আমরা নাম প্রকাশে ইচ্ছুক নই

0

সাদিয়া সুলতানা:

আমার একটা লেখা আছে, আত্মকথন ধরনের, শিরোনাম আমরা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নইএকটা সাহিত্য ব্লগে ও দুটো ফেসবুক গ্রুপে লেখাটা পাঠকপ্রিয়তা পায়। লেখাটায় আমি আমার সন্তানদের গল্প লিখেছি। আমার ছেলে ও মেয়ের স্বপ্নমুখর শৈশবের গল্প। যেখানে বলেছি, বাচ্চাদের পেডোফাইলদের হাত থেকে রক্ষার জন্য উপযুক্ত সেক্স এডুকেশন আর সচেতনতার শিক্ষা দেয়ায় আমার নিজের চেষ্টার কথা। নিজের যেই গল্পগুলো নাম প্রকাশ না করে বেনামে লিখেছি সেই গল্পগুলো যেনো আমার ছেলেমেয়ের না থাকে, সেই প্রার্থনা করে লেখাটা লিখেছি আর ভেবেছি ওরা যেনো বলে, আমরা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নই।

আজকের লেখার শিরোনাম, ‘আমরা নাম প্রকাশে ইচ্ছুক নই।’ কখনো ভাবিনি এই শিরোনামে কোনো লেখা লিখবো তবু লিখতেই হচ্ছে। কারণ নাম প্রকাশ হবার আশংকায় বুকসিন্দুকে বন্দি  থাকা কিছু গল্প কারণেঅকারণে সময়অসময় লুকোনো জায়গা থেকে বের হতে চায়।

যখন একজন পাঠক ইনবক্স করে জানান,

সাদিয়া তোমারআমরা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নইলেখাটা পড়ে গলার কাছটায় আটকে গেলো, চোখ ঝাপসা হলো। আমি তোমার মতো সাহসী না, হলে আমিও লিখতাম, চিৎকার করে বলতাম। ছোটবেলায় ঘটে যাওয়া নোংরা ঘটনা গুলো সবার সামনে বলে দেখতাম মানুষের আসল রূপ। কিন্তু আমি তোমার মতো সাহসী না। আমার মেয়েকে বছর বয়স থেকে শিখিয়েছি নিজের শরীরের কিছু স্থান সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। সেখানে কেউ হাত দিলে চিৎকার করতে বলেছি। না বলতে বলেছি।

তখন আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে যায় তার গল্পটা নাম প্রকাশ না করেই বাইরের জগতকে জানানোকিন্তু এসব গল্পপাঠে প্রথমে যেই খটকাটা লাগে তা হলো, আমার বা আমাদের দোষ বা অপরাধ না থাকলেও বরাবর আমাদেরই কেনো নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক থাকতে হয়?

মুখে স্বীকার করি না করি, কারণটা আমরা জানি। কোনো মেয়ে যৌন হয়রানির শিকার হলে প্রথমেই যখন অধিকাংশ সচেতন মানুষের মগজে কিছু প্রশ্ন কিলবিল করে, তখন তো নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হতেই হয়। কেনো গিয়েছে? অত রাতে কেনো গিয়েছে? একা কেনো গেলো? সাথে কে ছিলো? মেয়েটির পরনে তখন কী ছিল? ইত্যাদি ইত্যাদি হলো সেসব বুলেট প্রশ্নএসব প্রশ্নের উত্তর দেবার দায় মেয়েটির উপরে বর্তায় বলে তাকে মাটিতে মুখ গুঁজে থাকতে হয়।

কিন্তু প্রশ্ন তো আসবেই। প্রশ্ন করতেই তো সামাজিক জীবেরা মুখিয়ে থাকে। যাহোক সমাজের প্রশ্নের বেড়াজালে পড়ে মেয়েটিও নিজের পরিচয় লুকিয়ে নিজে সাবধানী হবার চেষ্টা করে। তার জন্য তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও সাবধানী হয়।

আমার সাথে একজন সাবধানী বাবার পরিচয় আছে যিনি তার মেয়ের প্রতি আসন্ন যৌন হয়রানি এড়াবার জন্য মেয়েকে ধর্মীয় শিক্ষা দিতে চান, পর্দা করাতে চান এবং তার মেয়ে যেনো ছেলেদের সাথে পার্টি করতে যেতে না পারে সে বিষয়ে আগাম ব্যবস্থা নিয়ে রাখতে চান। আমি খানিকটা ফ্যাসাদে পড়েমেয়েটির পরনে কী ছিলইস্যুটা বোঝাতে গিয়ে বোকা বনে যাই। ভদ্রলোকের মগজের যেই জায়গাটায় টোকা দিচ্ছিলাম সেখানে ঢোকার আমার সাধ্য নেই। তাই তর্কে জিততে মন চায় না। ভদ্রলোকের জন্য উল্টো মায়া লাগতে থাকে, আরে মেয়েকে-ছেলেকে বাইরে যেতে দিবেন না, যখন বিপদ ঘরে এসে ঘাপটি মেরে বসে থাকবে, তখনকার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন তো? নতুবা তার জন্য প্রতিরোধকমূলক ভাবনাটা ভেবে রেখেছেন তো?

