ধর্ষক কি আইনের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী হতে পারে?

0

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী:

বনানীর রেইনট্রি হোটেলে জন্মদিনের দাওয়াত দিয়ে ডেকে নিয়ে দুইজন তরুণীকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ধর্ষণ করেছে ধনীর দুলাল, তিন নবাবজাদা ইবলিশ। একেকজনের পিতৃ পরিচয় দেখার মতো। দেশের শীর্ষস্থানীয় স্বর্ণালংকার ব্যবসায়ী আপন জুয়েলার্স এর মালিক দিলদার আহমেদের সোনার ছেলে সাফাত আহমেদ।

দ্বিতীয় ইবলিশ সাদমান সাকিফের বাবা হিসেবে নাম শোনা যাচ্ছে সাবেক রাষ্ট্রদূত অবসরপ্রাপ্ত লেফটেনেন্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যার বিশাল ভূমিকা ছিল। তিনি আবার গুলশান-তেজগাও-লিংক রোডে অবস্থিত পিকাসো রেস্টুরেন্টের মালিকও। যদিও এ নিয়ে একটা ভিন্নমতও দেখেছি অনলাইনে। তবে নাম যারই হোক, এটা ক্লিয়ার করার দায়িত্ব তো তাদেরই। ভুল হলেও তাদের প্রতিবাদ জানানোর কথা।

 এদিকে তিন নাম্বার গুণধর ধর্ষক নাঈম আশরাফের পিতৃ পরিচয় পাওয়া গেল না এখন পর্যন্ত! সেই ভাসুরের নাম- ধাম – কর্ম- অকর্ম – দুষ্কর্ম – সরেজমিনে জানতে চায় সাধারণ মানুষ। 

ধর্ষণের পর থেকে মেয়ে দুটির বাড়িতে ড্রাইভার আর দেহরক্ষী পাঠিয়ে নিয়মিত হুমকি দিয়ে আসছিল এই তিন ইবলিশ । সেই ভয়ে মামলা হতে এক মাসের ওপরে সময় লাগলো। তাও তারা শংকিত ন্যায় বিচার পাবেন কীনা! এই আশংকা যে অমূলক না তা বুঝতে কারো সমস্যা হবার কথা নয়। এই তিন জারজ পুত্রধনেরা এতোক্ষণে নিশ্চই মাদার’স ডে উপলক্ষ্যে উইশ – টুইশ, পার্টি – টার্টি শুরু করে দিয়েছে ! তাদের এলিট শ্রেণীর মায়েদের সর্বাঙ্গ তো আগে থেকেই স্বামীদের অঢেল সম্পদের পাহাড়ে সোনা দিয়ে মোড়া, তাদের মুখও কি আজ ধর্ষক পুত্রের মা হতে পেরে কাঁচা সোনার মতো চকচক করছে?

মেয়েগুলো ছ্যাবলার মতো তাদের হ্যান্ডসাম ছেলেদের টাকার জন্য, স্ট্যাটাস পাওয়ার জন্য হোটেলে শুতে চলে আসবে, আর এখন বলে কিনা রেইপড হয়েছিলো! সব টাকা হাতানোর কুমতলব! আহা ! ছেলে তো নয় যেন হীরে জহরত! এমন মহামূল্যবান রত্নের মতো ছেলেদের জন্য দেহরক্ষী না রাখলে চলে! কর বাছারা, মেয়ে বেছে বেছে, দাওয়াত দিয়ে, গাড়ি, ড্রাইভার, দেহরক্ষী পাঠিয়ে, হোটেলে রুম ভাড়া করে ধর্ষণ কর। দেশটা তো তোমার বাপের কেনা! দেশের তাবৎ মেয়েদের ওপর কুনজর দেয়ার অধিকার তো তোমাদেরই। সব অপকর্ম ঢাকার জন্য বাপ তো কম সম্পদ গড়েনি! মার্ডার – ফার্ডার করে ফেললে নাহয় বিদেশে পাঠানোর বন্দোবস্ত করা যেতো। এ তো মামুলি ধর্ষণ! তাও আবার আপোষেই.. মেয়েগুলোর খায়েশ না থাকলে কী এমনি এমনি এসেছে?

