মেয়েদের বলছি, ধর্ষণের প্রমাণগুলো নিজের হাতে রাখো

0

কাকলী তালুকদার:

চুলের ফ্যাশন, মেকআপ বক্স আর গহনা শাড়ীর চিন্তা থেকে সরে আসো, নিজেকে এই কঠিন পৃথিবীর জন্য একটু শক্ত করে তুলে ধরো মেয়ে। ধর্ষণ শেষে তোমার শরীর নিয়ে আরেক দফা ঘষামাজা শুরু হয়! সত্যিই তোমার ভিতরে কোনো দানবের প্রবেশ ঘটেছে কিনা জানার জন্য!

তা যে শরীরে তোমার নির্যাতন, সেই শরীর দিয়েই তোমাকে আবার প্রমাণ করতে হবে। ভিডিও হবে তোমাকে আবার ব্ল্যাকমেইল করতে, তবুও আইন প্রমাণ খুঁজে পাবে না। কারণ পুরুষ কচু পাতার মতো পানি ঝেড়ে ফেলে শুদ্ধ হয়ে যায়। তা আমি বলি কী মেয়ে, একটু লাথি, ঘুষি, ছুরি, কাঁচি এইগুলো একটু চিনতে শিখো এখন। অনেকদিন তো বয়ে গেলো, নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে আত্মরক্ষা তো একটু শিখতে হবে। অন্ততঃ ধর্ষণ প্রমাণের জন্য পুরুষের লিঙ্গ কেটে দেয়ার ইচ্ছেটা নিজের মধ্যে তৈরি করো।

তবে অন্তত এই সকল অাবর্জনাসম থানা-পুলিশের কাছে তোমাকে আগ বাড়িয়ে দ্বারস্থ হতে হবে না। সম্ভব হলে সেই অঙ্গ কেটে নিজের কাছে রেখে দাও। তখন তাদের প্রয়োজনে সাক্ষ্য প্রমাণ জোগাড় করতে তারাই তোমার কাছে আসবে। কান টানলে মাথা আসার মতো আর কী! মেয়ে শোনো, বাস্তবতা হচ্ছে জন্ম হলে বেঁচে থাকতে হবে। তুমি যদি তোমার সম্মান, আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে চাও, তবে নিজের মধ্যে শক্তি সঞ্চয় করার বিকল্প নেই। যে সমাজ তোমাকে ভ্রুণ থেকে মৃত্য অবধি বৈষম্যের মধ্যে রাখতে পছন্দ করে, সেই সমাজ তোমার বন্ধু না। তাই দৃষ্টিটা আমাদের নিজেদেরকেই পরিবর্তন করতে হবে।

আজকে আমরা যারা মা হয়েছি, সন্তানের ক্ষেত্রে মেয়েকে নরম কোমল করে বড় করার মানসিকতায় আছি, তাদের চিন্তায় বড় পরিবর্তন আনতে হবে। আমাদের মেয়ে এবং ছেলে সন্তান দুজনকেই দায়িত্বশীল, বাস্তবমুখী করে মানসিক গঠনটুকু তৈরি করে দিতে হবে। ছেলে সন্তান বলে তোমার বেশী সুযোগ, আর মেয়ে সন্তান বলে কম সুযোগ বা তুলু তুলু ভাব দূর করতে হবে।

মেয়েকে মেকআপ, পারলার, গয়না, শাড়ি চুড়ি না চিনালে তাদের জীবন অসুন্দর হবে না। তার চেয়ে আপনার হাই প্রেশারের ওষুধের উপর চাপ কমাতে মেয়েকে ছোটবেলা থেকেই, খেলাধুলা, কারাতে শিখিয়ে জীবনযুদ্ধটা শিখিয়ে স্বাবলম্বী করে তোলার দিকে বেশি মনোযোগ দেন। সর্বত্র নিজেরা উপস্থিত থেকে মেয়ে সন্তানের ওপর ঘটে যাওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে পিতা-মাতাকেই শিখাতে হবে।

একবার, দুইবার, তিনবার, মেয়ে একদিন শিখে যাবে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়া। শিক্ষা অর্জন শেষে নিজের পায়ে দাঁড়ালে কারোর দ্বারস্থ হতে হবে না মেয়েকে। যৌতুকের জন্য আপনার মেয়েকে পুড়ে মরতে হবে না। অন্ততঃ পিতা-মাতার অবর্তমানে সে নিজেই নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবে এই কঠিন পৃথিবীতে। আর যে সম্পদ আপনি সন্তানের নিরাপত্তার জন্য রাখছেন, তা সন্তানদের মধ্যে সমভাবে দেয়ার চেষ্টা করুন। তাতে অন্ততঃ ঘরে আপনার ছেলে সন্তান মেয়ে সন্তান চিন্তা করতে শিখবে সমতার শিক্ষাটুকু।

