মুছে ফেল তোর চোখের জল…

0

সঙ্গীতা ইয়াসমিন:

আমরা ভুলে যাইনি বাঁধনের কথা, রাতের আঁধারে নির্মল আনন্দ করতে এসে যার সব খোয়া গিয়েছিল (অনেকের ভাষায়) এবং তার শ্লীলতাহানীর দায় নিজেকেই নিতে হয়েছিল। বাঁধন থেকে আজকের নিপুণ-নিশান (বনানীর ঘটনার ছদ্মনাম) সময় গড়িয়েছে অনেক, বদলেছে নারীর শ্লিলতাহানীর কৌশল। বদলায়নি আইনী কাঠামো, বদলায়নি আমাদের সমাজ মানস। আজও নারীকেই প্রমাণ করতে হয় যে সে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আদালতে তাকেই হাজারো প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হয় কেনো সে গিয়েছিল, তার নিজেরও সায় ছিল কিনা সে ঘটনায়।

আমাদের সমাজ আজও নারীর অবাধ চলাচলকেই অপরাধ মনে করে। নারীর পোশাককেই ধর্ষণের জন্য দায়ী করে আজও আমাদের শিক্ষিত সমাজগত কয়েক দশকে আমাদের উন্নয়ন হয়েছে ঢেরদেশ মধ্য আয়ের কোঠায় পা রেখেছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে পাল্লা দিয়ে আমাদের নৈতিক, সামাজিক ও মানবিক প্রবৃদ্ধির যে চরম বিপর্যয় ঘটেছে সে হিসেব রাখার কোনো ফুরসৎ নেই আমাদের সরকারের।   

প্রকৃতপক্ষে, আমাদের সমাজে নারীকে মানুষ না ভাবার, নারীকে দুর্বল ভাবার, অধস্তন ভাবার যে চর্চা তা-ই নারীর প্রতি অবজ্ঞা আর অনাচারকে উৎসাহিত করেসমাজই শিখিয়েছে নারীকে পুরুষের অধস্তন হয়ে থাকতে।এতে একচেটিয়া পুরুষেরই সুবিধে; সে কারণে নারীর বেড়ে ওঠায়, চিন্তায়, জীবনযাপনের পদ্ধতিতে তথা নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সমাজের আরোপিত বহুবিধ বিধি-নিষেধ প্রচলিত আছে সেই বহুকাল থেকেই, যা বহুল চর্চার ফলে পেয়েছে অধিক স্থায়ীত্ব ও বৈধ প্রাতিষ্ঠানিকতা।

এ ক্ষেত্রে, খুবই সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া অনেক উচ্চবিত্ত, শিক্ষিত পরিবারসমূহেও নারী স্বাধীনতার চর্চা একইরকম লক্ষ্যণীয়।ছেলেটির উচ্চশিক্ষা, প্রতিষ্ঠা, স্বাধীনতা কিংবা স্বেচ্ছাচারিতাকে যতটা প্রশয় দেয় পরিবার মেয়েটির বেলায় ঠিক ততটাই সীমানা নির্ধারিত থাকে, লিখিত বিধানের মতআর আমরা, মেয়েরাও যেনো সেই গণ্ডীর মধ্যে উড়তে, ডানা ঝাপ্টে, মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতে ভালোবাসি। ভালোবাসি চোখের জলে নিজের ওপরে হওয়া অন্যায়-অবিচারের গ্লানিকে নিজের দায়ভার হিসেবে মেনে নিতে।

আমরা যেনো অন্যের কৃত অপরাধের কারণ হিসেবে নিজেকেই দাঁড় করাই নিজেরই কাঠগড়ায়। আর তাতেই যেনো মুক্তি আমাদের। কিন্তু প্রকৃত অর্থে এতে মুক্তি মেলে কি? হিজাবের আড়ালেও, চারদেয়ালের মধ্যেও, মৌন নীরবতার আবডালেও প্রতি মুহূর্তে ঘটছে নারীর ওপর নিপীড়ন-ধর্ষণ-হত্যাসহ নানবিধ অন্যায়-অত্যাচার। কে নেবে এর দায়? এর দায় আমাদের রাষ্ট্র-প্রশাসন-সমাজ কেউই নেবে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবারও নেবে না ইতোমধ্যে আমরা জেনেছি সেসবনারীর নিজেকেই এই দায়ভার নিয়ে পথ চলতে হবে। কী হবে সেই পথের রূপরেখা? সেকি কেবলই চোখের জল? সেকি কেবলই দুঃখের অনল?

