‘আমাদের পুত্ররা যেন ধর্ষকামী না হয়’

0

জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা:

মেয়েটা ধর্ষিত হবে- এই আশঙ্কা করবেন? নাকি ‘ছেলেটা ধর্ষক হয়ে উঠবে”- এই ভয় পাবেন?” -কথাটি বলেছেন একজন ফেইসবুক বন্ধু|

আচ্ছা, উক্ত বন্ধু’র দেয়া এই ‘দুই অপশন’ এর কোন শঙ্কাটি বাবা-মা’র মনকে সদা কাবু করে রাখে, বলুন তো? ডেফিনেটলি দ্বিতীয়টি নয়! আমরা বাবা মায়েরা (আমাদের বাবা-মায়েরাও করেছেন) সেই প্রাচীনকাল থেকেই ‘মেয়ের অবস্থান নাজুক’ ভেবে নিয়ে প্রথম শংকাটিতে শংকিত হয়ে ‘কন্যা সন্তান’কেই জবুথবু এক ভীত-সন্তুষ্ট জীবন পার করার বুদ্ধি বাতলাতে থাকি। তাতে লাভ কি তেমন হয়েছে কিংবা কন্যা সন্তানের নিরাপত্তা কি আমরা আদৌ দিতে পেরেছি?

…’পুরুষ পশু’রা এখানে, সেখানে ওঁৎ পেতে, বা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে কিংবা হানা দিয়ে এবং গায়ের জোর খাটিয়ে একের পর এক রেইপ করে চলেছে! তাহলে …?

তার চেয়ে বরং আসুন না, প্রিয় অভিভাবকবৃন্দ, এবার একটু অন্য ভয়ে ভীত হই! টেনশন করি, আমাদের পুত্র সন্তানকে নিয়ে? সারাক্ষণ তাদেরকে আগলে রাখি, ‘খারাপ চিন্তা’, ‘খারাপ বন্ধু’ থেকে? তাদেরকে ‘বই পড়া’র মতো কিছু ভালো অভ্যাস গড়ে দেই? তাদেরকে ‘ছোট্ট একটা শিক্ষা’ মন্ত্রের মতো শিখিয়ে দেই~ ‘যদি কারোর কোনো উপকার করতে নাও পারো; শুধু খেয়াল রেখো, কারোর কষ্ট-ব্যথার কারণ কখনো হয়ো না!’  এটুকু, শুধু এটুকুই ~খুব কঠিন কিন্তু না!!

শুধু মেয়েদেরকে নয়, এখন থেকে ছেলেদেরকেও শিক্ষা দেই, নিরাপদ থাকার জরুরত সবারই! নিরাপদ থাকা মানে শুধু নিজেই বিপদ থেকে বাঁচা নয়! ‘অন্যকে বিপদে না ফেলা’ও নিরাপদ থাকা! এই সহজ সত্যটুকুন মানুষ হিসেবে সবাই যেদিন রিয়েলাইজ করবো সেদিন আর প্রিয় পৃথিবীটা এমন ধর্ষকামী থাকবে না!

আবার লিখতে বসার কারণটা এবার বলি!

রিসেন্ট রেপিস্ট নাঈম, সাফাত (‘আপন জুয়েলার্স’ এর মালিকের পুত্র) এর উপর ক্ষোভ প্রকাশের পরিবর্তে বেশিরভাগ মানুষকেই দেখলাম ফেইসবুক-এ পোস্ট দিচ্ছেন, মেয়েদের নিরাপত্তা কিংবা সাবধানতা বিষয়ে। তাদেরকেও খুব দোষ দেওয়া যায় না! বিচারহীনতার সংস্কৃতির অংশ যারা, তারা সহজাত বা স্বাভাবিকতা তেমন দেখেন না|
নিজেরাই যতটা পারেন, বিপদ এড়িয়ে চলতে চান। কিন্তু কথা হলো, বিপদ এড়িয়ে চলতে শিখেও তো সবসময় লাভ হচ্ছে না! তাই, খুঁজতে হবে নতুন পন্থা। এক ফেইসবুক বন্ধু’র দুই লাইনের এ পোস্টটিকেই সময়োপযোগী মনে হয়েছে। মনে হলো, আরো কয়েকজনকে জানাই …!

ভয়ঙ্কর সব ধর্ষণ ঘটনা এবং তৎপরবর্তী আলাপ আলোচনায় বিষন্ন হয়ে যাই বড্ড! পাগলের মতো খুঁজি ‘আশার আলো’ আছে কোথাও? বাস্তবে পাই না। কী আর করা? গল্প-উপন্যাস-সিনেমার আশ্রয়ে যাই।

…কথাশিল্পী হুমায়ুন আহমেদ এর “রূপালী দ্বীপ” উপন্যাসে ৭/৮ জন তরুণ-তরুণী সেন্টমার্টিন্স এ যাত্রাকালে একের পর ফানি বিপদে পড়তে থাকে। বিপদে পড়ে তাদেরকে একবার হাজতেও ঢুকতে হয়। হাজতে ঢুকে, তারা অবাক হয়ে দ্যাখে- এক অতি রূপবতী পাগলও রয়েছে হাজতে। তরুণ-তরুণী’র সেই দলে, বেশ তেজী টাইপ এক মেয়ে ছিল। সে বিরক্তি নিয়ে, থানার ওসিকে জিজ্ঞেস করে, ‘আমাদেরকে না হয়, সন্দেহজনক ভেবে আটক করেছেন! কিন্তু ওসি সাহেব, এই পাগল মেয়েটি কার কী করেছে – সন্দেহ করছেন?’

ওসি উত্তর দেন, ‘না, সে কিছু করেনি বা তাকে সন্দেহও করছি না। তবে সে বাইরে থাকলে, দুদিন পরপর পাড়ার আজেবাজে লোক দ্বারা রেইপড হয়। তাই তার নিরাপত্তার স্বার্থেই, তাকে এখানে রাখা হয়েছে।’ মেয়েটি ক্ষোভে ফেটে পড়ে!

বলে, ‘কী বলছেন পাগলের মতো? যারা রেইপ করে, তাদের হাজতে না আটকে, যে রেইপড হচ্ছে তাকে আটকে রেখেছেন?!’

… ঘটনার অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে, ঐ তরুণ-তরুণী’র দল থানা থেকে মুক্ত হয়ে সমুদ্রস্নানে রওনা দেয়| সেই পাগল মেয়েটিকেও তারা মুক্ত করে, তাদের সঙ্গী করে নেয়!

জানি, জীবনটা গল্প, উপন্যাস কিংবা সিনেমা’র মতো নয়| জীবনের এন্ডিং -এ, ধর্ষক-ভিলেনদের শাস্তি পেতে দেখা যায় না, ‘পিঙ্ক’ সিনেমা’র মতো! তবু ‘অন্যরকম এক চেষ্টা’ করতে দোষ কী? আসুন না একবার চেষ্টা করেই দেখি ~ ‘আমাদের পুত্র সন্তান মানুষের মতো মানুষ হোক; ধর্ষকামী নয়!’

লেখাটি ২,২৯৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.