দেহরক্ষী দেয়া হয়েছে যেন আরো ভালো করে ধর্ষণকক্ষে দেহরক্ষীর সাহায্যে ধর্ষণ করতে পারো। বলা তো যায় না, আজকালকার মেয়েগুলো যা বিচ্ছু! একে তো বন্ধুর জন্মদিনের দাওয়াতে হোটেলে চলে যায়, তারপর আবার ধর্ষণকে উপভোগ করতে চায় না! নাচতে নেমে ঘোমটা দিতে চায়, ন্যাকামো করার জায়গা পায় না! বিচ্ছু, রাবিশ মেয়েগুলোকে রেইপ করতে গেলে বডিগার্ড ছাড়া চলে? বলা তো যায় না কখন আবার বাধা দিতে গিয়ে হাতে -পায়ে কামড় দিয়ে বসে! এজন্যই তো বডিগার্ড রাখা দরকার বিছানার পাশে, যাতে নির্বিঘ্নে মেয়েগুলোর বিষদাঁত ভেঙে খাবলে খাওয়া যায়! কোটিপতি নবাবজাদার ড্রাইভার বলে কথা।

আইফোন, স্মার্ট ফোনের লেটেস্ট মডেলে ছবি তোলা, ভিডিও করা এসব তো হরহামেশা করতেই হয়! ধর্ষণ দৃশ্য ভিডিও করতে করতে ড্রাইভার ভাবে, ইশ্! বস্ তো বস্ই! ধর্ষণেও বস্! রগরগে রেইপ সিন চাক্ষুষ করে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটায় দেহরক্ষী আর ড্রাইভার। ওদেরও তো পুরুষ শরীর! সাধ আহ্লাদ আছে না?

আবার দুটো মেয়ে সারা দেহে তিন সুযোগ্য, সোনার টুকরো নবাবজাদার প্রতারণায় ধর্ষণের দাগ দেহে নিয়ে, নষ্টামির দায় মাথায় নিয়ে, চরিত্রহীন খেতাব নিয়ে সমাজে ফেরে। সেই বিচারহীনতার সমাজ যেখানে ধর্ষিত, খুন হয়ে যাওয়া, ছিন্নভিন্ন তনু মরে যাওয়ার পরেও সমাজের হাতে অপমানিত হয়ে হাজার বার মরে। সেই নির্লজ্জ সমাজ যেখানে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে নিয়ে ধর্ষিত হওয়া গারো মেয়েটি প্রথমে পাঁচজনের কথা বললেও অজ্ঞাত কারণে তার জবানবন্দি পালটে ড্রাইভারসহ দুই জনের কথা বলে!

সেই দুই কান কাটা বেহায়া সমাজ যেখানে আট বছরের মেয়েকে একাধিকবার ধর্ষণ চেষ্টার বিচারের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরে শেষ পর্যন্ত মেয়েকে নিয়ে চলন্ত ট্রেনের নীচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে হযরত আলী। পূজার বয়স যেন কত ছিল? পাঁচ? আর ধর্ষক সাইফুলের বয়স? যে কী না ছোট্ট শিশুটির শরীরের স্পর্শকাতর জায়গাগুলোতে সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়ে কী বিকৃত উল্লাসেই না ফেটে পড়েছিল! মদ্যপ, রক্তচোষা ধর্ষক সাইফুল ধরা পড়লেও বাকীদের কী অবস্থা? কী বিচার পাবে তারা?

আজ যে মেয়ে দুটি প্রভাবশালী পিতার ধর্ষক পুত্রদের শত হুমকি – ধামকির বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়িয়ে মামলা করেছে, তাদের সাহসিকতাকে আমি শ্রদ্ধা ও সাধুবাদ জানাই। অভিবাদন জানাই। কয়েক বছর আগে দিল্লীতে চলন্ত বাসে ধর্ষিত হওয়া নির্ভয়া বিশ্ববিবেককে নাড়া দিয়ে গিয়েছিল। গোটা ভারতবর্ষ নির্ভয়া, দামিনী – এমন অনেক নামে ডেকে তার পাশে দাঁড়িয়েছিল। জীবন – মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে বিশ্ববাসীকে নির্ভয়া জানিয়েছিল, সে বাঁচতে চায়। নিজের চোখে ধর্ষকদের বিচার দেখতে চায়।

কী নির্ভীক সে উচ্চারণ! নিজের চোখে দেখে যেতে না পারলেও ধর্ষকদের বিচার হয়েছে – সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড। জানি না নির্ভয়া সে খবর পেয়েছে কী না! হ্যাঁ, বারবার ” ধর্ষক ” শব্দটি ব্যবহার করছি। কারণ ধর্ষককে অপরাধী বললে তার অপরাধ স্পষ্ট হয় না। ধর্ষককে ধর্ষক বলে চিহ্নিত করতে হবে সমাজে, ভরা মজলিশে। দেখতে চাই, ধর্ষক কত বড় প্রভাবশালী বাপের ব্যাটা! আইনের চেয়ে বড় প্রভাবশালী আর কিছু হতে পারে কী?

লেখাটি ২,৫৮১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.