শোয়ার আগে তো বটেই, বসার আগেও ভাবো শতবার

0
তামান্না ইসলাম:
অমিতাভ বচ্চনের ‘পিঙ্ক’ মুভিটা দেখে মনে বড় আশা জেগেছিল, আসলে বলা উচিত ছিল দুরাশা। সেই দুরাশা আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সত্যি সত্যি একদিন মেয়েরা ‘না’ বললে আর কারো অধিকার থাকবে না তাকে স্পর্শ করার। আইন সেই স্পর্শকে বেআইনি কাজের আওতায় দেখবে, তার যথাযথ শাস্তি হবে। ‘পিঙ্ক’ মুভিটা আসলে আমাদেরকে কিছু গাঁজাখুরি স্বপ্নই দেখিয়েছে। নাহলে প্রায় হুবুহু একই দুরাচারের পুনরাবৃত্তি, একই ভাবে  শাস্তির গড়িমসি, এবং সমাজের সেই একই ছল চাতুরী আমাদের দেখতে হতো না। 
ধর্ষণ আসলে নতুন কোন দুর্ঘটনা নয়। পৃথিবীর সব কালে, সব দেশে এবং সমাজে এই অনাচার আছে। অনেক উন্নত দেশে এর হার আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। শিশু ধর্ষণ ও বিরল নয়। মানুষের সুপ্ত পশু প্রবৃত্তির জাজ্বল্যমান নিদর্শন এই ধর্ষণ। তবে, উন্নত দেশের সাথে আমাদের দেশের যে বিরাট পার্থক্য সেটা হোল আইনের শাসন। সেখানে ধর্ষণের কেস নিতে পুলিশ গড়িমসি করে না, ক্ষমতাবানের ছেলে বলে কেউ পারও পায় না।
আরেকটা বড় পার্থক্য হলো সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির। সভ্য দেশের মানুষ ধর্ষককেই ঘৃণার চোখে দেখে, ধর্ষিতাকে নয়। ধর্ষিতার আচরণ, পোশাক, চালচলন এই সব নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলে না। তার পরিবারকে বিব্রত করে না। সামাজিক অবস্থানে ধর্ষিতা কোনভাবেই হেয় প্রতিপন্ন হয় না, বরং যথেষ্ট সমবেদনা, সহানুভূতি পেয়ে থাকে। এবং, এটাই হওয়ার কথা।
যত শক্ত মেয়েই হোক, ধর্ষণের পর একটা মেয়ে প্রচণ্ড মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যেই থাকার কথা। সে অবস্থায়, তাকে বা তার পরিবারকে যদি সমাজ নিয়ে ভয় পেতে হয়, আইনের আশ্রয় তারা না পায়, তাহলে তাদের পক্ষে এই ঘটনা নিয়ে কারো সামনে আসা প্রচণ্ড কঠিন এক ব্যাপার। কয়জন মেয়ের সেই সাহস থাকে? আর শুধু তার একার নয়, তার পরিবারের সাহসও দরকার। কয়টা পরিবার এতো বড় ঝুঁকি নেবে, এতো প্রতিকূলতার মাঝে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি আছে কজনার? 