আমরা দেখেছি, আমাদের সমাজে নারীর চিন্তার জগতের মত করে শরীরেও আছে পুরুষের অবাধ অধিকার। এক্ষেত্রে বৈধতা-অবৈধতা ন্যায্যতা-অন্যায্যতার কোনো প্রশ্ন নেই। অলিখিত নিয়ম যেনো এটি। সে নারী বিবাহিতা স্ত্রী, প্রেমিকা, বান্ধবী আর পরিচিত যে ই হোক না কেনো সকলের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। আর সেকারণেই আমাদের সামাজিক দৃষ্টিকোণে ধর্ষণ খুবই মামুলী বিষয়

গোটা সমাজের মানসলোকে নারী একতাল মাংসপিণ্ড বৈ কিছুই নয়। সমাজের লালসার জিভ এই মাংসপিণ্ডুকে দলে, পিষে, ছিবড়ে খেয়ে ছিঁড়ে ফেলার জন্য দশহাত আগ বাড়িয়ে উচিয়ে থাকে। মাংসাশী বুভুক্ষ জন্তু জানোয়ারের মত ওঁত পেতে থাকে সুযোগের অপেক্ষায়। কেউ বন্ধুর ছলে, কেউ ক্ষমতার প্রভাবে, কেউ চাকরিদাতা হয়ে কতভাবেই না নারীর সম্ভ্রম নিয়ে খেলা চলছে প্রতিনিয়তপ্রকাশিত খবরের বাইরের পৃথিবীটাও আমাদের অচেনা নয়, যখন আমি নিজেই নারী! একইভাবে কেবল আমার মেয়েরা, বোনেরা কিংবা আমরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছি না এই সমাজে। আমাদের প্রশাসন, আইনীকাঠামো, তথা আমাদের বিচারব্যবস্থাও ধর্ষিত হচ্ছে এই নপুংশক ক্ষমতাতন্ত্রের স্বার্থন্বেষী কামুক দণ্ডের দ্বারা।

সুতরাং, এই পৌরুষহীন শাসনতন্ত্র যা দূর্বলের ওপর অত্যাচার করে, যা রাতের অন্ধকারে নারীর শারীরিক অক্ষমতার সুযোগ নিয়ে নিজের কামবাসনার উত্থান রোহিত করে এমন নপুংশক পুরুষতন্ত্রের সাজানো এই সমাজে কীসের বিচার চাইবে মেয়ে তুমি? এর থেকে তুমি তোমার লজ্জার আভরণ খুলে ফেলে দাও। তোমার ওপর কারো বলাৎকারের দায়ে তুমি লজ্জা পাবে কেন? বুক ফুলিয়ে চল মেয়ে।

ধর্ষণের বীজে যদি কোন ফসল ফলে, তাকে পৃথিবীর আলোতে আনো, সমাজকে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দাও এটা তোমার ওপরে কৃত অত্যাচারের ফসল। যে সমাজ অন্যায়ের বিচার করতে জানে না অন্যায়ের ফসলকে ‘জারজ’ বলে অভিহিত করে সেই সমাজের মুখে থু থু দিতে শেখ। প্রকৃতির দান যে শরীর তোমার তাকে নিয়ে লজ্জা নয়, গৌরব কর মেয়ে। তুমি শারীরিক সক্ষমতা অর্জন কর, মাথা তুলে শিরদাঁরা সোজা করে দাঁড়াও মেয়ে। দেখবে পুরুষতন্ত্রের উত্থিত দণ্ড তোমার দিকে বুভুক্ষ লালা ফেলবে না আর। তোমাকে দেখে ডড়াবে এবার!

একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, নারীর শ্লীলতাহানী, ধর্ষণ, হত্যা, ও নারী নির্যাতনের প্রতিকার চেয়ে, রাস্তায় মিছিল মিটিং করে কিংবা বিচারের আশায় করূণা ভিক্ষা করে এসব বন্ধ করা সম্ভব নয়। আর এহেনো জঘণ্য কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত অপরাধীরা যখন ক্ষমতার আর অর্থের রাজত্ব করে তখন এ বিষয়ে বলাই বাহুল্য। আমরা দু’কথা লিখে মনের ক্ষোভ মেটাই, খানিকটা কুম্ভিরাশ্রু বিসর্জন করি, কিংবা ফেজবুকে ঝড় তুলি। তারপরে আবার গা ভাসাই অন্য কোনো স্রোতে। অপেক্ষায় থাকি আবারও কোনো শ্লীলতাহানী, ধর্ষণ, লুণ্ঠনের খবর কিংবা অন্য কোনো আনন্দ উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠারকিন্তু এসবের শেষ কোথায়? আমরা আসলে কী চাই সেটা আমাদেরকেই ঠিক করতে হবে।

তনুকে নিয়ে লিখেছিলাম। আরও অনেকেই লিখেছিল, রাস্তায় নেমেছিল বাংলাদেশের জনগণ। কিন্তু আমাদের প্রশাসন আর বিচার ব্যবস্থার চরম ঔদাসীন্য, দুর্নীতিগ্রস্ততা আর স্বার্থান্বেষী চরিত্রের ওপর থেকে আমি কখনোই আস্থা হারাইনি। আমি জানতাম, তনু ন্যায় বিচার পাবে না। শেষতক, পচা-গলা তনুর দেহ দ্বিতীয়বার কাটাছেঁড়া করিয়া ইহাই প্রমাণীত হইল যে তনু ধর্ষণের শিকার হয় নাই। সুতরাং আজ নতুন করে আর আমি ধর্ষণের বিচার চাই না। চাই না এর কারণ বিশ্লেষণ করতে। আমার দাবী মেয়ে তোমার নিজের কাছে।

অতএব, “মুছে ফেল চোখের জল তুই কাঁদিস না, চোখের জলে বুকের ব্যথা আর বাড়াস না”নৈরাজ্যের রাজ্যে আইনের সাহায্য চেয়ে নিজেকে করুণার পাত্র হতে দিও না। নিজের আনন্দ করবার অধিকারকে গলা টিপে হত্যা কর না, আত্মগ্লানিতে না ডুবে আনন্দ কর। তোমার স্বাধিকারের লড়াইটা তোমাকেই লড়তে হবে আজ। প্রাকৃতিক একইরকম জৈবিক প্রক্রিয়ায় নারী-পুরুষের কামবাসনা তৈরি হলেও প্রকৃত সত্য হল নারীর জৈবিক চাহিদা তথা কামবাসনা পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি। যদিও আমাদের পুরুষতন্ত্র এটা মানতে নারাজ!

পুরুষের লোমশ, চওড়া বলিষ্ঠ বুকের ছাতি দেখলে নারীও সমানভাবে রোমাঞ্চিত হয়, মনের অতলে পাওয়ার ইচ্ছা জাগে বৈকি!এই প্রাকৃতিক, অতি স্বাভাবিক জৈবিক চাহিদাকে ধারণ করেও কি  আশ্চর্যজনকভাবে নিজেকে সংযম করতে জানো তুমি মেয়ে। আজতক নিজের কামবাসনা তৃপ্ত করার লক্ষ্যে কোনো ছেলের ওপরই ঝাঁপিয়ে পড়েনি কোনো মেয়েসেই বিচারে মেয়ে তুমি মোটেই দুর্বল নও, তুমি শ্রেষ্ঠতুমি ওই নপুংশক পুরুষের উত্থিত দণ্ডের কাছে অধিক শক্তিশালী। মনের বিরুদ্ধে জবরদস্তির নামে অন্যের অধিকার হরণকে তুমি ঘৃণা করতে জানো। তবে তোমার কীসের লজ্জা? কীসের ভয় আর গ্লানি? দ্বিধা সংকোচ ঝেড়ে ফেলে উঠে দাঁড়াও এবারতোমার শুধু দরকার আঘাতের প্রত্যাঘাত করতে শেখা। তোমার দরকার শারীরিক শক্তি অর্জন। তুমি সেপথে এগোও মেয়ে।

