‘প্রেমহীন বিয়ে-প্রগতিহীন সমাজ’

0

শর্বাণী দত্ত:

ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি- বিয়ে কেবল দুটো রক্তমাংসের শরীরের মিলন নয়। বিয়ে দুটো হৃদয়ের, দুটো আত্মার এক হওয়া। একটা গোটা জীবন তো বটেই, কখনওবা জীবনের পরেও পাশে চলার প্রতিশ্রুতি। 
এ কথাগুলো আমি নিজেও প্রচণ্ডভাবে বিশ্বাস করি। অবিশ্বাস তখন জাগে, যখন দেখতে পাই যারা এগুলো শিখিয়েছেন তারাই আবার বলছেন, ”বিয়ে সম্বন্ধ করেই করতে হবে। নিজেদের মতো প্রেমফেম করে বিয়ে করাটা অসামাজিক কাজ। ‘আমাদের বাড়িতে’ এগুলো চলবে না।” তাদের এ দু ধরনের বক্তব্যে সংঘর্ষটা বোঝা যাচ্ছে কি? আমি একটু সাহায্য করি বরং।

প্রথমে একটু বলতে চাই পরিবার পরিজনের ব্যস্ত হয়ে ‘উপযুক্ত লক্ষ্মী বউমা’ বা ‘দায়িত্বশীল জামাই’ খুঁজে বেড়ানোর এ পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ে। আচ্ছা একটু ভেবে দেখুন তো, যার জন্য আপনারা হন্যে হয়ে ‘লক্ষ্মী বউমা’ খুঁজছেন, তার তো ‘সরস্বতী বউ’ও ভালো লাগতে পারে। এক্ষেত্রে আপনাদের ইচ্ছে হলো বলে তার গলায় একজন লক্ষ্মী ঝুলিয়ে দিলে পরে সে যদি সেই লক্ষ্মীটির অমর্যাদা করে এবং তাকে কোনোদিন ভালোবাসতে না পেরে নিজেকেও তিলেতিলে দু:খ দিতে থাকে তবে তাদের ভালোবাসাহীন সংসার জীবনের ভাগ কি আপনারা নেবেন?

এরেঞ্জড ম্যারেজে ছেলেমেয়ে উভয়েরই হৃদয় ভেঙে যাওয়ার প্রবল একটা সম্ভাবনা থাকে।তবু সমাজজীবনের আর সবকিছুর মতোই এখানেও মেয়েদের অপমানিত হওয়ার, বঞ্চিত হওয়ার,পণ্য হয়ে যাওয়ার স্কোপটি নি:সন্দেহে বেশি। বলি দেবে বলে পশু কেনার জন্য হাটবাজারে গিয়ে লোকজন তাদের খুব মনোযোগ দিয়ে পরখ করে। তবে কেনো জানি আমাদের ‘রক্ষণশীল’ সমাজে বিয়ের ক্ষেত্রেও এই একইভাবে কনে ক্যান্ডিডেটদের পরখ করা হয়। ছেলেদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি কে হালকাভাবে নেয়া হলেও মেয়েদের বেলায় ‘উঠে দাঁড়াও, বসে দেখাও’, ‘চুল দেখাও’, ‘হিল ছাড়া হেঁটে দেখাও’ প্রভৃতি অসভ্যতা একবিংশ শতাব্দীতেও থামেনি।

আমি ইন ফ্যাক্ট আমার নিজের নানা উচ্চশিক্ষিত আত্মীয়াকে দেখেছি ঢিপঢিপ বুকে মায়ের শাড়ি পরে বাজার থেকে কিনে আনা খাবার ট্রেতে করে সাজিয়ে মাথা নিচু করে পাত্রপক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে দিব্যি ‘হ্যাঁ এগুলো আমি বানিয়েছি’ বলে দাঁড়িয়ে থাকতে, যতক্ষণ না পাত্রপক্ষের কেউ ‘মা তুমি বোসো’ বলে উদ্ধার করছে। এর দুদিন পর কোনো ঘটক স্থানীয় আত্মীয় ফোন করে জানাচ্ছে, ‘ওকে ওদের খুব ভালো লেগেছে, কিন্তু ওর দাঁতগুলো একটু উঁচু বলে আরেকটু সময় নিচ্ছে। পরে জানাবে বললো।’

আরেহ বাবা অসভ্যতারও একটা সীমা-পরিসীমা থাকে তো না কি? এই মিথ্যে ও প্রহসনের ‘রক্ষণশীল বিয়ে’র রীতি আর কতদিন চলবে? যে রীতিতে প্রায়শই পাত্রপাত্রী উভয় পক্ষ নিজেদের শ্রেষ্ঠ প্রমাণের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে, নানারকম ভুজুংভাজুং মিথ্যে বলাকেও জাস্টিফাই করে। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে তো তা আরো ভয়ঙ্কর। নিজের সন্তানকে এতো বছর বুকে আগলে বড় করে হঠাত তাকে দুম করে একটা বাজারে ছেড়ে দিয়ে পণ্য বানিয়ে দিতে লোকের কেনো এত উৎসাহ? লোকজন এসে আপনার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান রত্নটিকে নিয়ে যাবে। তার আগে আবার নেড়েচেড়ে দেখবে, কখনো বা রিজেক্ট করে চলে যাবে, কখনো আবার দরদামও করবে।

