‘ধর্ষণে মেয়েটির দোষ খোঁজা মানেই আরেকটি ধর্ষণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা’

0

জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা:

সবচেয়ে কষ্ট হয় যে বিষয় নিয়ে ভাবতে বা কথা বলতে, সে বিষয় নিয়েই ভাবতে ভাবতে দিন পার হচ্ছে ইদানিং! ‘মাথা ভার’ কিংবা ‘দমবন্ধ হওয়া’ এ পরিস্থিতি’র যেন কোনো মুক্তি নেই! নিত্য নতুন আঙ্গিকে দেখছি ~ একই সে পৈশাচিক ঘটনাটি| জ্বী, ঠিকই ধরেছেন – ‘ধর্ষণ’কেই মিন করছি! আর ‘সে ঘটনা’র পর আমার আশপাশের বেশ কিছু মানুষ নিয়মিতই বিশ্লেষণ করে, কেমনে কেমনে যেন আবিষ্কার করে ফেলছেন ~ ধর্ষণের জন্য নারীই দায়ী! ভালো, খুব ভালো| আমিও আজ ওগুলো নিয়েই ভাবছি! সঙ্গী হতে চাইলে, আসুন ভাবি …..

এ যাবৎকালের ধর্ষণে, সবচাইতে জোরালো যেই পয়েন্টে, মেয়েদেরকে দোষ দেওয়া হয়েছে- তা হচ্ছে তাদের পোশাক নিয়ে| মেয়েরা হাজার হাজার কাপড়ে নিজেদেরকে আপাদমস্তক মুড়ে রাখলে নাকি এইসব আর হবে না! খুবই হাস্যকর যুক্তি যদিও; তবু মানলাম| পুরুষের ‘কন্ট্রোলিং মেকানিজম’ও নাকি মেয়েদেরকেই মাথায় রাখতে হবে! পুরুষ তার চোখের হেফাজতটুকুও করতে শেখে না, পরিবার তথা সমাজ থেকে! সব তোমাকেই করতে হবে গো, মেয়ে! তো, করেছিলও ‘হিজাব পরিহিত তনু’! সে কেন ধর্ষিত হলো? এতটুকু বিচারও সে কেন তার ‘মৃত্যু’র দামেও পেলো না?

বনানীর ধর্ষণ-অপকর্মে আমরা যখন গর্জে উঠেছি- তিন মূল ধর্ষক সহ সহযোগী পশুগুলো’র বিচারের দাবীতে, তখনও বিরাট একটি অংশ গজিয়ে গেল আশেপাশে! যারা ইনিয়েবিনিয়ে বলছেন, ‘ছেলেগুলোর দোষ একটু আছে; তবে মেয়েদুটোও কম দোষী নয়| তারা কেন গেল, রাতের বার্থডে পার্টিতে?’
ভালো| ভালো কথা!

তার একদিন পরেই নিউজে সবাই জানলাম – তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ুয়া বাচ্চা একটি মেয়ে, মসজিদে ধর্ষিত হয়েছে| এখনও সেই সুধী দর্শকদের (‘ধর্ষক’ বলিনি কিন্তু) কোনো মন্তব্য পাইনি অবশ্য! কেন সে বাচ্চা মেয়েটি ধর্ষিত হয়েছে? হিসেবে, তাদের বলা উচিত- মেয়েটির উচিত হয়নি, ইমামের কাছে মসজিদে পড়তে যাওয়া! …এখনো নীরব আছেন, হয়তো মেয়েটার কি দোষ দেওয়া যায় ~ভাবছেন তারা!

…..মাস খানেকও বোধহয় হয়নি, ৮ বছর বয়সী কন্যার ধর্ষণের বিচার না পেয়ে, পিতা-পুত্রীর একযোগে ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ার! আর নিতে পারছি না, প্রিয় সুধী! আর কত হাস্যকর দোষ খুঁজে ধর্ষককে আড়াল করবেন, কী জানি!

নাসিরুদ্দিন হোজ্জা’র খুব কমন একটা গল্প মনে পড়ে গেল| উনি একদিন খুব হৈচৈ করে চাবি খুঁজছিলেন তাঁর বাগানে| উনার বন্ধুও এসে তাঁর সাথে চাবি খোঁজায় মন দিলেন| অনেক খুঁজেও না পেয়ে শেষে বন্ধুটি বললেন, ‘দোস্ত বলো দেখি, তোমার চাবি ঠিক কোথায় হারিয়েছে?’ হোজ্জা সাহেব বললেন, ‘চাবি হারিয়েছি, আমার সবার ঘরে|’  বন্ধু তো তাজ্জব! বললেন, ‘আশ্চর্য! হারিয়েছে ঘরে, আর খুঁজছো বাগানে?’  হোজ্জা সাহেব উত্তর দিলেন, ‘কি করি, বলো? ওখানে যে খুঁজতেই পারবো না! নিকষ অন্ধকার| তাই এই বাগানের আলোতেই এসে খুঁজছি!’

…. আমাদের চারপাশের এইসব সুধীবৃন্দকে দেখে মনে হয়, উনারা হোজ্জা সাহেবের গল্প থেকে, সুবিধামতন একটা কোনো মোরাল খুঁজে নিয়েছেন! যাকে (হোক না, তারই আসল দোষ) দোষ দিয়ে কোনো লাভই হবে না, তাকে দোষ না দিয়ে; যাকে দোষী করলে এ ঘূণে ধরা সমাজে দুটো হাততালি পাওয়া যাবে, তাকেই দেয়| তার কাছেই টর্চ লাইট নিয়ে দোষ খুঁজে বেড়ায়!

উনারা তা করতে থাকুন; কিন্তু তাদেরও জানা দরকার~ বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে তারা যত বেশি দোষীকে ছাড় দিয়ে, নির্যাতিতের মাঝে দোষ খুঁজবেন; ততই সে বিপদ তাদের দিকেও ঘনিয়ে আসবে! তখন তাদের পাশে দাঁড়াবার মতো কেউ কিন্তু আর থাকবে না! একটু চারিদিকে চোখমেলে তাকালেই, তারা বুঝতেন~ ধর্ষিতার মাঝে দোষ খুঁজে খুঁজেই তারা ধর্ষককে এত প্রশ্রয় দিয়েছেন| আর ঘন্টায় ঘন্টায় নতুন একটি করে ধর্ষণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছেন!

লেখাটি ৮১৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.