পারিবারিক নির্যাতন বনাম নারীর সচেতনতা

0

জিন্নাতুন নেছা:

সাংবাদিক ইবতিসাম নাসিম মৌ পারিবারিকভাবে নির্যাতিত হয়েছেন। তার নির্যাতনের ঘটনা খুব মর্মান্তিক এবং তা মিডিয়ার সামনে এসেছে, লোক জানাজানি হয়েছে। অবশ্যই তা প্রশংসার দাবিদার এবং উল্লেখ্যোগ্য দৃষ্টান্ত নারীকুলের জন্য।

কিন্তু এর দ্বারা কি বোঝা যাচ্ছে পারিবারিক নির্যাতনের মাত্রা খুব বেড়ে গেছে? ব্যাপারটা কি এমন যে কিছু উচ্চ শিক্ষিত শ্রেণীর নির্যাতনের ঘটনা মিডিয়ার সামনে এসেছে, তাই মনে হলো এর দ্বারা নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যাওয়া পরিমাপ করা যায়? আমার কাছে কিন্তু এটি মনে হচ্ছে না। বরং মনে হচ্ছে নারীদের মাঝে সচেতনতা বেড়েছে, নারীদের মাঝে আত্মসম্মানবোধ বেড়েছে, তাই আজ এসব ঘটনা সামনে আসছে। নারী বুঝেছে, মুখ বুঁজে সহ্য করার দিন শেষ, তাই নারী আজ প্রতিবাদ করছে। নারী বুঝেছে আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়।তাই নারী প্রতিবাদ করছে।

আমি ২০১৬ এর মাঝামাঝি সময়ে ব্লাস্ট এর হয়ে পারিবারিক সহিংসতা আইন-২০১০নিয়ে একটি গবেষণা কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম।সেখানে ব্লাস্টে অভিযোগ করেছে, মামলা শেষ হয়েছে বা প্রক্রিয়াধীন এমন অনেক কেইস নিয়ে পর্যালোচনার সৌভাগ্য হয়েছিলো। এমন অনেক কেইস পেয়েছি যারা উচ্চশিক্ষিত, কর্মজীবী এবং খুব উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যারা এখানে অভিযোগ করেছেন। এমনকি তাদের এই মামলার সমাপ্তি হয়েছে ব্লাস্টের সহযোগিতায়। কিন্তু তারা এই শর্ত দিয়ে মামলা করেছিলেন যে, এটি যেন হাইড থাকে কেউ যেন না জানে।

আমি বুঝতে পারিনি কেন তারা এমনটি করেছিলো? সম্মানের ভয়? কিন্তু কেন? কেউ পারিবারিকভাবে নির্যাতিত হয়েছেন আর তা যদি লোকজন জেনে যায় তাহলে তার সম্মান কমে যাবে? নারীর সম্মান কি পারিবারিক নির্যাতন দ্বারা পরিমাপ করা যায়? বিষয়টি আমার বোধগম্য না। কাজটি করতে গিয়ে আরেকটি বিষয় আমাকে ভাবিয়েছিলো, পারিবারিক নির্যাতনের ধরণ ভিন্ন ভিন্ন। একজন গ্রাম্য নারীর কাছে তার স্বামী দু-একটি চড়-থাপ্পর মারলে তা নির্যাতন বলে গণ্য হয় না। তারা ভাবে স্বামী তো মারতেই পারে। আবার শ্বাশুড়ি একটু গালি দিলে ভাবে না শাশুড়ি তো মায়ের মতো, একটু বকাঝকা করতেই পারে।

কিন্তু আমি সেসময় দেখেছি একজন শহুরে পড়ালেখা জানা চাকুরীজীবী নারী, যার স্বামী তার মোবাইল প্রতিদিন চেক করতো যাকে তিনি ভাবছেন পারিবারিক নির্যাতন হিসেবে। বিষয়টি খুব ভাবিয়েছিলো আমাকে, তাহলে কোনটি পারিবারিক নির্যাতন হবে তা নারী বা যে নির্যাতিত হচ্ছেন তার দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভর করছে!! নাকি বলবো যে, নারী অনেক সচেতন হয়েছে খুব সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম বিষয় তাকে ভাবাচ্ছে!

