সন্তান বিপথে যাওয়ার প্রথম দায়টা কিন্তু বাবা-মা’র

0

রাবিয়া আনজুম:

ব্যস্ত বা নির্জন যেকোনো রাস্তাতেই পথচারীর সাথে চলন্ত গাড়ীর সংঘর্ষে সৃষ্ট দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেও হয়তো হলফ করে বলা সম্ভব নয় কে দায়ী ছিল, নিরপেক্ষ তদন্ত বা অন্ততপক্ষে চাক্ষুষ সাক্ষীর বিবরণে সেটার দায়ী চিহ্নিত করা সম্ভব। কিন্তু ধর্ষণের মতো অপরাধে খুব বাছ-বিচারের প্রয়োজন নেই, ধর্ষণের ঘটনায় মেয়েরা সবসময়ই ভিকটিম হবে, আর অপরাধ সংঘটনের দায় অবধারিতভাবে পুরুষ ধর্ষককেই নিতে হবে।

বনানী’র রেইনট্রি হোটেল বা দেশের অন্যখানে প্রায় প্রতিদিনই ঘটে যাওয়া ধর্ষণের ঘটনাগুলোও এর ব্যতিক্রম নয়। এ নিয়ে বিস্তর লেখালেখিও হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই, গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের চাপে মূল অভিযুক্তরা ধরাও পড়েছে।

বিশ্বাস রাখছি দেশপ্রেমী আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপর আর আইন আদালতের উপরও, দোষীদের উপযুক্ত বিচার নিশ্চিত সম্ভব হবে আশা করছি। সুতরাং আজকের লেখায় ধর্ষণ বা বনানী প্রসঙ্গে ফোকাস না করে আমরা যারা সন্তানের বাবা-মা তাদের কিছু করণীয় আছে কিনা সন্তানদেরকে সুপথে পরিচালনা করার আর তাদের মধ্যে শুভবুদ্ধির উদয়ে ভূমিকা রাখার যেন তারা ন্যায় অন্যায়ের বিভাজনটা সহজেই বুঝতে পারে, সে বিষয়ে দু’টো কথা নিবেদন করতে চাই।

যারা মেয়ে বা মেয়ে সন্তানের বাবা-মা, শুধু তাদেরকেই যে অজানা আশংকায় থাকতে হবে, তা কিন্তু নয়, আইনের শাসন নিজ গতিতে চললে কিন্তু ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত ছেলেটি পার পেয়ে যাবে তেমনও নয়, তারও জীবন নষ্ট হওয়ার সব রকম ঝুঁকিই থাকে, সুতরাং ছেলে বা ছেলে সন্তানদের বাবা-মা’কেও অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে যেন তার বা তাদের দ্বারা কোন অপরাধ সংঘটিত না হয়।

আমার প্রথম পয়েন্ট হচ্ছে সন্তানদেরকে মানুষ হিসাবে গড়ে তোলার জন্য সর্বোচ্চ সচেষ্ট থাকতে হবে বাবা-মা’কে। একটি শিশুর জীবনের প্রথম আইডল কিন্তু তার বাবা-মা, বাবা-মা’ই তার জীবনের প্রথম নায়ক নায়িকা। বাবা মা’র চাল চলন, আচার ব্যবহার, ন্যায় অন্যায়ের সংজ্ঞায়ন থেকেই সে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করে। শিশু জন্ম নেয় তার মস্তিস্কে একটি ব্ল্যাংক হার্ডডিস্ক নিয়ে, পরে বাবা-মা আর পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে নানা তথ্য নিতে নিতে তার মস্তিস্ক ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ হয়। এরকম নিষ্পাপ কোমলমতি শিশুরা যদি বড় হতে হতে ন্যায়-অন্যায় না বুঝে বিপথে পা বাড়ায় তবে তার দায় সন্তানের বাবা-মা হিসাবে আমরা কখনোই এড়াতে পারি না।

আমি আমার সন্তানের স্কুলে দেখি কিছু ছোট ছোট বাচ্চা আছে, এইটুকুন, কিন্তু কেমন যেন রুক্ষ তারা, অহেতুক তাদের সহপাঠিদেরকে পেন্সিল বা এটা-সেটা দিয়ে আঘাত করছে, শিক্ষকদের সাথে করছে রূঢ় আচরণ। আধুনিক যুগের শিক্ষালয়ে ছোট বাচ্চাদের শাস্তি দেয়ার বিধান নেই, ফলে বড়জোর তাদের গার্ডিয়ানদেরকে সেটা রিপোর্ট করা হয়, কিন্তু রিপোর্টে সেসব দুষ্টু বাচ্চাদের বাবা-মাকে বিশেষ বিচলিত বলে মনে হয় না।