‘আমাদের পুরনো সোফাসেট! পাল্টাইনি ভেবেছি ছেলের বউ আসলে নিজের পছন্দসই কিনে নেবে।’ আরেহ হ্যাঁ, এককালে সরাসরি মেয়ের ওজনের সমান পণ নিয়ে ‘কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা’কে উদ্ধার করা হতো আর এখনো তাই হয় কেবল মিষ্টি ভাষার প্রলেপ লাগিয়ে। দিনশেষে যে তিমিরে সে তিমিরেই।

মেয়েদের এমনই এই অপমান, যে অপমান এ সমাজে অপমান বলেই চিহ্নিত নয়। হাটবাজারের পশুর মতো মেয়েদের নিলামে না বসানো গেলে সে বাড়ির সম্মান ক্ষুণ্ণ হয়! যখন কোনো মেয়ে তার জীবনসঙ্গী নিজে বেছে নেয় দুজন দুজনের অন্তরে জায়গা করে নিয়ে, যেখানে একপক্ষের ডমিনেন্স নেই, কর্তৃত্ব ফলানোর সুযোগ কম তখন তা একটা অত্যন্ত অসামাজিক কাজ বলে গণ্য হয়।

সম্বন্ধ করার সময় পাত্রপাত্রী উভয়ের অতীত ঘাঁটার কাজে দুপক্ষের আত্মীয়রা দারুণ মুন্সিয়ানা দেখান। এবং সেই ফেলে আসা অতীতে কোনো খুঁত চোখে পড়ে গেলে সে গল্প আবার আরো গোটা দশজনের কাছে রসিয়ে বলেন না এমন শুভাকাঙ্ক্ষী বোধহয় এ সমাজে খুব বেশি নেই। না, আমি বলছি না যার সঙ্গে আপনি জীবন কাটাবেন তার অতীত জানার কোনো অধিকার আপনার নেই। কিন্তু তা কোনো তৃতীয় ব্যক্তি বা গোষ্ঠী থেকে জানতে চাওয়া এবং অন্যের ব্যক্তিগত জীবনকে তার অনুমতি ছাড়াই বাজারের গল্প বানিয়ে দেয়া কতটা সৌজন্যচর্চিত তা ভেবে দেখা দরকার। এর চেয়ে দুজন মানুষ যদি নিজেরাই নিজেদের অতীত জেনে, তা মেনে নিয়ে সমস্তকিছুর ঊর্ধ্বে গিয়ে একসাথে থাকতে চায় ব্যাপারটা অনেকখানিই মানবিক হয়ে ওঠে না কি?

তাই মাঝেমধ্যেই আমার বিলাসী গল্পে শরৎচন্দ্রের উক্তিটি মনে পড়ে যায়-‘যে দেশের নর-নারীর মধ্যে পরস্পরের হৃদয় জয় করিয়া বিবাহ করিবার রীতি নাই, বরঞ্চ তাহা নিন্দার সামগ্রী…’। 

সমাজ বলছে, বিয়ে দুটো হৃদয় আর আত্মার মিলন। আর আমি বলছি দুটো মানুষ একে অন্যকে কাছে থেকে না চিনে, পরস্পরের মন জয় না করে, সঙ্গীর ভালোমন্দ দুটোকেই গ্রহণ করতে পারার মানসিক স্থিতিতে না পৌঁছে কি করে নিজেদের হৃদয় বিনিময় করে? আমার সত্যিই জানতে ইচ্ছে হয়। সেখানে শরীর, আত্মার মিলন সে তো অনেক পরের কথা। বিয়ে মানে কি? বিয়ে একটা ইন্সটিটিউশন তো? আমার কাছে বিয়ে একটা ঘর। এমন একটা ঘর যেটা দুটো মানুষকে চিরকাল পাশাপাশি আশ্রয় দেয়। বিছানা বালিশ থেকে শুরু করে বাথরুম, শরীর থেকে শুরু করে মন, ব্যথা-বেদনা-সুখ-আনন্দ-ব্যর্থতা-সাফল্য মোদ্দা কথা পুরো একটা জীবন আরেকটি মানুষের সঙ্গে শেয়ার করা। এ তো কোনো মুখের কথা নয় ভাই!

