ঘুমিয়ে আছে তেঁতুল পিতা …

0

শারমিন জান্নাত ভুট্টো:

যারা কথায় কথায় ধর্ষণের শিকার মেয়েদের দোষ খুঁজে বেড়াতে ওস্তাদ, তারাও কোনো ধর্ষকের থেকে কম নয়। সামাজিকভাবে কোনো নারীকে যেভাবে হেয়, অপদস্থ, কটু আর অশ্লীল কথার সম্মুখীন হতে হচ্ছে, তাতে করে একজন সুস্থ মানুষও দুদিন বাদে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতে পারে সহজেই।

বোধ করি, উপমহাদেশের দেশগুলোই শুধুমাত্র নারীদের শারীরিকভাবে নয় মানসিক,সামাজিকভাবে ধর্ষণ করে। আমাদের মতো দেশে তনুর মতো মেয়েদের নিজের জীবন দিয়ে, হযরত আলীর মতো পিতাকে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে, নয়তো পূজার মতো ছোট্ট শিশুকে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে প্রমাণ দিতে হয় তারা ধর্ষণের শিকার আর সমাজ, আইনব্যবস্থা, এবং প্রভাবশালীরা তাদের পাওনা ন্যায্য বিচার নির্ধারণ করতে চাইছে কখনো টাকার মূল্যে, নয়তো হুমকির মুখে।

বন্ধুর জন্মদিনে যাওয়া মানে কি সেই মেয়ে খারাপ, তাকে ধর্ষণ করতে হবে? আমি তো মনে করি,অনেকগুলো আস্থার জায়গার একটি হচ্ছে বন্ধুত্ব। খুব ঘটা করে বন্ধু দিবস পালন করি সারাজীবন পাশে থাকার জন্য। অথচ ডেকে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে পরবর্তীতে হুমকি-ধামকি দেয়া যদি বন্ধুত্বের নমুনা হয়, তবে ধিক সেই বন্ধুত্বে। একেকবার একেক কথা বলে এক একটি ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডকে হালাল করা হয়। কেনো অত রাতে মেয়েগুলো হোটেলে গেলো, কেনো এতদিন পর মামলা করলো, কেনো ভিডিও ছাড়া হচ্ছে না, টাকা পয়সার হিসেব মিলে নাই বলেই মামলা, এইসব প্রশ্ন যারা করছেন তাদেরকে বলছি, আপনাদের মতো পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার দরুণই নারীরা নির্যাতিত, অবহেলিত আর ধর্ষিত হচ্ছে।

মজার ব্যাপার হচ্ছে কিছু নারীও তাতে বাহবা দিচ্ছে ওইসব পুরুষদের যারা ধর্ষকের পক্ষে সাফাই গাইছে, আর ধর্ষিতাকে গালি দিচ্ছে। রাতে বন্ধুর জন্মদিনে গিয়ে সে খারাপ হয়ে গেলো, আর আপনি সেই খারাপকে গালি দিয়ে বেশ ভালো সাজার চেষ্টায় আছেন তাই তো? আরে শুধুমাত্র মা ও বোনের সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখলেই ভালো পুরুষ হওয়া যায় না। শ্রদ্ধা আর সম্মান কিভাবে অন্য নারীদের দেখাতে হয় তাও জানতে হয়, শিখতে হয়। আর এসব শিক্ষা পারিবারিকভাবেই বোধকরি সবাই জানে ও শেখে।

তবে যে পুরুষ বনানীর ধর্ষণের ঘটনায় ওই দুটো মেয়েকে বেশ্যা, নষ্টা বলে গালি দিচ্ছেন তারাও কোন মনমানসিকতার আর কী ধরনের পরিবার থেকে এসেছে, কী শিক্ষা নিয়ে এসেছে, তা বোধকরি এখানে আর বিশ্লেষণের কোনো দরকার আছে। এসব পুরুষরাই নারীদের কামনার চোখ দিয়ে যাচাই-বাছাই করে প্রতিনিয়ত আর দিনশেষে নিজের গায়ে ভালো পুরুষের তকমা বাজার (সমাজ) থেকে কিনে এনে লাগিয়ে রাখে।

আমাদের সমাজের কিছু কীট আছে যারা অভাবে এখনও চরিত্রবান। তবে কাল যদি কোন মেয়েকে সুযোগে একটু কাছে পাওয়া যায়, হলফ করে বলতে পারি কেউ সেই মেয়েটিকে আস্ত রাখবে না। এসব মুখোশধারীরা যে কোন নারীকে সামনে পেলেই হলো, লালা নি:সরণ করা শুরু করে। ভেতরে ভেতরে অনেকেই ধর্ষক আর এদের অবস্থান আমাদের আশেপাশেই। কেউ শরীরের জোর খাটিয়ে ধর্ষণ করে আর কেউ তার চোখ দিয়ে ধর্ষণ করে প্রতিনিয়ত।ছাই-চাপা আগুনের মতো এদের অন্তরেও গোপনে লালিত হতে থাকে ধর্ষক হয়ে ওঠার মোহ।বন্য শেয়ালরা যেমন সময় আর সুযোগের অপেক্ষায় থাকে তার শিকারের জন্য তেমনি সমাজের কিছু পুরুষরাও একই কাতারে পড়ে। আরে দণ্ড থাকলে হয়তো পুরুষ ক্যাটাগরিতে ফেলা যায় তাই বলে তো তাকে সবসময় মানুষ বলা যায় না।

ভয়ংকর এ পুরুষগুলোর নজরে নারী মানেই ভোগপণ্য। সময় আর সুযোগের অপেক্ষায় থাকা এ জানোয়ারগুলো পথে-ঘাটে, স্কুল-কলেজ,মাদ্রাসা,হাসপাতাল, নিজ বাসা এমনকি সেনানিবাস এলাকায়ও শুধু ধর্ষণ করে ক্ষান্ত হয় না এমনকি ফেলে যায় লাশ করে। কর্তৃত্ব আর ক্ষমতার দাপটে এক একটি ঘটনা বিলীন হয়ে যায় সময়ের স্রোতে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক সেনারা টার্গেট করেছিলো, এদেশের নারীদের। তারা নারীদের নির্যাতন ও অপমানিত করেছে তবে ভাঙতে পারেনি এদেশের নারীদের মনোবল, দৃঢ়তা আর আত্মবিশ্বাস।

স্বাধীনতার পর আজো যারা নারীদের টার্গেট করছে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীদের মতো সেসব পুরুষরা তাদের মননে,চলনে ধারণ করে চলছে এক একটি ধর্ষকের রুপ। এদেরকে চিনে রাখুন হয়তো এরা আপনার আশেপাশেই আছে। ঘুমিয়ে আছে তবে ধর্ষক হয়ে জেগে ওঠার আগেই সোচ্চার হয়ে উঠুন আপনি। আওয়াজ তুলুন এসব নরকীটদের বিপক্ষে, সবার কাছে খুলে দিন এদের আসল চেহারা, উন্মোচন হোক এদের মুখোশ।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 347
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    347
    Shares

লেখাটি ১,৩৬২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.