পুরো দেশটা কি ‘ধর্ষক নগরী’ হয়ে গেল?

রুমা মোদক:

পুরো দেশটা কি ধর্ষণ নগর হয়ে গেলো? মসজিদে, ক্ষেতে ,হোটেলে, রাস্তা-ঘাটে কেবলই তাদের হুংকার? পূজা, তনু, সংখ্যালঘু, পাহাড়ি, আদিবাসী মেয়ে, বিত্তশালীদের কন্যা, কেউই রেহাই পাচ্ছেন না!

নার্ভের সহ্য ক্ষমতা কমে যাচ্ছে ! আর মানতে পারছি না। যখনই ফেসবুকে কোনো ধর্ষণ, খুন, সিরিয়ার যুদ্ধ সংক্রান্ত ভিডিও/লেখা আসে,আমার নার্ভ সহ্য করতে পারে না। কিংবা কেউ অন্যায়ভাবে আমাকে যন্ত্রণা করছে দেখছি , আমি দ্রুত স্ক্রল করে চলে যাই, কিংবা সোজা ডিলিট করে দেই সেই মানুষটিকে।

না, তারা আমার শত্রু নয়, কিন্তু আমি যে ওদের মত হতে পারবো না, এই সত্যটা আমার কাছে পরিষ্কার তাই !!

শুধু ভার্চুয়াল জগতে নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও যখনই কোনো কনফ্লিক্ট, দ্বন্ধ, সংঘাতের আশংকা করি, সেই সমস্ত মানুষ এবং পরিবেশ থেকে দ্রুত সরে আসি, দরজাটা বন্ধ করে শান্তির নিঃস্বাস ফেলি।

আমি বুঝে গেছি, পৃথিবীতে গুড এবং ইভিল এর লড়াই থাকবে, আমার ক্ষমতা নেই কিচ্ছু করার। আগে মানুষকে বুঝাতে চেষ্টা করতাম, এখন হাল ছেড়ে দিয়েছি। কারণ দিনশেষে এইটা সত্য যে, মানুষ খুব বেশী বদলায় না এবং মানুষ সবসময় তার নিজের রুচিমত মানুষ খুঁজে নেয়। সুতরাং হিসাবটা সোজা :: যারা থাকার, থাকবে এবং যারা যাবার, তারা যাবেই !!

সুতরাং এই বন্ধ ঘরে ফুল, পাখী, গান নিয়ে আমি আমার সেল্ফ ডিনাইয়েল এর রাজত্বে সম্ৰাজ্ঞী। আমি শুধু নিজের পৃথিবীটুকু পরিষ্কার রাখি। আমার সবুজ পৃথিবীতে আমি নিজেকে ছাড়া কাওকে ঠকাই না, আমার পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে যেখানে আমার যতটুকু দায়িত্ব, আমি সবাইকে তাদের পাওনার থেকে বেশীই দেই –তাই দিনশেষে শান্তি টুকু আমার কাছ থেকে কেও নিতে পারে না। আমি বিশ্বাস করি, বাইরের পৃথিবীর থেকেও নিজের কাছে সৎ থাকা জরুরি। (কনফিডেন্টলি বলছি, আমার বরসহ আমার দুই পরিবারের অসংখ্য লোকজন আমার বন্ধু লিস্ট এ আছে)।

আমার গাছ-পাতার, ডাল-ভাতের, গানের-কবিতার, ব্যস্ত পৃথিবী নির্ঝঞ্ঝাট নয়, কিন্তু সেখানে দূর্বলের উপর সবলের অত্যাচার নেই। এক্কেবারে ফকফকা সাদা আমার জগৎ !! And that’s my sanctuary for hibernation !!

কিন্তু যতই দরজা আটকাই না কেন, কিছু মানুষের আস্ফালন, ধর্ষিতা মেয়ের কান্না, অসহায়ত্ত্ব আমার পিছু ছাড়ে না। হা ঈশ্বর ! এই অসহায়, যন্ত্রণাদগ্ধ মেয়েগুলিকে, এই দুঃসময় থেকে আমার দেশকে তুমি উদ্ধার কর।

মানুষ কোথায় যাবে? বিচার ব্যবস্থা যেখানে ক্ষমতাশীলদের কুক্ষিগত, সাগর-রুনীর পরিবার, ওদের ছোট্ট মেঘ,পূজার বাবা-মা, দরিদ্র রসরাজ এবং তার পরিবার, অসহায় শিক্ষক শ্যামল কান্তি—- তনুর বাবা-মা, পাহাড়ী রমেল এর মা, নতুন করে ধর্ষিত হওয়া এই মেয়েদের মায়েরা কার কাছে বিচার চাইবে?

যেখানে হাজার কোটি টাকার চোররা রাষ্ট্র পরিচালকদের পেয়ারের দোস্ত হয়, খেটে খাওয়া অসহায় তিন টাকার পকেটমার, পুলিশ এবং পাবলিকের গণ পিটুনীতে রক্তাক্ত হয়ে বীভৎস ভাবে মারা পড়েন —সেখানে কার কাছে বিচার চাইবে মানুষ।

দেশে এতোগুলো টার্ম এ নারীরা রাষ্ট্র ক্ষমতার শীর্ষে ছিল, এখনও আছে —তবুও নারীবান্ধব কোনো আইন তৈরি হলো না। ধর্ষণের শিকার নারীকে এখনও আদালতে বার বার ধর্ষণ করা হয়। ওরা পুরুষতন্ত্রের ঢাকে তাল দিয়ে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করায় সর্ব শক্তি ব্যয় করলো ! কিচ্ছু করলো না খেটে খাওয়া, সাধারণ মেয়েদের/নারীদের জন্যে।

তাই তারা শিফন শাড়ি, পরচুলা পরে ড্রিংক করুক ,পরতে পরতে মুখে আটা ময়দা মাখুক, লিভ টুগেদার করুক, জামদানি পড়ে সমুদ্রে পা ভিজাক, তেঁতুল হুজুরের সাথে গভীর রাজনৈতিক, কূটনৈতিক বন্ধু হয়ে রেলের কোটি টাকার জমি গিফ্ট করুক, জবরদস্তি করে সুন্দরবন ধ্বংস করছে বলে পত্রিকাওয়ালারা যতই গলা ফাটাক , আমার তাতে কিছু যায় আসে না। আমাদের অসহায় মেয়েদের প্রতি যাদের ভালোবাসা নেই, তারা আমার প্রিয় কখনোই নয়!

যেহেতু আমি কিচ্ছু করতে পারি না, আমি শুধু এসকেপিস্টদের মত অসহায় মানুষের কান্না থেকে পালাতে চাই। আমার একটা ঈগলু দরকার, যেখানে নেট নেই, যেখানে অসহায় মানুষের কান্না আমায় হন্ট করে বেড়াবে না!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.