সম্ভ্রম ও ইজ্জতের সাথে ধর্ষণের সম্পর্ক কী?

0

কানিজ আকলিমা সুলতানা:

সম্ভ্রমের সংজ্ঞা কী? সম্ভ্রমের সংজ্ঞা কি নারী-পুরুষ ভেদে আলাদা হয়? যদি আলাদা হয়, তবে কেন আলাদা? আপনারা বলেন, একাত্তুরে চার লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমহানি হয়েছে। একাত্তুরে যে সকল নারীরা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, ধর্ষিতা হয়েছিলেন, শারীরিকভাবে পৈশাচিক আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন, তারা কি সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন?

একাত্তুরে পাকিস্তানী আর্মিরা আর তাদের এইদেশীয় দোসররা ধরা পড়া নারীদের শরীরের সব চাইতে নাজুক অংশে কামার্ত অত্যাচার চালাতো। আঁচড়ে কামড়ে, স্তন কেটে দিয়ে, চুল মুড়িয়ে দিয়ে, দাঁতে স্তনের বোঁটা ঠোঁট দিয়ে ছিঁড়ে নিয়ে, জননেন্দ্রিয়তে লোহার রড ঢুকিয়ে দিয়ে, সারা গায়ে সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়ে, বেয়নেটে খুঁচিয়ে এবং সর্বোপরি না খেতে দিয়ে অত্যাচার চালাতো। এই অত্যাচারগুলোকে কি সম্ভ্রমহানি বলে?

দিনের পর দিন ক্যাম্পে আটকানো নারীদের মাসিকের অপরিচ্ছন্ন রক্তে দুর্গন্ধ হতো, গায়ের ঘাঁয়ে পোকা ধরতো, উকুন কিলবিল করতো, এই অবস্থায় পেটে বাচ্চা আসতো আবার নারীকে তার পেটের বাচ্চাটাকে বহন করতেও হতো। এই অত্যাচারের নাম কি ইজ্জতহানি?

আপনাদের সম্ভ্রম ইজ্জতের সামাজিক ধরন-ধারণের জন্যই এইদেশে নারীরা এখনও নানান ফর্মে যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, ধর্ষিত হচ্ছে। মানসিক ক্লীব আপনারা। আপনাদের সমাজে তাই ধর্ষকের সম্ভ্রমহানি হয় না। যৌন নির্যাতনকারীকে চিনেও আপনারা শাস্তি দেন না। টাকাওয়ালা নির্যাতনকারীকে পারলে পিতার স্থানে বসান।

একাত্তুরে নারীদের উপর অপমান নয়, অত্যাচার হয়েছিল- এই কথাটা প্রতিষ্ঠিত হলে আজ নারীরা সামাজিকভাবেই শক্তিশালী হয়ে উঠতো। ধর্ষণে লজ্জিত অপমানিত না হয়ে ধর্ষকের ধর্ষণদণ্ডে লাথি কষিয়ে বের হয়ে এসে অকুন্ঠিত গলায় বলতে পারতো যে তাকে অত্যাচারের চেষ্টা করা হয়েছিল। সাহসী পুরুষের সাথে তখন সাহসী নারীর তালিকা হতো! অন্যের করা অপরাধে নারীরা নিশ্চয় গ্লানিতে ভুগতো না এবং আত্মহত্যা করে নিজেকে শেষ করে দিতে চাইতো না।

শুধু যৌন সম্ভোগের জন্য নয়, ধর্ষণ হয় শক্তিমত্তা দেখাতে, শিকার ধরার আনন্দ পেতে, ধরা পড়া শিকারের থরথর কম্পন উপভোগ করতে। নারীরা মানসিকভাবে শক্তিশালী হলে ধর্ষকের থরহরি কম্পন তুলে দিতে পারতো। ঘুরে দাঁড়ানো নারীর সামনে ধর্ষক কেঁচোর মত নেতিয়ে পড়তো!

কোনো নারীর গায়ে কোনো পুরুষের হাত পড়লে সে ঘৃণায় কুঁকড়ে যায়। অথচ রাস্তায় কোনো পুরুষ অযাচিত মার খেলে সে উলটা মার দেয়ার জন্য তেড়ে যায়। তাহলে নারীদের মনে ঘৃণা আসে কেন? আসে, কারণ নারীদেরকে আপনারা ইজ্জতের ডাব্বায় ডুবিয়ে রাখেন। নারীরা জানে তার আশেপাশের আপনি বা আপনার বাবা চাচা মামা খালু ফুপা বা আপনার ভাই অথবা আপনাদের ছেলেরা নারীর গায়ে পুরুষের হাত পড়েছে জানলেই পুলকিত হয়ে উঠবেন। অথবা জানা মাত্রই মেয়েটির সম্ভ্রম নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বেন। কেউ কেউ নির্যাতনকারী পুরুষের হাতটিকে নিজের বলে ভাবতে আনন্দ পাবেন।

আমাদের প্রগতি আর চলার আসল শক্তি একাত্তুর। আর আপনারা কি না একাত্তুরের নারীদেরই সম্ভ্রমের খাঁচায় আটকে দিলেন? আপনাদের বোধবুদ্ধিতে কেন ধরা পড়ে না যে ধর্ষণের সাথে সম্ভ্রম ইজ্জতের কোনোই সম্পর্ক নেই!

দিন কিন্তু বদলাতে হবে! আপনাদের নিজেদেরও বদলে যেতে হবে। আপনাদের সম্ভ্রমের খাঁচায় নারীদের আটকে রাখা যাবে না আর! আপনারা বদলালে ধর্ষক বদলাতে বাধ্য হবে। প্রতিটি পুরুষ যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন। হাসি তামাশা রঙ্গরস বাদ দিন। শত্রুর মা বোনকে ভার্চুয়াল ধর্ষণ করা বন্ধ করুন। ধর্ষক এবং যৌন নির্যাতকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। নিজ ঘরের নারী সদস্যকে যেকোনো অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুঁখে দাঁড়াতে প্রেরণা যোগান।

আপনি নারী বিবর্জিত নন। আপনার জীবনে অন্য কোনো নারী না থাকলেও আপনার মা আছে, বা ছিল। সেইকথা মনে করেই নারীর পাশে দাঁড়ান। নারীকে সামাজিক মাপকাঠিতে ফেলে আর অত্যাচারের দিকে ঠেলে দিবেন না। মনে রাখবেন ধর্ষণে মান ইজ্জত সম্ভ্রমের ক্ষতি হয় বলে যতদিন জানবেন, ততদিন ধর্ষণের প্রতিকার এবং প্রতিরোধ হবেনা।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 419
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    419
    Shares

লেখাটি ১,৮১৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.