“পুরুষ” শুধু না, এইবার “মানুষ” হয়ে উঠুন

0

ইশরাত জাহান ঊর্মি:

আসলেই এবার আপনারা করুন আন্দোলনটা। এই আন্দোলনটা সবচেয়ে বেশি জরুরী আপনাদের সম্মানের জন্য। আপনারা পুরুষ শব্দটাকে গালির সমার্থক করে তুলেছেন। নারীরা এখনও খুব অবাক হন।

যাদেরকে ভাই, বন্ধু, সহকর্মী ভাবেন, সহযাত্রী আর সুখ-দু:খের সাথী ভাবেন-কোন কোন ধর্ষণের ঘটনায়, কাজী আরিফ টাইপ প্রতারণার ঘটনায় পুরুষেরা তাদের ব্রাদারহুডের পোক্ত রূপটি দেখিয়ে ফেলেন। ব্যথিত নারীরা তখন অবাক হন। এই পুরুষদের তারা আপন ভেবেছেন ভেবে কষ্ট পান। আমার অবাক লাগে না। এই তন্ত্রটা তো একটা সিস্টেম। তাই পুরুষরা, নারী রেপড কিভাবে হচ্ছেন সেইদিকে নজর রাখেন। ভিক্টিম যদি হিজাবী হোন, তাইলে একরকম প্রতিক্রিয়া, ভিক্টিম যদি “ওপেন মাইন্ডেড” হয়, তাইলে আরেক রকম।

ধর্ষণ ধর্ষকের কারণে হয়, নারীর পোশাক বা অন্য কোনো কারণেই না-সেইটা পুরুষরা কোনো অবস্থাতেই মানতে রাজী নন। অধিকাংশ পুরুষ আরকি, যারা তা মানেন তারা খড়ের গাদায় সুঁচ।

বৃহস্পতিবার ডিবিসি নিউজ এর রাজকাহন দেখছিলাম। ব্র্যাক এর একজন কর্মকর্তা আসিফ সালেহ অতিথি ছিলেন একজন। তিনি বলছিলেন, দীর্ঘ নারী আন্দোলনে একটা ভুল হয়ে গেছে। সেটা হলো পুরুষদের সম্পৃক্ত করা হয় নাই। এমনকি সামাজিক উন্নতির নানান সূচকেও পুরুষের অংশগ্রহণ কম হওয়ার সমস্যায় পড়েছেন তারা। স্যালাইন বানানোর যে পদ্ধতি ব্র্যাক শিখিয়েছিল এক চিমটি লবণ আর একমুঠ গুড়ের-দেখা গিয়েছিল নারীরা এটা বানানো শিখেছিল, কিন্তু পরিবারের পুরুষ সদস্যর অনুমতি ছাড়া পীড়িত সন্তানদের তা দেয়ার সাহস করেনি। তারপর পুরুষদের সম্পৃক্ত করার পর সমাধান হয়।

নারীর হলো চিরকাল অনুমতি নেয়ার দায়। যে দেশের নারীরা দশক দুই আগে সন্তানরে স্যালাইন খাওয়ানোর অধিকারও পায়নি, পুরুষদের অনুমতি ছাড়া সেইখানে রাত-বিরেতে পার্টি করতে যাওয়া মেয়েরা এখন বেশ্যা প্রমাণিত হবেন, এতে অবাক হওয়ার কিছু নাই। কিন্তু এই যে ফেসবুক এবং ফেসবুকের বাইরে চরাচর জুড়ে পুরুষ এবং পুরুষমানস এর নারী চরিত্রের শক্ত পদচারণা- এর কারণ কি?

চোখের সামনে প্রতিনিয়ত ভাসে আমার দেখা হাজারও পুরুষ। বিশ্বাস করতে অবাক লাগে যে এই পুরুষেরা নারীকে কী অসম্ভব সেক্স অবজেক্ট হিসেবে দেখে! প্রতিটা মুহূর্তে তারা নারীকে স্রেফ যৌন আকাঙ্খার একটি বস্তু হিসেবেই মনে করে। এর বাইরে কিছুই না। কিছুই না। কোনো কোনো পুরুষ আছেন যারা বড়জোর নারীকে মা-বোন এবং কন্যা হিসেবে দেখে থাকেন। সবার ঘরেই মা-বোন আছে বলে আহাজারি করেন।

