ধর্ষক ভাইদের বলছি, নিজেদের সামলান

0

বিথী হক:

প্রিয় ভাইসকল,

আপনাদের ‘ভাই’ ডাকতে লজ্জা লাগছে। তাও ডাকছি, একটা ডাকে যদি আপনাদের মাথা থেকে অন্তত এক মিনিটের জন্য হলেও কামভাব চলে যায়। বলছিলাম, নিজের চরিত্র আর প্যান্টের জিপার ঠিক করার মতো জরুরি কর্তব্য এই মুহূর্তে আর কিছু নাই। এই যে একের পর এক বলেই যাচ্ছেন কোন কোন কারণে ধর্ষণ করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও করা হবে, এতে কী প্রমাণ হয় জানেন না?

প্রমাণ হয় আপনিও সুযোগের অভাবে সৎ অর্থাৎ সুযোগের অভাবে নিজের ধর্ষক চরিত্রটা জনসম্মুখে উন্মোচিত হয়নি এখনো অবধি। বুঝতেই পারছেন আজকাল এতো বোকা আর কেউ নয় যে আকার-ইঙ্গিত বোঝেন না!

এই যে বলছেন পার্টি আমাদের কালচার না, মেয়েরা কেন এসব পার্টিতে যায়! বলছেন বন্ধুদের সাথে অবাধ মেলামেশা করে কেন, কেন হোটেলে যায়? বলছেন, মেয়েদের চরিত্রে সমস্যা থাকে বলেই রেপ হয়। বলছেন, দুশ্চরিত্রাদের জন্য বিচারের প্রয়োজন নেই। বলছেন, বাড়িতে না জানিয়ে কোথাও গেলে এমন অবস্থাই তো হবে। বলছেন, কালচার বহির্ভূত কার্যক্রমে অংশ নেওয়া মানেই তাকে আপনি যে কোনকিছু করতে পারবেন! বলছেন, যেসব নারী বোরকা-হিজাব করে না, তাদের দেখে আপনারা ব্রেক ফেইল করে হিজাব-নেকাব সম্বলিত তনু/খাদিজা বা পূজার ওপর স্লিপ কেটে পড়ে যান! বলছেন, তনুরা নির্দোষ হয়েও বেপর্দা নারীদের খেসারত দিচ্ছেন। আবার এও বলছেন, নারীরা যেমনই হোক, তাদের দেখে কামভাব জাগতেই পারে। বলছেন, কামভাব জাগবেই, কারণ নারীরা তেঁতুল, নারীরা অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

আচ্ছা ভাই, আপনার কেন মনে হয় না একটা মেয়ে ল্যাংটা হয়ে রাস্তায় শুয়ে থাকলেও তাকে ছোঁয়ার অধিকার আপনার নাই! আপনার কেন মনে হয় না একটা মেয়ে যে কোনো অবস্থাতেই ধর্ষণের শিকার হতে পারে! কেন মনে হয় না রাস্তায় মুখ-বুক খোলা ভিক্ষা করা নারী থেকে বিশ তলার এসির নিচের নারী পর্যন্ত কোন নারীই আপনার অটো-অধিকারের আওতায় পড়ে না।

আপনার একটা অত্যন্ত ক্রিয়াশীল নিয়ামক আছে বলেই কেন ধরে নেন যে কোন নারীর ওপর উপগত হবার আকাশ-পাতাল ক্ষমতা আপনার অঙ্গান্তর করা হয়েছে? কেন ধরে নেন আপনার সাথে কেউ কফি খেতে গেছে বলে সে আপনার সাথে শোয়ার জন্য এভেইলেবল?

একজন নারী যে কোনভাবেই আকর্ষণীয় হতে পারে। এটা তার দোষ না, আপনারও দোষ না। সে আকর্ষণীয় হলে, আকর্ষণীয় হিসেবেই দেখেন। সেক্স সিম্বল, সেক্স অবজেক্ট হিসেবে দেখলেও সেটা আপনারই দায়। তার কোনো দায় নাই, তবে বেসামাল হলে এবং নিজের ওপর এতোখানি নিয়ন্ত্রণ না থাকলে যেকোনো সময় অঙ্গহানির সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেবেন না মশাই।

নারীকে একজন মানুষ হিসেবে দেখতে সমস্যা হলে, ব্যক্তি হিসেবে মেনে নিতে সমস্যা হলে, নারী হিসেবেই দেখেন; সমস্যা নাই, তবে জোর করে, ক্ষত-বিক্ষত করে, রক্তাক্ত করে তাকে ফেলে রাখার চিন্তা এলে বুঝতে হবে, আপনি অসুস্থ। আপনার দ্রুত ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। কারণ এই আপনিই যে কোনো সময় হয়ে যেতে পারেন ধর্ষক। লক্ষণ দেখা দিলেই তাই দ্রুত নিরাময়ের জন্য দৌড়াদৌড়ি শুরু করেন। একটি অত্যন্ত ক্রিয়াশীল প্রত্যঙ্গের কারণে হঠাৎ করেই নিজের মা-বোনের কথা ভুলে যাবেন না ভাইলোগ। ধর্ষণ করতে যাবার আগে নিজের মা বা বোনের চেহারাটা ধর্ষিতার মুখের জায়গায় কল্পনা করেন।

