ধর্ষকদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি চাই

0

শাহানা সাঈদ:

একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলেছে। আজ তনু তো আরেকদিন আরেকজন। বিরামহীনভাবে চলছে। সংবাদের শিরোনাম হচ্ছে। অস্থির লাগে এসব সংবাদ পড়লে। কোনো কিছুই আর স্বাভাবিক মনে হয় না। নিজের ঘরে মেয়ে আছে। বড় হয়ে উঠছে। তাই চিন্তাগুলো আরো বেশি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তাদের জন্য নিরাপদ পৃথিবী রেখে যেতে পারবো কিনা তার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আর কতভাবে সচেতন করবো তাকে।

জীবন ও জীবিকার জন্য ঘরের বাইরে যেতেই হচ্ছে নারীদের। কখনো বন্ধুর দ্বারা, কখনো কর্মক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন দ্বারা একজন নারী নিগৃহীত হচ্ছে। ঘরে বাইরে সবখানেই। কিছু প্রকাশিত হচ্ছে আর কত ঘটনা যে অপ্রকাশিতই থেকে যাচ্ছে। যেটুকু জানা যাচ্ছে তাতেই নার্ভ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, মানসিক ক্ষরণ হচ্ছে। সারাক্ষণ যদি নিরাপত্তা নিয়ে এতোই শঙ্কিত থাকতে হয় তাহলে আর কাজে মনোযোগ থাকবে কোথা থেকে?

সাম্প্রতিক ধর্ষণের শিকার হওয়া বোন দুটোকে থানায় গিয়ে এজাহার তথা মামলা দায়েরের জন্য আমি সাধুবাদ জানাই। তারা জীবিত ফেরত আসতে পেরেছেন। তার চেয়েও খারাপ কিছু ঘটতে পারতো। ধর্ষকদের পরিচয় ফাঁস করে দিবে আশঙ্কায় মেরে ফেলতে পারতো। এ ধরনের ঘটনায় সাধারণত: ভুক্তভোগীকে মেরে ফেলা হয় । তারা সাহস করে থানায় এসেছেন। বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেছেন। কারণ একজন ভুক্তভোগী নারীর জন্য থানার পরিবেশ সবসময় নারীবান্ধব নয়, সংবেদনশীল নয় সব কর্মকর্তারা।

পত্রিকার সংবাদে জানতে পারলাম যে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধিত) ২০০৩ এর ধারা:২২ এর অধীনে  ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে জবানবন্দিও রেকর্ড হয়েছে। এরপর আদালতের নির্দেশে ভিকটিমদের ডাক্তারী পরীক্ষা করার জ্ন্য সরকারী মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যাওয়া হবে। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ভিকটিম ও তার পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটা জরুরী। প্রলোভন ও অযাচিত চাপ থাকে এসব আপোষে মিটিয়ে ফেলার। এখন কিছুটা আশাবাদী হই যখন দেখি পত্রিকাগুলো ধর্ষকদের ছবি, পরিচয় প্রকাশ করছে । এটাও দীর্ঘদিনের নারী আন্দোলনের প্রাপ্তি।

আমরা যতই নারীদের সচেতন করি ধর্ষণের ঘটনা ঘটার ২৪ ঘন্টার মধ্যে অভিযোগ দায়ের করার যাতে আলামতগুলো নষ্ট না হয় তা কিন্তু সহজ নয় বাস্তবায়ন করার। কঠিন বাস্তবতা হলো এ ব্যাপারে সেই মানসিক শক্তি, সাহস তথা পরিবারের লোকদের সমর্থন পাওয়া খুবই কষ্টকর। অনেক মানসিক শক্তি সঞ্চয় করে তবেই না এতদূর আসতে হয়।

কাজেই ৩৭ দিন পর এজাহার দায়ের করা হয়েছে বলে আলামত নষ্ট গেছে এটি ভাববার কোনো কারণ নেই। ডাক্তারী পরীক্ষায় আলামত সংরক্ষণের পাশাপাশি পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য (Circumstantial Evidence) এ ধরণের মামলার ক্ষেত্রে মূখ্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। এটি একটি অ-আপোষযোগ্য অপরাধ।

একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। ১৯৯৭/৯৮ সালের ঘটনা । তখন বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘে কাজ করি। ঢাকার অদূরে ত্রিমোহিনী গ্রামে একজন কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়ে সংস্থার কাছে আসে আইনী সহায়তা নিতে। সাথে তার মা আসেন। তাকে নিয়ে আমি আর আমার সহকর্মী সেলিনা পারভীন সবুজবাগ থানায় গেলাম। প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ আমাদেরকে সহ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে গেলেন। এলাকায় গাড়ীসমেত পুলিশকে দেখে স্থানীয় লোকজন জড়ো হয়ে গেলো। তারপর থানায় ফিরে এসে তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলাটি রেকর্ড করলেন। এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে হতে সেই মধ্যরাত। তখন পর্যন্ত ভিকটিম ও তার মাসহ আমরা দুজন থানাতেই অবস্থান করেছিলাম। মধ্যরাতে পুলিশের গাড়ীতে সহকর্মীর বাসায় পৌঁছলাম।

পুলিশের পিকআপ ভ্যানে  যখন যাচ্ছিলাম নিজেদের মধ্যেও একধরনের ভীতি কাজ করছিলো। যদি আমাদের আবার কিছু হয়। গাড়ীর একদম ভিতরের দিকে না বসে সাইডে বসেছিলাম। যাতে নিজেকে বাঁচানোর জন্য চলন্ত গাড়ী থেকেও লাফ দিতে পারি। তখন ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি বেশ আলোচিত ছিলো। তাই নিজেদের ভিতরও অনেক আতঙ্ক কাজ করতো। কাউকে বিশ্বাস করাটা দুষ্কর ছিলো। পরদিন সকালে ভিকটিমকে থানা থেকে নিম্ন আদালতে ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে। তাই সকাল সকাল আবার দুজন থানায় চলে এলাম। কিন্তু দেখলাম আসামীদের যে গাড়িতে করে থানায় নিয়ে যাওয়া হবে সেই গাড়িতে ভিকটিমকে ওঠানো হলো থানায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমরাও ওদের অনুসরণ করে আলাদা গেলাম নিম্ন আদালতে। আদালতে পৌঁছে জানতে পারলাম ভিকটিমের পরিবার মামলা চালিয়ে যেতে রাজী নয়। সমাজে থাকতে হবে। মেয়েকে বিয়ে দেয়া কষ্টকর হবে এসমস্ত সামাজিক কারণে। তাকে বুঝানো হলো। তাতে তেমন কাজ হলো না। বাস্তবতা এটাই।

এরপরও ঐ সংস্থায় যতদিন কাজ করেছি এসব নির্যাতিত নারীদের জন্য সংস্থার সহযোগিতায় নিজের অবস্থান থেকে কাজ করার চেষ্টা করেছি। এসব ষ্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে কাজ করতে গেলে ট্রমার মধ্য দিয়ে যেতে হয় । স্বাভাবিক থাকা যায় না।

তৃষা, রিশা, রুমি, তনু যাদের ঘটনাই পড়েছি বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠেছে। তারপর কে? নৈতিকতার এতো অবক্ষয় ঘটেছে।

প্রতিটি ঘরে প্রতিটি  শিশু, কিশোরী ও নারী নিরাপদ থাকুক। পুরুষ ভাইয়েরা যারা মেয়ের অভিভাবক হয়েছেন তারাও এদের পাশে দাঁড়ান। নারীর পোশাক, অসময়ে তার ঘরের বাইরে যাওয়া, এসবকে দায়ী না করে ধর্ষকদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন, তাদের  শাস্তি দাবী করেন।

আসুন, ধর্ষকদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করি।

আইনজীবী ও উন্নয়নকর্মী

১২.০৫.২০১৭

লেখাটি ৬৩৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.