যেরকম ইনশাল্লাহ-মাশাল্লাহ সহযোগে কথাবার্তা বলে; তা শুনে একজন পুলিশের মনে হয় ওজু করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা উচিত ছিলো।

কথাসাহিত্যিক তসলিমা নাসরিনের আত্মজীবনী যেমন শিল্পসাহিত্য মহলের অনেকের বাকি “অর্ধেক জীবনে”র প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দিয়েছিলো; তার চেয়ে অনেক বেশী উন্মোচনের ঝুঁকি “হালিম টেস্টিমোনি” নামের উপন্যাসে। হালিম টেস্টিমোনি উপন্যাসে ক্ষমতাবলয়ের অনেক পেশার মানুষ জড়িয়ে আছে; ফলে পুরো একটা সমাজ চিত্র পাওয়া যায় এখানে। হালিম সোসাইটি চেষ্টা করে এ উপন্যাস যেন প্রকাশিত না হয়। রেইনট্রির এক অভিযুক্ত ধর্ষকের বাবা প্রথমদিকে “জোয়ান পোলা এইটুকু করতেই পারে বলে” জাস্টফিকেশান দিয়ে জনরোষে পড়ে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়েছে। অমনি প্রস্তুত ধর্ষণের সমর্থক হাফ-হালিম সোসাইটি বলে,মানুষের ভুল ভ্রান্তি হইতেই পারে; মাফ যখন চাইছে; হ্যারে মাফ কইরা দ্যান মিয়ারা।

এই সেই গ্রামীণ প্রশমন প্রযুক্তি যা দিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী বড় অপরাধ করে পার পেয়ে যায় প্রভাবশালী সোনামাছেরা। হালিম সোসাইটি সেই আবহমান ক্ষমা প্রযুক্তির সুযোগ খুঁজতে থাকে। একটু আশায় চোখ মুদে এলে কেউ কেউ দুঃস্বপ্নে দেখে হালিম পুলিশের সামনে গড় গড় করে আউড়ে যাচ্ছে সোসাইটির অবিশ্বাস্য গল্পগুলো; আর ছাপাখানায় ছাপা হচ্ছে “হালিম টেস্টিমোনি”।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

লেখাটি ২,৩৯৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.