পুরুষরাই পুরুষের শত্রু

0

কাকলী তালুকদার:

এতোদিন জেনেছি নারীই নারীর শত্রু। কথাটির ব্যাখ্যার মারপ্যাঁচ সবাই বুঝতে পারে না। যারা বুঝতে পারেন তারা জানেন, পুরুষতান্ত্রিক মনস্তত্ত্ব দিয়ে বেড়ে উঠা নারী অবশ্যই অন্য একজন নারীর ক্ষতির কারণ বটে। কিন্তু পুরুষদের ভয়াবহ দিকটি হচ্ছে তারাই তাদের হত্যাকারী! এক পুরুষ আরেক পুরুষকে নির্ভর করতে পারে না। তারাই তাদের শত্রু পক্ষ।

পুরুষতন্ত্র যে কেবল নারীর জন্যই বিষাক্ত তা কিন্তু নয়। পুরুষরাও গোপন ব্যাধির মতো নিঃশেষ হচ্ছে পুরুষতন্ত্রের কারণে। যার ফলে হযরত আলী তাঁর কন্যা শিশুটিকে নিয়ে আত্মহত্যা করেন। যে সকল পরিবারে ধর্ষণ নামক শব্দটি ঢুকেছে, সেই পরিবারটিও আরেকজন পুরুষকে নিয়েই তৈরি। সেই পরিবারের যে ভয়াবহ দুর্যোগ, তার ফলাফল নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পরিবারে,সমাজে সবাইকে ভোগাচ্ছে।

এই কয়েকদিনে নারায়ণগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, জুরাইন, কেন্দুয়া, গৌরীপুর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। ছেলে শিশু, মেয়ে শিশু,তরুণী, যুবতী, গৃহবধু ধর্ষিত। কাদের দ্বারা? ধর্ষক সবাই পুরুষ। উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত, পুলিশ থেকে ইমাম, থানা থেকে মসজিদ, মাদ্রাসা থেকে স্কুল সর্বত্র ধর্ষণ!

আচ্ছা, ধর্ষক রা এতো নিরাপদে কিভাবে ধর্ষণ করছে এই সকল স্থানে? দেখার কেউ নেই বলে? অপরাধ করে শাস্তির ব্যবস্থা নাই বলে? যে পুলিশ জনগণের নিরাপত্তা দেয়ার কথা সেই পুলিশ রাতের আধারে তার কলিগ কেই ধর্ষণ করলো! সেই ইউনিফর্মে ঢাকা নারীও আত্মহত্যা করলো! যে ইমাম আল্লার ভয় দেখিয়ে খারাপ কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখার কথা, সেই ইমাম কি জেনে গেছে আল্লাহ তাকে কোন শাস্তিই দিতে পারবে না? সেটা নিশ্চিত হয়েই মসজিদের ভিতর কিশোরীকে ধর্ষণ? যে বন্ধু বন্ধুত্ব দিয়ে আগলে রাখার কথা আরেক বন্ধুকে, সেই বন্ধুই ধর্ষণ করে বন্ধুকে? বা ধর্ষকের হাতে তুলে দেয় বন্ধুত্বকে! স্বামীকে জামিন করতে যে বধূ প্রতিবেশীর কাছে সহযোগিতা চাইতে গেলো, সেই প্রতিবেশীরাও ধর্ষণ করলো তাদের প্রতিবেশীকে!

চারদিকে এতো আইন, এতো প্রশাসন, এতো পাহাড়াদার সবাই ধর্ষক হয়ে উঠছে কেনো দিনকে দিন? যে সেনা সদস্য দেশকে নিরাপদ রাখার কথা, সেই নির্বিঘ্নে হত্যা করে তার আশ্রয়ে থাকা নিরাপরাধ কিশোরকে! ধর্ম ধর্ম করে জিকির তোলা বকধার্মিকগণ নারী মূর্তি সরাতে মরিয়া হয়েছে। সুপ্রীম কোর্টের সামনে নারী ভাস্কর্য যতটা তাদের হৃদয়ে আন্দোলিত করতে পেরেছে, এতগুলো নির্যাতিত নারী সেই সকল ধর্ম প্রাণ পুরুষদের মনে একবিন্দু দাগও কাটতে পারেনি?

অবশ্য এই নারীদেরকে বস্তাবন্দী করাই মূলত এই সকল বক ধার্মিকদের মূল লক্ষ্য। যে পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে, আইনে, ধর্মে নারীদের মর্যাদা নেই, সমতার স্থান নেই, সেখানে নারী মানেই ভোগ্য পণ্য! সেই পরিবার,রাষ্ট্র, আইন, ধর্মকে একজন শিক্ষিত সচেতন নারী কেনো সম্মান জানাবে? কীসের ভিত্তিতে আজ নারীদের মনে সম্মান জাগবে? নারী কোথায় নিরাপদ? কাদের কারণে অনিরাপদ?

যে ধর্মে ঈশ্বরের মহিমার গল্প, উদারতার গল্প সেখানেও নারীদের মর্যাদার স্থান নেই। যে আইন মানুষের জন্য স্বীকৃত সেখানেও নারীদের জন্য বৈষম্য। বন্টন সুষম না হলে সেই জাতির দৃষ্টির পরিবর্তন অসম্ভব। যেখানে আশি বছরের ধর্ম নেতা নারীদের তেঁতুলের সাথে তুলনা করে, আবার সেই ধর্ম নেতাকে দেশের প্রধান কুর্নিশ করে সেই জাতির ধর্ষণের অলিখিত সার্টিফিকেট কপালে ঝুলে গেছে আপনা আপনিই।

অপরাধী যখন নিশ্চিত হয়ে যায় শাস্তির ব্যবস্থ্যা নেই, আছে নিরাপদ আশ্রয় তখন অপরাধীদের ভয় থাকার কোন কারণ নেই। তারা একই অপরাধ বিভিন্ন উপায়ে করে যায়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেই নাগরিক জীবন নিয়ে। বরং রাষ্ট্রই অপরাধীদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে বিভিন্ন উপায়ে। অপরাধীকে ক্ষমতার ছায়াতলে বসিয়ে তালপাখার বাতাস খাওয়াচ্ছে রাষ্ট্র।

যে বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা মানুষকে সচেতন করে তোলার কথা, সেই শিক্ষাকে অন্ধ ধর্মের কাঁধে চড়িয়ে দিচ্ছে রাষ্ট্র নায়কগণ নিজ দায়িত্বে। অন্ধ, অশিক্ষিত মূর্খের দেশে সুস্থ মানুষরা হয়ে যায় গিনিপিগ। স্বার্থপর শাসক খুঁজে ক্ষমতার হাতিয়ার, সেখানে আইন হয়ে যায় বাক্সবন্ধী এক জিয়ন কাঠি।

৯ মে ২০১৭ কানাডা

লেখাটি ১,১৪১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.