হিজল আর হিজাবের গল্প

0
সাবিনা শারমিন:
অনেকদিন পর আজ ছুটির দিনে ভোরবেলায় হাঁটতে বের হয়েছিলাম। সকালে হাঁটার সময় বেশিরভাগ সময়ই আমার ধ্যানে থাকে আমার শৈশবে বরিশালের নানাবাড়ির কাঠের দোচালা ঘরটি। দোচালা ঘর হচ্ছে টিনের একতলা বাড়ীতে, উপরে কাঠের পাটাতনে অর্ধেক আয়তনের স্পেস। যেখানে শুধু নুয়ে ঝুঁকে থেকে রাতে শোয়া যায় কিন্তু দাঁড়ানো যায় না। সেই ঘরটির জানালা বরাবর উপরে উঠে গিয়েছিল একটি কদম ফুলের গাছ। বাড়ীর উঠোনের একটু দূরে সামনে বাঁকা হয়ে নুয়ে পড়া একটি বড়ই গাছ যা চিরকাল শুয়ে থেকেই ফল দিতো। পূর্বদিকে আছিয়া খালার ঘরের সামনে ছিলো জামরুল চালতা, আম আর নারকেল গাছ। কাঠের পাটাতনের মূল ঘরটির সাথে লাগোয়া ছিলো কাঁচা মাটিতে লেপা একটি পৃথক ছোট ঘর।
সেখানে কাপড় বিছিয়ে ফ্লোরে সকালে আমরা নাস্তা খেতাম নারকে্ল পোড়া মরিচের পান্তা ভাত। ঘরটির এক কোনায় একটি ঢেঁকি। উঠোনে ছিলো মাটির দুই সেট তিন মুখো চুলো । সে চুলোয় শীতের সন্ধায় হাসের মাংস, রুটি, পিঠা চলতো মহাউৎসবে । দুপুরে ভাত খাবার আগে এপিটাইজার হিসেবে চাল ভাজা চিবানো, হাঁটু জলে নেমে তিন কোনা চায়ের ছাকুনী মতো হাতে ধরা জাল দিয়ে ছোট মাছ ধরা, মাঝখানে গোল করে ফাকাঁ করা ঝিনুক দিয়ে কাচা আম ঘষে ঘষে কেটে খাওয়া, সুপারি গাছের ঝড়ে পড়া ডাল দিয়ে টেনে ছেচড়ে গাড়ী বানিয়ে খেলা, এইসব এক ব্যাগ স্মৃতির মুখ খুলে তা রোমন্থন করার একটি উপযুক্ত সময়ই হচ্ছে ভোরের এই হাঁটার সময়টি ।
ভোরবেলা হাঁটতে যাবার অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে এক ঢিলে দুই পাখী মারা। আহ! কী নিষ্ঠুর বাগধারা! পাখীদের নিয়ে এভাবে বললাম? নিজের কাছে নিজেই ছোট হয়ে গেলাম! আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে আকর্ষণীয়, মায়াময় বিষয় হচ্ছে শিশু, পাখী ,মাছ , হাঁস-মুরগীর বাচ্চা ,বৃষ্টি আর ব্যাঙ। এদেরকে মেরে ফেলে, ক্ষতি করে তার মাংস খাওয়া আমার কাছে ভীষণ নির্মমতা!