দেখেন তো, নিজেরই মা অথবা বোনকে জোর করে চেপে ধরতে ঘেন্না লাগছে কী না। লাগছে? কিন্তু ধর্ষিতা তো মা বা বোন কেউই নয়। তাতে কী? সেই মা বা বোনের জন্য অন্য কেউও তো থাকতে পারে। ভাবেন তো যে সময় আপনি একজনকে জোর করে বিছানায় নিচ্ছেন সেই একইসময় অন্য কেউ আপনার বোনের চিৎকার-চেঁচামেঁচি অগ্রাহ্য করে তাকে নগ্ন করে তুলছে! ভাবছেন? কেমন লাগছে চিন্তা করতে?

ভাবেন তো আপনার বোনও আপনাদের কাওকে না বলে বন্ধুদের সাথে বেরিয়েছে। তারপর দুদিন পর অজ্ঞান অবস্থায় খুঁজে পেলেন কোনো এক হোটেলের রুমে। যোনি দিয়ে অঝোরে রক্ত ঝরছে, গলায় কেটে বসে আছে নখের-দাঁতের দাগ। কেমন লাগবে আপনার? ধরেন আপনার বোন শরীয়তি হিজাব করতো, বা হাতাকাটা জামা পরতো। কী আসে যায়?

ধর্ষণ না করে বরং প্রেম করেন, একশ’জনের সাথে শোন। কারো কোন সমস্যা নাই, থাকলেই বা কী। যার সাথে শুচ্ছেন, তার সমস্যা তো হচ্ছে না। কিন্তু জোর করে না। জোর করে এক জনের সাথেও না। যদিও আমাদের ‘ওপরে ফিটফাট, ভেতরে সদরঘাট’ টাইপ সমাজ ব্যবস্থায় প্রেম করে শোওয়ার চাইতে ধর্ষণ করাটাই বেশি গ্রহণযোগ্য। কাঠমোল্লারা এইসব বিষয়ে ভাল ফতোয়া দিতে পারবে। তারা চান ভেতরে ভেতরে সবকিছু ছ্যাড়াব্যাড়া হয়ে যাক, খালি জামাকাপড় আয়নার মতো চকচক করুক। ঘরের ভেতর ১০০ দাসী-বাঁদি নগ্ন-অর্ধনগ্ন হয়ে মোড়ামোড়ি করুক, রাস্তায় একটা নারীও যেন বোরকা-হিজাব ছাড়া না বাহির হন।

আমার এই লেখা সকল উঠতি ধর্ষকদের উদ্দেশ্যে যারা একটু আধটু সুযোগের অভাবে ঠিকঠাক লক্ষ্যে পোঁছুতে পারছে না। অথচ রোজ রাস্তায়, ট্রেনে-বাসে গায়ের সাথে গা লাগিয়ে আমরা ঘুরে বেড়াচ্ছি। জানিও না কে কবে আমাকেই ধর্ষণেচ্ছা নিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখছে। জানতেই পারছি না মনে মনে কতবার আমাকে ধর্ষণ করে ফেলছে। মনে রাখবেন, রাস্তায় পড়ে থাকা চকচকে পাঁচশ টাকার নোট তুলে পকেটে ভরে বাসায় নিয়ে আসা, আর রাস্তা-ঘাটে দেখা যে কোন মেয়েকে নিজের কাম চরিতার্থ করার জিনিস বলে ভাবা এক জিনিস নয়। যেকোনো মানুষকে সম্মান করেন। সম্মানের সাথে সাথে প্যান্টের জিপারেরও যত্ন নেন।

আর একটা কথা, এটা ভাবার কোন অবকাশ নাই যে দুশ্চরিত্রাদের জন্য বিচার নাই। দুশ্চরিত্রা বলেন ঠিকই, কিন্তু তার আগে শুয়েও নেন। মানে কী ধরেই নিচ্ছেন আপনারা দুশ্চরিত্র, এতে সমস্যা নাই, কিন্তু নারীরা দুশ্চরিত্রা হলে সমস্যা আছে। গলায় তাবিজ করে বেঁধে রাখেন, আপনি দুশ্চরিত্র ধর্ষক হলেও আপনি ধর্ষক এবং আপনার বিচার হবে। এবং কোন নারী দুশ্চরিত্রা ধর্ষিতা হলেও আপনিই ধর্ষক এবং আপনার বিচার হবে। একজন যৌনকর্মী খুন হলে যেমন বিচার তার প্রাপ্য, একজন দুশ্চরিত্রা (আপনাদের ভাষায়) ধর্ষণের শিকার হলেও তার সে বিচার প্রাপ্যই। কোনকিছু দিয়েই ধর্ষণকে জাস্টিফাই করতে পারবে না। সুতরাং ধর্ষক হয়ে ওঠার আগেই ভাবেন, ভাবা প্র্যাক্টিস করেন।

লেখাটি ৬,৫৮৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.