কাঠগড়ায় প্রশ্নবিদ্ধ নারীর চরিত্র!

0

ফাহরিয়া ফেরদৌস:

পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ এর অধীনে স্ত্রী মামলা করেছেন স্বামীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ হলো, স্বামী মেরে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে স্ত্রীকে এবং পরবর্তি সময় তাকে না জানিয়ে ফার্নিচার, গয়না ইত্যাদি জিনিস স্বামীর কাছেই, অথচ স্বামীর বর্তমান বাসস্থান সম্পর্কে স্ত্রী জানেন না।

স্ত্রী তার ফার্নিচার ও মূল্যবান জিনিস ইত্যাদি ফেরত চায়। ছেলে ও মেয়ে উভয়ই উচ্চ শিক্ষিত এবং ভালো পেশায় আছেন। মেয়ে একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিকা। পেশার কারণে মেয়েকে কয়েকবার বিভিন্ন সেমিনারে দেশের বাইরে যেতে হয়েছে। ছেলে মামলার জবাবে বলেছে, মেয়ের বাবা বিয়ের সময় ফার্নিচার দিয়েছে। এখন সমাধানের বিষয় হলো, কী কী জিনিস ছেলের কাছে আছে, এবং তা কিভাবে মেয়েকে হস্তান্তর করা হবে, কিন্তু যখন মামলার সাক্ষী –জেরা শুরু হলো, তখন অপর পক্ষের আইনজীবী মেয়েকে খুব অপ্রাসঙ্গিকভাবে জেরা করলেন, আপনি দেশের বাইরে কেন গিয়েছিলেন? আপনার হোটেল রুমে আপনার সাথে কে ছিলেন? কেন আপনার স্বামী আপনার সাথে যায়নি? আপনার ফেসবুক একাউন্ট কয়টি? আপনি কি বাথরুমে ফোন নিয়ে যান? আপনার সাথে হোটেলে আপনার বয়ফ্রেন্ড ছিল ইত্যাদি!

একজন মানুষ হিসেবে আমার প্রশ্ন, জেরার এই প্রশ্নোত্তরের সাথে কি কোন সম্পর্ক আছে মামলার? কোনো মেয়ে যখন দেনমোহর ও ভরনপোষণের মামলা করে, তখন জবাবে ছেলেপক্ষ দেনমোহরের কথা স্বীকার করে এবং টাকা দিতেও স্বীকার করে, তারপর খুব অপ্রাসঙ্গিকভাবে অধিকাংশ মামলার জবাবের কোথাও না কোথাও মেয়ে উচ্চাকাংক্ষী, লোভী, অন্য ছেলের সাথে সম্পর্ক ছাড়াও মেয়ের চরিত্র নিয়ে দুই-তিন লাইন লিখা থাকবে। এছাড়াও কাজীর কাছ থেকে স্বামী কর্তৃক পাঠানো তালাকের নোটিশে, তালাক প্রদানের কারণ হিসাবে ঘরটিতে লিখা থাকে “স্ত্রী, স্বামীর অবাধ্য/ উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন” ইত্যাদি।

বহু বিবাহ এবং বিবাহ বিচ্ছেদ সমাজে আগেও ছিল, এটি নতুন কিছু নয়। তবে আগে বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিতে মানুষ যতোটা ভাবতো, এখন আর ততোটা ভাবছে না। এখন প্রায়ই শোনা যায় যে, স্ত্রী কর্তৃক তালাকের সংখ্যা বাড়ছে। বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা বৃদ্ধির অনেক কারণ আছে, মেয়েরা আগেও নির্যাতিত হতো, এখনো হচ্ছে; বিষয় হলো, আগে মেয়েরা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ছিলো না, তাই দিনের পর দিন সব সহ্য করেও স্বামীর বাড়িতে পরে থাকতো, এখন আর তা হচ্ছে না, তারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করছে।

কখনোই যে স্ত্রীর কারণে কোনো স্বামী সাফার করতো না, বা করছে না বিষয়টি এমন নয়। তখন পুরুষরাও অনেক কারণে চুপ থাকতেন এবং বিয়েটি টিকিয়ে রাখতেন। এক সময় মনের মিল না থাকলেও মানুষ সারাজীবন এক বিয়েতেই কাটিয়ে দিয়েছেন। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে মানুষের অনেক কিছু বদলে গেছে, তাই এখন মনের মিল না হলে মানুষ একত্রে বসবাস করতে চায় না। অনেক ছেলেমেয়েই আছে যারা কেবলমাত্র মনের অমিলের কারণেই একতরফাভাবে তালাক দিচ্ছেন।

আবার উভয়পক্ষ পারস্পরিক সম্মতিতেও নিজেদের বিবাহবন্ধন থেকে মুক্ত করে দিচ্ছেন। সমস্যা হলো, প্রকৃত অর্থেই মনের অমিলে তালাক হলেও সমাজের মানুষ তা মেনে নিতে পারছেন না, তাদের ধারণা হলো ছেলে অথবা মেয়ে কারো দোষ না থাকলে তো বিয়েটা টিকেই যেত!!

বিবাহ বিচ্ছেদ পরবর্তি যৌতুক, নারী নির্যাতন, দেনমোহর, ভরনপোষণ, সন্তানদের কাস্টডি বিষয়ক মামলা হয়ে থাকে। প্রত্যেকটা বিষয়ে কারণে- অকারণে উঠে আসে উভয়পক্ষের চরিত্র। সাধারণত মামলার আরজি ও জবাব ঘাটলে বেশির ভাগ সময়ই দেখা যায় যে, চরিত্র সংক্রান্ত একটি লাইন থাকবেই।

তবে সাধারণত এই চরিত্রের বিষয়ে মেয়েরা একটু বেশি ঘায়েল হয়। শুধু কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে চরিত্র সংক্রান্ত অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন শুনতে হবে বলে অনেক মেয়েই সত্যিকার অর্থে নির্যাতিত হবার পরও মামলা করতে আসে না। প্রয়োজন ও অপ্রয়োজনে মেয়েদের চরিত্র কেমন সেই বিষয়টি হয়ে উঠে মামলার এক নম্বর বিষয়, ধারণাটা এমন যে, মেয়ের চরিত্র খারাপ এটা প্রমাণ করতে পারলেই মামলায় জেতা হয়ে গেলো! খুব অপ্রাসঙ্গিকভাবেই মেয়েদের চরিত্র নিয়ে টানাটানি করা হয়। এটি তো বেগম রোকেয়ার আমল বা সৌদি আরব নয় যে মেয়েরা একা চলাফেরা করতে পারবে না! আমাদের আইনগুলোতে আগে কখনোই মানসিক নির্যাতন বিষয়গুলোর কোনো অবস্থান ছিল না।

যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এখন মানসিক নির্যাতনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে; যদিও “মানসিক নির্যাতন” বিষয়টি যেহেতু শরীরে প্রদর্শিত হয় না এবং আমরা তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের মানুষ তাই এই “মানসিক নির্যাতন” বিষয়টি প্রমাণ করা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য। তারপরও যেহেতু আইনে এখন “শারীরিক নির্যাতন” “যৌন নির্যাতন” থেকে “মানসিক নির্যাতন” কে আলাদা ভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, তাই আইনজীবী এবং আদালতেরও প্রয়োজন সময় ও সমাজের সাথে আধুনিক মনমানসিকতার প্রয়োগের।

ফাহরিয়া ফেরদৌস: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 414
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    414
    Shares

লেখাটি ১,৫৮৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.