ধর্ষণের দায় আসলে কার?

0

ফেরদৌস আরা রুমী:

একজন ধর্ষক তো দিনে রাতে সবসময়ই ধর্ষক। তাইতো? নাকি অন্যকিছু্? তার জন্য আবার রাত দিন আছে নাকি? পরিচিত-অপিরিচিত, বন্ধু- অবন্ধু এমন কোনো ফারাক আছে নাকি? সে তো সারাক্ষণ সুযোগ খুঁজতে থাকে কখন তার কুৎসিত যৌনলিপ্সা চরিতার্থ করবে। এরা সারাক্ষণ আমাদের চোখের সামনেই ঘুরে বেড়ায় মোক্ষণ সুযোগের জন্য।

সুতরাং যারা বলছেন, ‘এতো রাতে একজন বন্ধুর পাঠানো গাড়িতে যে মেয়েরা চলে আসে তারা আসলে কেমন মেয়ে? তাদের যথাযথ শাস্তিই হয়েছে।’ এই কথা যারা বলেন তারা বস্তুত বিশ্বাস করেন, ‘ধর্ষণের দায় সম্পূর্ণরূপে মেয়েদের এবং ভালো মেয়েরা এতো রাতে বাড়ির বাইরে যায় না, ধর্ষিতও হয় না।’

তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেই রাতে বাইরে যাওয়া দোষের, তাহলে দিনে কোনো ধর্ষণের ঘটনা নেই? অথবা পার্টি বা হোটেল ছাড়া কোনো মেয়ে রাস্তা-ঘাটে, ঝোঁপের আড়ালে নিয়ে গিয়ে ধর্ষিত হয়নি বা হচ্ছে না? তনুকে যেন কোথায় ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছিল? তনুর গায়ে যেন কেমন পোশাক ছিল? সে কি পার্টিতে বা হোটেলে গিয়েছিল কোনো বন্ধুর সাথে?

যারা এই প্রশ্নগুলো মেয়েদের দিকে ছুঁড়ে দেন তারা আসলে ধর্ষকের পক্ষেই কথা বলেন। তারা কোন না কোনভাবে মেয়েদের ওপর নিয়ন্ত্রণের কথাই বলেন। মিন মিন করে ধর্ষকের শাস্তি চাইলেও ঘুরে ফিরে ‘যদি-কিন্তু’ দিয়ে ঐটাই বুঝানোর চেষ্টা করেন, অতো রাতে বাইরে কেন? যার তার সাথে মেলামেশা করলে তো এমনই হবে? মেয়েগুলার আসলে চরিত্র ভালো না।

যা সাম্প্রতিক ঘটনায় বার বার বলার চেষ্টা করছেন। এসব মেয়েদের পরিবারও এমন, সারারাত বাইরে থাকলো কেউ কোনো খবর নিলো না? টাকা –পয়সার লোভেই আসলে তারা বড়লোকের ছেলেদের সাথে সম্পর্ক করে ইত্যাদি ইত্যাদি।

এবার আসেন আসল কথায়। একজন মেয়ে দেখতে অপ্সরা, আাঁটোসাটো পোশাক পরেন, তার দেহের বাঁকগুলো সুন্দরভোবে ফুটে ওঠে কিংবা তিনি খুব খোলামেলাভাবে ছেলেদের সাথে মেলামেশা করেন, গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা দেন; আরো আপনাদের ভাষায় যেটা খারাপ সেটা যদি বলি-তিনি মদ –গাঁজা খান, ছেলে বন্ধুর সাথে (উভয়ের সম্মতিতে) বিবাহ বর্হিভূত যৌন সম্পর্কও গড়েন। তার মানে কিন্তু এই নয় যে, আপনি তার সাথে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক তৈরি করবেন। অথবা আপনার সাথে যৌন সম্পর্ক তৈরির জন্য বসে অাছেন।

একইসাথে একজন যৌন কর্মীও যদি সম্মতি না দেন তাহলেও তার সাথে কোন যৌন সম্পর্ক নয়। এছাড়া যদি এমনও হয় যে- আপনার সাথে যৌন সম্পর্কে সম্মতি দেওয়ার পর যদি তার মনে হয় তাকে অাপনি ধর্ষণ করেছেন সেটাও ধর্ষণই হবে। একজন যৌন কর্মীর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য হবে।

মোদ্দা কথাটি হলো সম্মতির। সম্মতি না থাকলে বাকি যা কিছু বলে ধর্ষণ বা ধর্ষকের পক্ষে কথা বলার চেষ্টা করেন না কেন তাতে অাপনার ধর্ষক বা ধর্ষণের পক্ষের রূপটিই ফুটে ওঠে। পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে বিচরণ করে নারীর ওপর সমস্ত কর্তৃত্ব আপনার এই মনোভাব পোষণ করে মিন মিন করে ধর্ষকের বিচার চাওয়া যায় না। সুতরাং মনোভাব পাল্টান। যত দিন পর্যন্ত মেয়েদের দোষারোপ করবেন, মেয়েদের চরাফেরা নিয়ন্ত্রণ করবেন, পর্দা-হিজাব দিয়ে ধর্ষকের চোখের আড়াল করেছেন বলে খুব তৃপ্ত থাকবেন ততদিন এদেশে ধর্ষণ কমবে না।

ধর্ষকের কুৎসিত যৌন লিপ্সার কারণ নারীকে ভোগের বস্তুু মনে করা, তার ওপর আপনার অবাধ কর্তৃত্বের মানসিকতা। এই মানসিকতা বলবৎ রেখে মেয়েদের ধর্ষণ বা নির্যতনের হাত থেকে বাঁচাতে পারবেন না। মনে রাখবেন তনু বাঁচেনি কিন্তু সমস্ত রূপে নিজেকে অবগুন্ঠিত রেখেও। সেদিনের ঘটনা! অতীতের আরো কত ঘটনাতো আছেই। তিন বছরের কন্যা শিশু থেকে শুরু করে বিধবা, প্রৌঢ়া কেউেই বাঁচেনি। ভুরি ভুরি ঘটনা আছে এমন।

সুতরাং, ধর্ষণের জন্য দায়ি একমাত্র ধর্ষকই। এর কোন দ্বিতীয় অনুষঙ্গ নেই। আর এদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয় পুরুষতন্ত্র। নারীর ওপর পুরুষের কর্তৃত্ব। এর উৎস মূলগুলোকে আগে চিহ্নিত করুন। ভোগের বস্তু হিসেবে দেখার মানসিকতা পাল্টান। ধর্ষককে চিহ্নিত করে উপযুক্ত শাস্তি দিন। মনে রাখবেন অাপনার ধর্ষিতাকে দোষারোপ করার মানসিকতা ধর্ষকের পক্ষেই আপনার অবস্থানকে চিহ্নিত করে। 

ফেরদৌস আরা রুমী, মানবাধিকার কর্মী

লেখাটি ১,৫৮৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.