কিছু বাচ্চাদেরকে দেখি ছুটির সময় পাশের দোকান থেকে এটা-সেটা কিনে দেয়ার জন্য কী ভীষণভাবে জেদ করছে। এসব দেখে আমি আতংক বোধ করি ভবিষ্যত ভাবনায়। মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে, গুছিয়ে লিখতে পারছি না কিছুই।আপনারা নেটে সার্চ দিয়ে দেখবেন, মূলত সন্তানদেরকে যথেষ্ট সাহচর্য আর কোয়ালিটি সময় না দিতে পারাই তাদের বদমেজাজী আর অসহিষ্ণু হয়ে যাওয়ার পেছনে দায়ী। বদমেজাজ নিয়ে বড় হতে হতে এরা একসময় একরোখা হয়ে যাবে, কারো কথাতেই কর্ণপাত করবে না, কোনটা ন্যায়, কোনটা অন্যায়, সেদিকেও ভ্রুক্ষেপ থাকবে না।

ধর্মীয় অনুশাসন নিয়ে না হয় কথা নাই বললাম, অনেকেই অনেক রকম ব্যাখ্যা দিবেন পক্ষে বিপক্ষে, প্রসঙ্গক্রমে চলে আসবে অপ্রাসঙ্গিক কিছু অপ্রীতিকর মন্তব্যও। কিন্তু আমরা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য সাধারণ রীতি-নীতির চর্চাগুলোতো পরিপালন করতে পারি। ধর্মের বিধিনিষেধ নিয়ে নানা মত থাকতে পারে, কিন্তু আমরা যে সামাজিক প্রাণী, সমাজেই আমাদের বসবাস সে কথা তো ফেলে দেয়া যাবে না। তাহলে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য আচার পরিপালনে সমস্যা কোথায়!

আজকালকার ছেলে-মেয়েরা অবশ্য খুবই সামাজিক হয়েছে, এতোই সামাজিক যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে প্রায় যতক্ষণ জেগে থাকে ততক্ষণই। ধর্ষণের দুর্ঘটনা ঘটে গিয়ে খবরে চলে এসেছে বলেই তা নিয়ে এতো তোলপাড়, কিন্তু আরো শত শহস্র ঘটনা আমাদের চারপাশে হরহামেশা ঘটছে তার খবর কি আমরা জানি? নাকি ঘটনা শুধু ফৌজদারী দণ্ডবিধির অপরাধের ধারায় পড়লেই কেবল তা নিয়ে চেঁচামেচি করতে হবে! যেগুলো ফৌজদারী অপরাধ হলো না, কিন্তু সামাজিকভাবে খুবই অগ্রহণযোগ্য হলো, তা নিয়ে কেউ কিছু বলছে না কেন? সেগুলোর খোঁজখবর বাবা-মা’য়েরা রাখছেন না কেন?

ছেলেমেয়েরা স্কুল টাইমে পালিয়ে পার্কে যাচ্ছে, সেটা আমাদের সময়েও ছিল, তবে লুকিয়ে, একটা অপরাধবোধ কাজ করতো। এখন সেগুলো ভিডিও করে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। খুব আয়োজন করে ছেলেমেয়ে স্কুল ড্রেস পড়ে একে অপরকে প্রেম নিবেদন করছে, পাশে অন্য বন্ধুরা গোল হেয়ে ঘিরে ধরে নেচে গেয়ে মুহুর্তটা উদযাপন করছে, আরেক দল পুরো ঘটনা ভিডিও করে ইন্টারনেটে ছেড়ে দিচ্ছে।

অভিজাত এলাকাগুলোতে গভীর রাতে বসছে ডিজে পার্টি। ফেসবুকে এ্যাডাল্ট পেজের তকমা লাগিয়ে চালু রয়েছে একাধিক পেইজ, সেগুলোর খবরও এই উইমেন চ্যাপ্টারের লেখা পড়েই জেনেছি। সেসব পেইজের পোস্ট আর কমেন্টগুলো (ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে) দেখে সংবেদনশীল যে কেউ বেশ কিছুক্ষণের জন্য হলেও হতবাক হয়ে বসে থাকবেন। এসব কিছু ফৌজদারী দণ্ডবিধির কোনো ধারায় হয়তো পড়বে না। কিন্তু এসবই চূড়ান্ত সামাজিক অবক্ষয়ের নমুনা, আর এসবের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে অনিয়ন্ত্রিত জীবনের হাতছানি।

বাবা-মা’য়েদের প্রতি আমার আকুল আবেদন, প্লিজ দয়া করে সন্তানদের সময় দিন, তাদের সাথে সবচেয়ে কাছের বন্ধুর মত মিশুন, ভুল করলে প্রশ্রয় না দিয়ে সাথে সাথে তা শুধরে দিন, প্রয়োজনে শাসন করুন। আর সবচেয়ে বড় কথা তাদের মধ্যে মানবিক গুণাবলী সঞ্চারিত করুন, আর অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখান। আর মনে রাখবেন নিজেরা বিপথে থাকলে সন্তান সুপথে থাকবে, সেকথা কোনদিনই আশা করা ঠিক না। আমাদের ছেলে সন্তান, মেয়ে সন্তান সবাই যেন সুপথে থাকে, থাকে দুধেভাতে।

লেখাটি ২,০৮৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.