উইমেন চ্যাপ্টার বিতর্ক

লীনা পারভিন:

মূলত সামাজিকভাবে আমরা এখনো নারীদেরকে কথা বলতে দেখতে অভ্যস্ত নই। তার মাঝে যদি কেউ মুখের গোটা অংশ খুলে এবং গলা উঁচু করে কন্ঠস্বরকে বিড়াল স্কেল থেকে বাঘের স্কেলে নিয়ে কথা বলে তাহলে মোটামুটি গাত্রদাহ হতে থাকে। এই মানসিকতা কেবল পুরুষের মাঝে নয় আছে আমাদের নারীদের একটা বড় অংশের মাঝেও।

এখানে অবশ্য লিঙ্গের কোন বিষয় কাজ করে না। বিষয়টা হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার। অর্থাৎ আপনি একজন নারীকে দেখতে চান সামাজিকভাবে সৃষ্ট একটি অবয়বে। এটা যারা দেখেন তাদের সবার দোষ বলেও আমি চালাতে চাইনা কারণ তারা জন্ম থেকেই এই শিক্ষায় বড় হয়েছে। ভিন্নভাবে দেখার হয় তার সুযোগ হয়নি বা সেই সুযোগ সে গ্রহণ করতে রাজি না। আর এই মানসিকতায় একজন নারীর স্বাধীনভাবে চলাফেরার কোন পারমিশন নাই। সে চাইলেই যেকোন বিষয় নিয়ে বিতর্কও করতে পারবে না। একপ্রকার গুমোট পরিবেশে নারীদেরকে আবদ্ধ করে রাখা হয়। সেখানে একজন মানুষ গুমড়ে গুমড়ে মরে গেলেও কারো কিছু যায় আসে না। এই যে এহেন মানসিকতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আমাদের শিক্ষিত অশিক্ষিত প্রচুর মানুষের মাঝে। নারীর জন্য নেই কোন পত্রিকা, নেই কোন খোলামেলা কথা বলার, মনের ভাব প্রকাশ করার কোন জায়গা।

সেখানে একমাত্র ব্যাতিক্রম হয়ে জন্ম নিলো উইমেন চ্যাপ্টার নামের একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। এটি কোন পত্রিকার কনসেপ্টে কাজ করে না। এখানে দেশ বিদেশের প্রচুর মানুষ নিজেকে মেলে ধরে। বিশেষ করে নারীরা। এই পোর্টালটির কারণে এখন সমাজে অনেক মেয়ে কথা বলার মতো সাহস পায়। এখানে সাহস বলতে পেশীর সাহস নয়, মনোবলের সাহস। অনেকেই হয়তো নিজে লেখতে পারে না, কিন্তু অন্য আরেকজনের লেখা পড়ে সে নিজেকে খুঁজে নিতে চায়। এভাবে করেই নারীদের মধ্যে গড়ে উঠেছে একধরনের মতের ঐক্যের জায়গা।

অনেক অলেখককে লেখকের জায়গায় স্থান দিয়েছে। কেউবা এখানে থেকেই হাতেখড়ি নিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছে। লেখার মান বিচার করার মত জায়গা আছে কিন্তু আমি মনে করি যে দেশে মেয়েরা নিজের কাছের মানুষটির কাছে মনের কথা খুলে বলতে পারে না সে দেশে কিছু মেয়ে কথা বলার চেষ্টা করছে এটাই অনেক বড় বিষয়। এখানে বিষয়ের ভ্যারাইটি যেমন থাকে তেমন থাকে শিক্ষণীয় অনেক বিষয়।

