চারদিকে এতো বৈপরীত্য কেন‍‍!

0

তানিয়া মোর্শেদ:

সকালে টিভিতে একটি অনুষ্ঠানের শেষ অংশ দেখলাম। যুক্তরাষ্ট্রের ২৩.৬% পরিবারে বাবার ভূমিকা নেই, অনুপস্থিত। কী বিশাল সংখ্যক সন্তান বেড়ে উঠছে বাবার কোনো ভূমিকা ছাড়া! অনুষ্ঠানটিতে দেখালো এক প্রিচার, সম্ভবত কোন ইয়ুথ সেন্টারে, কিশোরদের মেন্টর হিসাবে কী পজেটিভ ভূমিকা রাখছেন! ছেলেগুলো সেই মানুষটিকে সারপ্রাইজ ফাদার্স ডে উদযাপন করে ধন্যবাদ জানাচ্ছে!

মানুষটি নিজেও ততো বয়স্ক নন। তিনি এবং ছেলেগুলো সবাই ব্ল্যাক। অন্য বর্ণের থেকে ব্ল্যাক পুরুষদের মধ্যে বেশী দেখা যায় সন্তানের বা পরিবারের কোন দায়িত্ব না নিতে। এর পেছনে অনেক কারণ আছে। কিন্তু বর্তমানে ব্যাপারটি মুরগী আগে না ডিম আগে এই সাইকেলে ঘুরছে! কবে ভাংগবে এই চক্র?! দেখে মন খারাপের সাথে সাথে ভালো লাগলো, সেই ব্যক্তিটিও একজন পুরুষ। তিনি এই ছেলেগুলোর জীবনে পজেটিভ ভূমিকা রাখছেন।

তারপরে চ্যানেল বদলে বাংলাদেশের চ্যানেলে দেখলাম খবরে দেখাচ্ছে ভীষণ প্রতিকূলতা ভেংগে তিন কিশোরীর এবারের এসএসসি’তে এ+ ফলাফল। একজনের নাম বিউটি। দু’হাত নেই, পা দিয়ে কী সুন্দর লেখে! আরেকজন অল্প বয়সে ঠিক করা বিয়ে ভেঙ্গেছে (সম্ভবত)। এই মেয়েগুলো প্রত্যেকেই গ্রামের এবং অর্থনৈতিকভাবে অস্বচ্ছল পরিবারের। এদের কথা এবং সেই ব্ল্যাক ছেলেগুলোর কথা ভাবছি এবং একই সাথে সমাজের-পৃথিবীর বৈপরীত্যের কথা ভাবছি। সব সময়ই ভাবি।

এই দু’দেশেই এবং পৃথিবীর সব প্রান্তেই কতটা বৈপরীত্য দেখা যায়! একদিকে সন্তানের প্রতিটি বিষয়ে কী পরিমাণে নিবেদিত প্রাণ মা-বাবা আবার কারো কারো বাবা বা ক্ষেত্র বিশেষে মা থেকেও নেই! একদিকে প্রাচুর্য্যের শেষ নেই, অন্যদিকে প্রায় কিছুই নেই! তারপরেও কতটা উৎসাহী তারা! দু’দিন ধরে এ+ পাবার খবরে ফেসবুকের নিউজফিড ভরে ছিল। সবাই প্রশংসা পাবার যোগ্য।

কিন্তু সত্যি বলতে আমি এদের খবরে যতটা খুশী হই, তার থেকে হাজার গুণে খুশী হই একজন সুবিধা বঞ্চিতের সাফল্যে। এ সাফল্য এ+ বলে নয়, বা এ+ এ নয়। এ+ নিয়ে অনেক কথা বলা হয় এবং যায়। আমি সেসবে যাবো না। আমি মুগ্ধ হই এটা দেখে যে, যাদের পড়ালেখা না করার ১০১ টি কারণ আছে, তারা পড়ছে! স্বপ্ন দেখছে! এরকম আরও অনেকেই আছে। সবাই তো আর এ+ পায় না। খবরেও আসে না। এ বিষয়ে খবরে আসে শুধু এ+ পাওয়ারা।

মানুষের যুদ্ধ করার, স্বপ্ন দেখার, চেষ্টা করার গল্পগুলো খুব কমই অন্যরা জানতে পারে। কেবলমাত্র সফল মানুষের গল্পই প্রকাশিত হয়। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চেষ্টা করাটাই, টিকে থাকাটাই সফলতা! মাঝে মাঝে এসব গল্পগুলো যদি প্রকাশিত হতো! তাহলে আরও অনেকেই উৎসাহী হতো।

রত্নগর্ভা মা বলে বাংলাদেশে একটি পুরস্কার চালু আছে। আমি কোনো ধরনের তুলনায়ই বিশ্বাসী নই। যে মা প্রচণ্ড প্রতিকূলতায় সন্তান বড় করছেন, আর যে মা আপাত কোনো প্রতিকূলতার মধ্যে নেই, তাদের কীভাবে একই পাল্লায় মাপা যায়? যে বস্তিবাসী মা মানুষের গৃহে কাজ করে বাচ্চাকে দু’মুঠো খাওয়াচ্ছেন, তার সন্তান যদি স্কুলের কয়েক ক্লাসও পড়ে, পরীক্ষায় মোটামুটিও করে; তিনিই রত্নগর্ভা। এমনকি মধ্যবিত্ত পরিবারেও সব পরিবারের দৃশ্য এক নয়। কোন কোন পরিবারের পুরো ফোকাস থাকে সন্তানের পড়ালেখায়। অন্য পরিবারে বিভিন্ন কারণে তা নয়। সেখানেই বা তুলনা কি এক পাল্লায় চলে? 

প্রবাস জীবন চব্বিশ+ বৎসরের। এসময়ে পুরো পৃথিবী বিশাল এক জাম্প করেছে। বাংলাদেশও, স্বাভাবিক ভাবেই। অনেক অনেক মানুষের জীবন অর্থনৈতিকভাবে অনেক উন্নত এখন। এখন বাংলাদেশেই অনেক মানুষ অনেক ভোগ বিলাসে সমর্থ। ডিজাইনার ব্র্যান্ডের জুতা, ব্যাগ, পারফিউম, মেইক আপ থেকে শুরু করে গাড়ীও ব্যবহার করতে পারেন। বিশাল বিশাল শপিং মল অসংখ্য। অত্যাধুনিক অ্যাপার্টমেন্ট অনেকের। অসংখ্য ফ্লাই ওভার ঢাকা শহরে। অথচ এখনও হাওরে বন্যায় মানুষ সর্বস্বান্ত হয়! পাহাড়ে আদিবাসী মানুষ না খেয়ে থাকে!

ঠিক যেমন পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তে প্রচণ্ড বিত্তবানদের ভোগ বিলাসী জীবন আর আফ্রিকার দুর্ভিক্ষের মানুষের শূন্য থালা! এতো বৈপরীত্য কেন!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 95
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    95
    Shares

লেখাটি ৮২২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.