আমাদের রক্ষণশীল মনন আর ধর্মীয় আব্রুর ভেতরে থাকা পরিবারগুলোতে আমরা শুধু মেয়ে শিশুটিকে কোমলমতি করে তুলতে চেয়েছি। তার শিক্ষা-দীক্ষার চেয়ে তার রূপের জৌলুস নিয়ে ভেবেছি। তার জীবনে প্রতিষ্ঠার চেয়ে তাকে সুপাত্রস্থ করায় অধিক মনোনিবেশ করেছি। এসব কর্মকাণ্ড পরোক্ষভাবে মেয়েটিকে তার আত্মমর্যাদাবোধ তৈরিতে, তার জীবনযাপন পদ্ধতির সঠিক নির্বাচনে বাঁধাগ্রস্ত করেছে। প্রকারান্তরে এসবই ভালোবাসার ছলে মেয়েদেরকে অবদমন করার সমাজের চিরচেনা কৌশল। আমরা কেবল মেয়েকে মাথা নত করে, শিরদাঁড়া বাঁকা করে, নিজের শরীরকে অবগুণ্ঠনে ঢেকে রেখে সমাজের লোলুপতার হাত থেকে বাঁচতে শিখিয়েছি। যেকোনোরূপ অন্যায় অবিচার আর অশ্লীল আক্রমণ থেকে মেয়েকে রক্ষা করার নামে তার হাতে পায়ে, চিন্তাশক্তিতে পরিয়েছি অজস্র শৃঙ্খল।

তাই পরিবারকে বলছি-পাশে থাকুন আপনার মেয়েটির, আপনার বোনটির। আসুন, মেয়েশিশুটিকে নিয়ে দু:শ্চিন্তা নয়, তাকে দাঁড় করিয়ে দিন পুরুষদণ্ডের প্রতিপক্ষ হিসেবে। তাকে তৈরি করুন জীবন যুদ্ধে সাহসীনির ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে। পড়াশুনার পাশাপাশি শারীরিক শক্তি অর্জনের প্রশিক্ষণ দিন। উৎসাহিত করুন শরীর চর্চা, ব্যয়াম আর খেলাধূলায়। তার শরীরকে নপুংশকের মজা লোপাটের খাবার তৈরির মানসিকতা থেকে মুক্তি দিন তাকে তাকে তৈরি করুন মানুষ হয়ে বাঁচার লড়াইয়ে জেতার জন্য।

তাকে মেয়ে হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠতে দিন। মিডিয়ারও দায় কম নয়। কেবল খবর পরিবেশনের দায়িত্ব  থেকে সরে আসতে হবে তাদের। সামগ্রিকভাবে ধর্ষককে দুর্বলরূপে, ঘৃণিতভাবে উপস্থাপন করাই তাদের ভূমিকা হওয়া উচিৎ। ধর্ষকের ছবি প্রকাশসহ সামাজিক ঘৃণা আর গণজাগরণের কাজটি মিডিয়াকেই করতে হবে।

আজ দিন বদলেছে, তাই মায়াকান্না না কেঁদে সময় এসেছে দিন পাল্টে দেবার। সময় এসেছে নিজের নিরাপত্তা নিজেই নিশ্চিত করার। মেয়ে, তুমি হয়ে ওঠো এক একটি জ্বলন্ত বিস্ফোরক! তোমাকে ছুঁলেই যেনো অগ্নি স্ফুলিঙ্গের মত ঝলসে দিতে পার ওই নপুংশকদের পুরুষদণ্ড। এমন শিক্ষা দাও ওদেরকে যাতে চিরতরে মনে রাখে যে না মানে না-ই। মনে রাখে জোর করে যে কেঁড়ে নেয় সে ই দুর্বল।

এমন শিক্ষা দাও যে যাতে জেনে যায়, তোমার কামবাসনা মেটানোর ক্ষমতা ওদের নেই। নিজেকে এভাবে দিক্ষীত কর যে, কেউ অন্যায়ভাবে শরীর ছুঁয়ে দিলে তোমার জাত যায় না মেয়েঅপর পক্ষের জোরের কাছে পরাজিত হয়ো না, বরং ফিরিয়ে দাও এক ঘুষির বদলে দশ ঘুষি। শিখে নাও পুরুষদণ্ডের উত্থান রোহিত করার ছলাকলা; নপুংশকের দণ্ড খুব বেশি দূর দৌড়াতে পারে না, যদি তুমি একবার জেগে উঠতে জানো। এবার তুমি জেগে ওঠো মেয়ে।

সঙ্গীতা ইয়াসমিন, লেখক, টরন্টো

লেখাটি ১,২১০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.