আমি বলবো আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীর জন্য কিছু প্রথা তৈরি করে রেখেছে, যা নারী ভাঙতে পারছেন না। প্রচলিত প্রথা হলো “সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে।” তাই সংসারের সব দায়ভার যেন নারীর একার। নারী সব কিছু সহ্য করে সংসার টিকিয়ে রাখবে তাহলে সে গুণী। কিন্তু সে যদি কোন প্রতিবাদ করে তাহলে সে খারাপ হয়ে যায়। এই গণ্ডি থেকে নারীকে বের হয়ে আসতে হবে।

এক গবেষণা কাজে রেফা নামের একজন নারীর সাথে কথা হচ্ছিলো। একপর্যায়ে বললো যে, “আপা আমার স্বামী একজন মেয়ের সাথে পরকীয়া করে। যে মেয়েটির সাথে পরকীয়া করে তার বাড়ি একই গ্রামে। আমি আমার স্বামী এবং ঐ মেয়ের সাথে কথা বলেছি। মেয়েটি আমাকে বলে, তুমি কেমন বউ তোমার স্বামীকে ধরে রাখতে পারো না, অন্য মেয়ের কাছে আসে কেন?” আমি খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলাম স্বামী পরকীয়া করবে, তার দায়ভারও বউয়ের। আর কী কী দায়ভার নারীর কেউ কী বলতে পারেন?

আজ ট্রেনিং করছিলাম জনৈক ডাক্তার বলছিলেন, প্রতিটি পুরুষের উচিত নারীকে সম্মান করা। কারণ নারী বাইরে কাজ করছে, ঘরে কাজ করছে, সন্তান লালন-পালন করছে, আবার স্বামীর পরিবার ও স্ত্রীর পরিবারের মাঝে সেতুবন্ধন তৈরি করছে। ‘নারীকে সম্মান করুন’ কথাটি ভালো লাগলেও সম্মানের কারণ আমি ভালো লাগাতে পারিনি। আমার মনে হচ্ছিলো এসব দায়িত্ব নারীর একার না। এসব দায়িত্ব পরিবারের সবার। নারীকে সম্মান করতে হলে একজন মানুষ হিসেবে সম্মান করুন ।কিছু কাজকে নারীর জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়ে নারীকে সম্মান দেখানো থেকে বিরত থাকুন।

বেসরকারি সংগঠন ব্র‍্যাকের একটি প্রোগ্রাম GQAL এর ইভাল্যুয়েশন এর কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। যেখানে দেখেছিলাম প্রতিটি পরিবারে নারী কোন না কোনভাবে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। কই এসব নারীর ঘটনা তো মিডিয়ায় আসছে না? তাহলে কি বলবো নারী নির্যাতন হচ্ছে না, নাই? কেবল শহুরে শিক্ষিত নারীর পারিবারিক নির্যাতনের ঘটনা মিডিয়ার সামনে উন্মোচিত হলেই কি আমরা বলবো নারী নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে গেছে ব্যাপারটি এমন এটি মানতে আমি নারাজ।

আমার অভিজ্ঞতা বলে প্রতিটি পরিবারে পারিবারিক নির্যাতন আছে অতি নীরবে। নারী সুযোগ পাইলে এর প্রতিবাদ করে নয়তো নীরবে মেনে নেয়। আর তা যখন চরম পর্যায়ে যায় তখন তা মিডিয়ার সামনে আসে। আবার এটি অনেকটা নির্যাতিত ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি এর উপর নির্ভরশীল তো বটেই।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 233
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    233
    Shares

লেখাটি ১,১২০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.