যে লোকটিকে আমি দু সপ্তাহ আগে প্রথম দেখেছি, তার সঙ্গে চৌদ্দ দিনের ব্যবধানে আমাকে এক বিছানায় ঘুমোতে হবে, শারীরিকভাবে মিলিত হতে হবে। কেনো? কারণ আমার বাবা মা তাকে আমার জন্য সিলেক্ট করেছেন। আমার শরীরের ওপর আমার মনের ওপর তার মানে আমার চেয়ে বেশি অধিকার আমার বাবা মায়ের! আরো গভীরভাবে দেখতে গেলে এমন বিয়েতে আবেগ অনুভূতির কোনো দাবি থাকতে নেই! ‘বিয়ে করেছি,পরিবার বানাতে হবে’ এজন্য সঙ্গে থাকা। ভালো লাগুক, মন্দ লাগুক, আমার কমফোর্ট জোনে আঘাত আসুক না আসুক, আমার ইচ্ছে জাগুক না জাগুক- কিছুতে কিছু যায় আসে না।

দুটো মানুষকে চিরকাল একসঙ্গে থাকতে হলে তাতে প্রথম দাবি থাকে ভালোবাসার। নিজেদের মন, হৃদয়কে এক্সপ্লোর করার দাবি থাকে তাতে। তারপর ভালো লাগা, মন্দ লাগা, অভ্যেসগুলোর সঙ্গে খাপ-খাইয়ে নেয়া কখনো প্রয়োজনে অভ্যেস পালটানো, আরও পরে শরীর ইত্যাদি। পৃথিবীর যেকোনো দুটো লোককে একসাথে থাকতে বাধ্য করাটা একরকম পাগলামো। সবার কখনো সবাইকে ভালো লাগতে পারে না। সেখানে বিয়ের মতো বন্ধনে তো ভালো লাগার সাথে ভালোবাসাটাও থাকতে হয়।

আমার জীবন, আমার জীবনসঙ্গী, কিন্তু বেছে দেবে অন্য কেউ- একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যায় এটা মেনে নেয়াটা আরো বড় পাগলামো। যাদের মনে হচ্ছে আমার পুরো লেখাটায় সম্বন্ধ করে বিয়ের বিরুদ্ধতা ছাড়া কিছু নেই, তাদের বলতে চাই আমি সম্বন্ধ করে বিয়ের বিরুদ্ধে নই, তবে ভালোবেসে বিয়ের পক্ষে। আমি জানি, সম্বন্ধ করে বিয়ে করে অনেকেই সুখী হয়েছে। তবে ‘সুখ’ এর সংজ্ঞা আমরা অনেকেই পরিস্থিতির চাপে বাধ্য হয়ে পালটে নিই, এটাও মিথ্যে নয়।

বিয়ের পর ‘ভালো লাগছে না’ তবু ‘থাকতে হবে’ তাই সঙ্গে থাকতে থাকতে একটা বহুদিনের অভ্যেস গড়ে ওঠে। এই অভ্যেসটা একসময় ভালোবাসা হয়ে যায়। এই পুরো ব্যাপারটায় একটা ‘কিন্তু’ থেকে যায়, একটা রিস্ক থেকে যায়। অনেকটা লটারিতে বর বউ তোলার মতো। আমি এও বলছি না যে এই অভ্যেসটা ভালোবাসা নয়। ভালোবাসার যে কোনো সংজ্ঞা হয় না তা কি আর আমি জানি না? তবে এই অভ্যেসটা তৈরি হতে হতে কতবার যে দুজনের মন বিষাক্ত হয়, কতবার যে হৃদয়ে গোলাপ ফোটার বদলে কাঁটা ফোঁটে, তার হিসেব বোধহয় কেউ রাখতে চায় না। অন্তত সমাজ তো নয়ই!

বিয়ে মানে কি সে ব্যাপারে আমার নিজস্ব কিছু এনালাইসিস আছে। আমার কাছে বিয়ে মানে একজন নতুন ‘আমি’ কে খুঁজে পাওয়া। সে তার নিজস্বতা নিয়েই থাকবে, তবু তার মধ্যে আপনি নিজের ছায়াকে দেখতে পাবেন। বিয়ে মানে একটা মানবিক সম্পর্ক- যেটা বন্ধুত্বের, যেটা প্রেমের। যেটায় স্পেস থাকবে অথচ বন্ধনও অটুট থাকবে। বিয়ে মানে জীবনের ব্যর্থতার ভাগ নিতেও নিজ থেকে তৎপর হয়ে ছুটে আসবে এমন একজন সঙ্গীকে পাওয়া। বিয়ে মানে আরো অনেক কিছুই। তাই যে বিয়েতে ভালোবাসা নেই, তাকে আমার ঠিক ‘বিয়ে’ বলেই মনে হয় না!

শর্বাণী দত্ত (Sharbani Datta)
Jadavpur University, Kolkata

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 992
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    992
    Shares

লেখাটি ৩,৯৫৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.