কদিন ধরেই ভাবছিলাম ‘শোয়ার আগে দশবার ভাবো’ এই শিরোনামে কিছু লিখবো। এর মূল কারণ ছিল, শাকিব খান আর অপুকে নিয়ে যখন আলোচনা হচ্ছিল, তখন একটি বিষয় ঘুরে ফিরে এসেছে যে বিবাহিত দম্পতির ক্ষেত্রে পর্যন্ত পিতার পরিচয় গোপন করা হচ্ছে। কিন্তু পৃথিবীতে কোনো মায়ের পক্ষেই সম্ভব নয় মায়ের পরিচয় অস্বীকার করা। আমাদের দেশের সমাজ অনেক এগিয়েছে। অনেক জায়গায়ই দেখি মেয়েরা দাবি করছে, ‘আমার শরীর আমার, আমি সেটা নিয়ে যা ইচ্ছা তাই করতে পারি।’
তাদের কথায় যুক্তি আছে। ধর্মীয় বা সামাজিক শাসনে কারও যদি বিশ্বাস না থাকে, সে তাহলে অবশ্যই এ ব্যাপারে স্বাধীন হওয়ার কথা। কিন্তু দু:খজনকভাবে এক্ষেত্রে আমাদের সামাজিক অবস্থান মেয়েদের জন্য এই স্বাধীনতার কোনো ব্যবস্থাই করেনি।
পশ্চিমা সমাজে একজন সিঙ্গেল মা বা অবিবাহিত মা দেখে কেউ চমকে উঠবে না, কেউ আঙ্গুল তুলে দেখাবে না, কেউ প্রশ্নও করবে না সেই মায়ের বাবা, মাকে বা হেয় করবে না তার পরিবারকে। কিন্তু আমাদের সমাজ এসব ব্যাপারে চরম প্রতিক্রিয়াশীল। যদিও পশ্চিমা সমাজে সিঙ্গেল মাকে কেউ সামাজিকভাবে ছোট করে না, তথাপি একা একা একটা বাচ্চা মানুষ করা সহজ কাজ নয়, একজন শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশে মা এবং বাবা দুজনেরই দরকার আছে।
সিঙ্গেল মায়ের সন্তানেরা সব সময়ই সেই মানসিক শূন্যতা এবং অভাববোধ নিয়ে বড় হয়, যেটা পরবর্তীতে নানা মানসিক সমস্যারও কারণ হয়ে দাড়ায়। ধর্ম মাথায় না রাখলেও সামাজিক প্রতিকূলতা কতোখানি সহ্য করা যাবে সেটা মাথায় রেখেই কারো সাথে শারীরিক সম্পর্কে যাওয়ার আগে অনেক অনেক বেশি ভাবার দরকার আছে। 
মেয়েদের জন্য আরেকটি প্রচণ্ড দুঃখজনক অভিজ্ঞতা হোল জোরপূর্বক গর্ভপাত। কুমারী মায়েরা অনেক সময়ই বাধ্য হয়ে এই পথ নেয়, যেই ক্ষত মন থেকে মুছে যায় না সারা জীবন। শুধু কুমারী মা কেন, অনেক বিবাহিত দম্পতির ক্ষেত্রেও স্বামীর চাপে নিজের অনিচ্ছায় অনেক মহিলাকেই গর্ভপাত করতে হয়। যেই সন্তানটিকে নিজে ধারণ করার ক্ষমতা নিজের নেই, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও নিজের নেই, সেই সন্তানটিকে পৃথিবীতে আনার আগে মায়ের অনেক বেশি ভাবা দরকার, সে কুমারীই হোক আর বিবাহিতই হোক । একটি পুরুষের ক্ষণিকের সুখের জন্য একটি মেয়ের জীবনে নেমে আসতে পারে চরম দুর্যোগ। 
সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া দুই বিশ্ব বিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনার কারণে আমার লেখার শিরোনামও পাল্টে গেল। ছেলে মেয়ে সহজ সরল বন্ধুত্বের ব্যাপারেও সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। এক সাথে চারজন বন্ধু থেকেও লাভ হয়নি, অস্ত্রের মুখে ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে মেয়ে দুটিকে। যে দেশে অস্ত্র এতো সহজলভ্য, আইন এতো অকার্যকর, সমাজ এতো নিষ্ঠুর সে দেশে নিজেকে নিজে নিরাপদ রাখা ছাড়া আর তো কোন উপায় দেখি না।
মেয়েরা, ছেলেদের সাথে মেলা মেশার ব্যাপারে অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করো। প্রেম তো বটেই, বন্ধুত্ব, স্কুল, কলেজ, কর্মক্ষেত্র সব জায়গায় চোখ, কান খোলা রাখো। বিশ্বাস করে বিপদে পড়ার চেয়ে প্রতিটা পদক্ষেপে শতবার ভাবো। এই দেশ, সমাজ তোমাদের নিরাপত্তা দেবে না। নিজেই নিজের নিরাপত্তার ব্যবস্থা কর। 
লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 400
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    400
    Shares

লেখাটি ৪,৯৬৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.