এই পোর্টালটি নিয়ে আমার ব্যক্তিগতভাবে যে সমালোচনা নাই তা নয়। আছে। অন্তত চার বছর পর এসে এখন হয়তো সম্পাদকের ভাবার সময় এসেছে তিনি কোন সম্পাদকীয় নীতি তৈরী করবেন কিনা! লেখার গুণগত মান যাচাইয়ের জায়গায় যাবেন কি না। কারণ আমি মনে করি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার চেয়ে তাকে প্রতিষ্ঠিত করা এবং তার গ্রহণযোগ্যতাকে বেশিরভাগের কাছে নিয়ে যাওয়াটাই হচ্ছে সফলতার নির্ণায়ক।

আপনার সমালোচনা থাকতে পারে, কোন নির্দিষ্ট লেখা আপনার পছন্দের না হতেই পারে, কারণ এখানে কোন ব্যক্তিকে মাথায় রেখে লেখা হয় না। লেখা হয় সমাজের বেশীরভাগের ইস্যু নিয়ে। কিন্তু সমালোচনার নামে যখন আপনি ব্যক্তি আক্রমনে চলে যান তখন আপনার উদ্দেশ্য এবং আদর্শ নিয়ে আমার প্রশ্ন জাগে।

সমাজে নারী এবং পুরুষ কেউই কারো প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দুইপক্ষের কেউই কোন সৃষ্টি করতে পারেনা। তাই আপনি যদি নারীবান্ধব হয়ে থাকেন, আপনি যদি মনে করেন নারীদেরকে মানুষ হিসাবে স্বীকৃতি দেয়াটা সমাজের জন্যই প্রয়োজন তাহলে আগে নিজেকে যাচাই করুন, একটু ফ্ল্যাশব্যাক করুন নিজের চিন্তার জগতে। ঠিক কোন বিষয়টি আপনাকে পীড়া দিচ্ছে? কোন লেখার বিষয়বস্তু নাকি একজন নারীর কথা বলার সাহস?

একজন নারী কোন বিষয়ে কীভাবে লেখবে সেটা সম্পূর্ণই তার নিজস্ব চিন্তার এবং দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে সম্পর্কিত। ঠিক তেমনি সেই লেখাকে আপনি কেমন করে গ্রহণ বা বর্জন করবেন সেটাও নির্ভর করছে আপনার নিজের মানসিকতা ও বিশ্লেষণের মত সক্ষমতার উপর। আপনার কাছে পালটা যুক্তি থাকলে লিখুন না। উইমেন চ্যাপ্টারে না হলেও অন্য কোথাও। চিন্তার লড়াই হতেই পারে। বরং চিন্তার লড়াই সমাজের বদ্ধ পানিতে ঢেউ সৃষ্টি করে, নর্দমাকে সরিয়ে পরিষ্কার পানির সন্ধান দেয়।

উইমেন চ্যাপ্টার একটি বিশাল লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে যেখানে খারাপ ভালো সবই আছে এবং থাকবেই। সমাজের অনেক ট্যাবুকে তারা ভাঙ্গতে সাহায্য করছে। সেখানে আপনাকে আমরা একজন সহযোগীর ভুমিকায় চাই আপনার সমালোচনা দিয়ে, লেখনী দিয়ে। কিন্তু এর সবটাই হতে হবে রুচিসম্মত, যুক্তির ভিত্তিতে কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণের মাধ্যমে নয়, বা কাউকে আইনের ভয় দেখিয়ে নয়। এখানে আপনার সাথে কেউ পেশীর লড়াইয়ে নামেনি।

উইমেন চ্যাপ্টার একটি চিন্তার লড়াই করছে, ভাবজগতের পরবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। নারীশক্তিকে দমন করে নয় বন্ধুর মতো পরামর্শ দিয়ে তাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করুন। নিজেকে পুরুষ নয় একজন মানুষ হিসাবে আরেকজন মানুষের মত প্রকাশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হিসাবে পরিচিত করুন।

আর যদি না পারেন, বুঝবেন, আপনি এখনো মানুষের মর্যাদায় আসতে পারেন নি। সে এবার আপনি নারী বা পুরুষ যেই হোন না কেন।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.