আপনি হয়তো টেরই পাবেন না, চার দেয়ালের মধ্যেই আপনার সন্তানের অনেক গল্প জমতে থাকবে, যেগুলো বলতে সেও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হবে।আসলে কিছু কথা, কিছু অভিযোগ এত ভারি যে, সেই ভার কেউ বহন করতে চায় না। সেজন্যই নিজেকে ঢেকে রাখার ছল। তবু সেই কথাগুলো বুকের দেরাজ উপচে ঠিকই কোনো একবেলা প্রকাশ করতে মন চায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পাঠকের সেরকম কিছু কথা প্রকাশ করার দায়িত্ব পেয়ে তাই আজ আবার লিখতে বসতেই হলো

এবার তাহলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেই মায়ের, সেই মেয়ের গল্পটা বলি। ধরুন সেই মেয়েটির নাম মুনিয়ার মা। তার নিজের একটা নাম আছে কিন্তু নিজেকে তিনি মুনিয়ার মা হিসেবে পরিচয় দিতে খুব ভালোবাসেন। কারণ মুনিয়া প্রিম্যারিউরড বেবি হওয়ায় তাকে ৫২ দিন হাসপাতালে কাটাতে হয়েছে। মুনিয়ার জন্মের সময় মুনিয়ার মায়ের জটিলতা দেখা দেয়ায় তার জরায়ুটা কেটে ফেলে দিতে হয়েছে। সেই বুকের মানিক মুনিয়ার জন্য মুনিয়ার মায়ের আদরের পাহাড় দিনরাত কেবল চোখের পানিতে গলে।

সেই মুনিয়ার মা কাঁদতে কাঁদতে আজ আমাকে মেসেজ করেছে,

সেদিন আমি বাসা থেকে বের হয়েছি, মেয়েকে পাহারা দিতে রেখে গেছি আমার হাজব্যান্ডকে। ওকে আমার জীবনের সব কিছু বলেছি। আমার হাত ধরেছে আরো শক্ত করে। দুজনে মিলে মেয়েকে আগলে রেখেছে সব নোংরামি থেকে। কী যে হলো সেদিন, বেচারার চোখ লেগে গেলো বসতে বসতে। ব্যস, সুযোগ পেয়ে আমার ছোট্ট বাচ্চাটার বুকে হাত দিলো হুজুর।

আমার মেয়ে সঙ্গে সঙ্গে সরে গিয়ে বললো, এমন করলে কেন হুজুর? হুজুর ঠোঁটে আঙ্গুল চেপে বললো, শুস। মানে, কাউকে বলবে না। তারপর আস্তে করে কেটে পড়লো। আমার মেয়ে সাথে সাথে তার বাবাকে ডেকে তুলে সব বললো।
আমি বাসায় ফিরে সব শুনে অনেক কেঁদেছি, অনেক! আমার আর কোনো বাচ্চা হবে না। আর এই একটা মেয়েকে আমি এই নোংরামি থেকে বাঁচাতে পারলাম না। আমার হাজব্যান্ড বললো, ফোন করে হুজুরকে আসতে বলো, বেতন নিয়ে যেতে বলো হুজুর আসার পর ইচ্ছামতো হুজুরকে পিটিয়েছে। দ্বিতীয়বার এরকম করার আগে মারগুলো যেন মনে পড়ে।
কেনো জানি সাদিয়া তোমাকে এসব বলতে ইচ্ছা করলো। তুমি তো লেখো, আরো বেশি বেশি লেখো এইসব ব্যাপারে, যাতে মা বাবারা আরো সচেতন হয়, বাচ্চারা যেন বুঝতে পারে কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ স্পর্শ।

তবে হুজুর প্রজাতির উপর আমার অবিশ্বাস কোনোদিন যাবে না। সত্যি বলছি, এই পর্যন্ত ভালো হুজুর দেখিনি, সবগুলা বিকৃত কামনা বাসনা নিয়ে প্রেতাত্মার মতো ঘুরে বেড়ায় আর অসহায় শিশুগুলোকে ছোবল মারে। আমার মেয়ে যখন হুজুরের কাছে পড়তো, আমি পাশেই বসে পাহারা দিতাম। কেমন শিক্ষা চিন্তা করো? যেন ফণা তোলা সাপের সামনে তুলতুলে মুরগির ছানা রেখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ্য রাখা, যাতে ছোবল না মারে

আর দেখো, যখন হুজুরকে আমার হাজবেন্ড পিটাচ্ছিলো, আমার মা বলছিলো, থাক, আর মেরো না, বাইরে গিয়ে আমাদের বাসার বদনাম করবে! আমি অবাক হয়ে ভাবলাম এই চিন্তাগুলো বদলাবে না কোনোদিন? আমি যখন আমার হুজুরের কথা বলতাম, আমার মা বলতো, আমি পড়া ফাঁকি দেয়ার জন্য এমন বলছি! আমি ঠিকমতো বুঝিয়ে বলতে পারতাম না প্রতিনিয়ত লোকটা আমার শরীরে হাত দিচ্ছে, আমাদের সামনে লুঙ্গির উপর দিয়ে নিজের যৌনাঙ্গটা ধরছে পুরোটা সময়।

ছোট্ট আমি বুঝতাম না ঠিক কীভাবে বললে মা বুঝবে। সেদিন কেউ পারতো না হুজুরকে এভাবে পিটাতে? শুধু অভিশাপ দিয়ে সারা জীবন এই কুৎসিত বোঝাটা বইতে না হলে কী এমন ক্ষতি হতো? যখন মনে হয় সেই হুজুরটা দিব্যি ভালো খেয়ে পড়ে দিন কাটাচ্ছে, আমার শুধু ধ্বংস করে দিতে ইচ্ছা করে। এই ঘৃণাটা বয়ে বেড়ানো খুব কষ্টের, খুব। আমি চাই না পৃথিবীতে আর কোনো শিশু এভাবে বেড়ে উঠুক। তুমি লিখো সাদিয়া যেনো অন্য বাবামা সচেতন হয়।

আমি পড়লাম মুনিয়ার মায়ের লেখা, আর থমকে গেলাম। এই গল্পটা আমার চেনা। এই গল্পটাই আমার গল্পের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেই মেয়ের গল্প, মায়ের গল্প।

লেখাটি ১,৮৭৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.