আপনার ছেলে সন্তানটিকে পরিবারের প্রতিটি অনুভূতির সাথে পরিচয় করিয়ে গড়ে তুলুন। নারী-পুরুষের প্রাকৃতিকভাবে ভিন্ন বৈশিষ্ট্য ছাড়া ছেলে-মেয়েতে যে কোনো তফাৎ নেই সেই শিক্ষাটুকু ঘর থেকে যদি আমরা শুরু না করি, সমাজের আকাশসম বৈষম্য দূর করতে পারবো না কখনোই। একটি পরিবার থেকে একজন যোগ্য নেতৃত্ব একদিন রাষ্ট্রের কর্ণধার হয়।

তাই পরিবারের শিক্ষাটুকু আজীবন ব্যক্তি তার কর্মজীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করে। যে সকল পিতা শুধুমাত্র পুরুষ হিসেবে সন্তানদের সামনে বা অগোচরে স্ত্রীদের সাথে খারাপ ব্যবহার করেন, জোর করেন, চাপিয়ে দেন তাদের বলছি, আপনি হয়তো ভাবছেন আপনার সন্তান আপনার কথা শোনে না, কিন্তু তারা আপনাকে গভীরভাবে দেখছে এবং শিখছে। যা সে সময়মতো তার পরিবেশে প্রয়োগ করছে পরবর্তীতে।

তাই পরিবার জীবনকে সুন্দর রাখতে মা-বাবার চিন্তা, আচরণের পরিধির বিস্তৃতি করতে হবে অবশ্য। ছোট ছোট পরিবার মিলে আমাদের একটি পাড়া, সমাজ গড়ে গঠে, আর সমাজ থেকেই রাষ্ট্র তারপর একটি দেশ। পারস্পরিক শ্ৰদ্ধাবোধটুকু রেখে আমাদের দাম্পত্য জীবন শুরু করতে হবে। পরিবার আমাদের শান্তির জায়গা, দিন শেষে সবাই একটি সুন্দর, ভালোবাসা, যত্ন দিয়ে সাজানো নিরাপদ আশ্রয় চায় আর সেটিই আমাদের পরিবার।

যে ছেলেটি আজ ধর্ষণ করছে, আর যে মেয়েটি ধর্ষিত হচ্ছে, দুজনেই দিন শেষে ঘরে ফিরে আসে। কিন্তু আমাদের প্রতিনিয়ত বৈষম্য ভাবনা দুজনকে দুই অনুভূতি নিয়ে ঘরে ফিরতে সাহায্য করছে। মেয়েটি কখনও আত্মাহুতি দিচ্ছে, সেখানেও মেয়েটির জীবন দুর্বিষহ। চাদরে ঢেকে মেয়েদের সতীত্বপনা শিখাচ্ছে পুরুষতন্ত্র। আবার সেই নারীকে দিয়ে পতিতালয় বানিয়ে বেশ্যা নামে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে তারাই। পুরুষতন্ত্র এতোটাই ভয়ানক এইডসের মতো নারীকে বেশ্যার তকমা লাগিয়ে দিচ্ছে তাদের ছোঁয়ার মাধ্যমে।

তারা নির্ধারণ করছে, নারী পর্দা করবে, আবার পর্দা সরিয়ে তারাই ধর্ষণ করছে নারীকে, সাথে তাদের পুরুষতন্ত্রের জীবাণু ‘নষ্টা’ শব্দ তকমা দিয়ে দিচ্ছে নারীকে। দিনকে দিন হিংস্র পশুদের অভয়ারণ্যে মেয়েদের চলতে হচ্ছে। নিয়ন্ত্রণহীন পশুর মতো পুরুষ হামলে পড়ছে নারীর উপর সেখানে আট মাসের শিশু থেকে ৬০ বছরের বৃদ্ধা রেহাই পাচ্ছে না। পরিবার,ধর্ম, আইন কোথাও আজ মেয়েদের নিরাপত্তা নেই।

তাই মেয়েদের বলছি, মায়েদের বলছি এতোদিন ধরে তো যত্ন দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে পরিবার আগলে রাখলে, আজ নিজের প্রয়োজনে যখন বাইরে যাচ্ছো, নিরাপদে ফিরতে পারছো না ঘরে। এবার একটু ভাঙতে শিখো, কাটতে শিখো। নিজের শরীর দিয়ে ধর্ষণ প্রমাণ করতে যেন যেতে না হয়। ধর্ষণের চেষ্টার প্রমাণ নিজের হাতে কেটে রেখে দাও। দুনিয়ায় সর্বত্র নরম কোমলতার দরকার নেই। মাঝে মাঝে ঘূর্ণিঝড় হয়ে ধ্বংস করতে শিখো। নতুন করে সৃষ্টির জন্য কখনও কখনও ভাঙতে হয় বটে।

১১ মে ২০১৭ কানাডা

লেখাটি ৮,৩৯৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.