আমরা চিৎকার করে বলেছি, প্লিজ মানুষ, নারীকে স্রেফ মানুষ হিসেবে দেখেন, এতে আপনিও ভালো বোধ করবেন। কিন্তু তারা তা করেনি। কেন করেনি? পুরুষেরা কেন শুধু পুরুষ হয়েই রইলো, মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষ কেন হলো না, এই দায়টা কাদের সেইটা এখন সবাই মিলে ভাবার সময় এসেছে।

ছোট একটা ঘটনা দিয়ে শেষ করি। পরিস্থিতির তুলনামূলক বিশ্লেষণে সুবিধা হবে আপনাদের। ২০০৪/৫ সালের দিকে রোকেয়া হল নিয়ে একবার গুজব ছড়ালো। এইখানে মেয়েদের গোসলের ভিডিও পাওয়া যাচ্ছে। সম্ভবত ছেলেদের কোনো হল থেকে এই গুজব ছড়ানো হয়েছিল। তখনো সেক্সুয়াল এক্টিভিটির ভিডিও অতো পুরুষপ্রিয় হয়নি। তো সেই ভিডিও নিয়ে রাজধানী বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা তোলপাড়। একটা ডিপার্টমেন্টের একটা মেয়ের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনা হলো যে সে গোপনে মেয়েদের গোসল ভিডিও করছে, আবার বলা হলো তার নিজেরই ভিডিও আছে (সে নিজের গোসলের ভিডিও নিজেই কেমনে হলের অন্ধকার বাথরুমে করছেন সেটা অবশ্য বিবেচ্য নয়)।

যাই হোক, পত্রপত্রিকায় রিপোর্ট হলো। সেই মেয়ের নাম, ধাম, ডিপার্টমেন্ট সব ছাপা হলো সেসময়ের জনপ্রিয় এক সাপ্তাহিক পত্রিকায়। যে মেয়েকে অভিযুক্ত করে নাম-ধাম ছাপা হলো তার সাথে কোন কথাবার্তা বলা হয়নি, যেটা সাংবাদিকতার খুব সাধারণ এথিকস বা নিয়ম। তো, সেই ছাত্রী পত্রিকা অফিসে প্রতিবাদপত্র নিয়ে গেলে পরের সপ্তাহে এককোণা দিয়ে সেই প্রতিবাদের একফোঁটা অংশ ছাপা হলো। পত্রিকার তরুণ সম্পাদক মেয়েটাকে বলেছিল, বিষয়টা দেখা হবে। কিন্তু ততদিনে মেয়েটার গায়ে গোসলের ভিডিও’র মিথ্যা টিপছাপ লেগে গেছে।

সেই তরুণ সম্পাদক এখন পাকা হয়েছেন। তো, বনানীর এই ঘটনার পর আমি সেই সম্পাদককে দেখলাম, অবক্ষয় নিয়ে বিরাট এক লেখা লিখেছেন। ধর্ষণ হচ্ছে পুরুষের অবক্ষয় এর কারণে সেইটা তিনি বলেছেন লেখায় বিরাট আবেগ-টাবেগ দিয়ে। কোয়েশ্চেন ইজ, কখন কোথা থেকে ধর্ষণের মতো বিষয়গুলো সেলেবল বা বিক্রয়যোগ্য পণ্য হলো, বিকৃত বিনোদন থেকে উচ্চশিক্ষিত ভদ্রলোকদের বিনোদন হলো, ট্যাবলয়েড থেকে সিরিয়াস পত্রিকার কাটতি বাড়ালো, আর কারা এর জন্য দায়ী, কারা নয় সেই বিভেদ রেখাটা কি ধীরে ধীরে কমে এলো না?

দায় প্রগতিশীল-অপ্রগতিশীল সকলেরই। সবচেয়ে বড় দায় পুরুষের নিজের। আপনারা এইবার এই ধর্ষক লেবেল গা থেকে সরাতে কাজ করুন। আপনারা এখন আন্দোলন করুন, আপনারা ধর্ষণের বিচার চান, ধর্ষণ হয় মেয়েদের দোষে- এই কথা যেসব পুরুষ বলে, তাদের রুখে দেন, চিৎকার করে বলেন, আপনারা শুভবোধসম্পন্ন মানুষ, শুধু পুরুষ নন।     

লেখাটি ১,৯৩১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.