আমার বয়স খুব সম্ভবত আট কি নয় হবে। মনে পড়ে ,নানাবাড়িতে পুকুর ঘাটের পাশে খুব ছোট একটি কাঠঠোকরা পাখী কোথা থেকে উড়ে এসে ধপাস করে সবুজ ঘাসের উপর পড়ে গেলো। কাছে গিয়ে দেখি সে আর নড়ে না। আমি আস্তে আস্তে পা টিপে টিপে তার কাছে গেলাম! তাও দেখি সে নড়ে না। খুব মন খারাপ হয়ে গেলো। তার ছোট বুকটাতে হৃদস্পন্দন আছে কিনা দেখার জন্য আমার ছোট দু’হাতে তার দেহটি তুলে নিলাম। হাতে তুলতেই যখন তার পালক গুলো ছড়িয়ে গেলো, তখন মনে হয়েছিলো জীবনে প্রথম পৃথিবীর সব রঙ একসাথে ঐ মাছরাঙ্গার পালকের মধ্যে দেখতে পাচ্ছিলাম। অদ্ভুত স্বর্গীয় অনুভুতি ! আমি তাকে আস্তে আস্তে বেড়ালের পা টিপে চলার ভঙ্গিতে পুকুরের ঘাটে সিঁড়িতে নিয়ে গেলাম।
এক হাতে পাখী আর আরেক হাতে পানি। অনেক কায়দা করে তার বন্ধ মুখটিতে আমার নখ দিয়ে খুঁচিয়ে কোনভাবে যেই এক ফোঁটা পানি দিলাম ,মুহূর্তেই সেই পানির তেষ্টা মিটিয়ে আমাকে অপ্রস্তুত করে দিয়ে আঙুলের ফাঁকা দিয়ে ফুড়ুৎ। এখনো সেই নিষ্ঠুর পাখীর কথা আমি ভুলতে পারি না। যে আমাকে মুগ্ধতা দিয়েছিলো, রঙ চিনিয়েছিলো সেই পাখীটিকে আজো আমি ভীষণ মিস করি। তাই আহত পাখী চোখে পড়লে এখনো চোখ ভিজে যায় ।
হাঁটছিলাম হাতির ঝিলে। রাস্তার পাশে সারি সারি অসাধারণ বিরল মনোহরী গাছ। ঝিলের খানিকটা নিচু ঢালে অনেক হিজল ফুল পথের ধারে পরে থাকে। ইচ্ছে ছিলো সেই ঝড়ে পড়া হিজল কুড়িয়ে বাসায় নিয়ে আসবো। ছোটবেলায় নানাবাড়িতে যেভাবে দলবেঁধে হিজল- বকুল কুড়াতাম। খুব সম্ভবত হিজল ফুল এ সময়ের অনেক মানুষই চিনবেন না। এই গাছগুলো পানির ধারে কাছে ঝুঁকে থাকে। আমার নানাবাড়ি বরিশালে ঝিল আর খালের পাড়ে এই ফুল গাছগুলো সারি সারি ভাবে লাইন ধরে ফুল ফোটাতো আর ঝরাতো। সেই ফুল পানির উপর টুপ-টাপ , টুপ-টাপ করে ঝরে ঝড়ে পড়তো। আর পানির উপর গোলাপী-লাল রঙ মেশানো হিজল ফুলের সেই ঝড়ে পরার শব্দ আর ঢেউগুলো দুলে দুলে যেনো কোন এক অচীন রাজ্যে নিয়ে যেতো!
কেমন এক অলৌকিক মায়ার জালে, টুপ- টাপ ঝড়ে পরার তরঙ্গ দোলায় আমি যখন আবেগাপ্লুত,ঠিক তখনি আমার মোহ ভঙ্গ হয় এক মাতৃসম বয়োজ্যেষ্ঠ নারীর কর্কশ ধমকে।
”এইযে, এইযে আপনি কি খ্রিস্টান? কথা শোনেন না? আপনি কি হিন্দু, না খ্রিস্টান?” সজোরে চিৎকার করে আনুমানিক সাতষট্টি আটষট্টি বছর বয়সের পাকিস্থানী ফ্যাশনের সেলোয়ার কামিজ পরা এক ভদ্রমহিলা আমাকে পথ রোধ করে দাঁড়ালেন ।
তিনি বললেন ”দাঁড়ান। যাবেন না ”। আমি বললাম ”জী আন্টি আমাকে কিছু বলছেন? ” তিনি আবারো বললেন, ” আপনি কি হিন্দু না খ্রিস্টান? ” উত্তর দেয়ার আগেই তিনি আমাকে উপুর্যপরি কন্ঠের ভলিউম বাড়িয়ে দিয়ে বললেন ”তাহলে আর কাকে বলবো, আপনাকেই বলছি , জবাব দেন। হিজাব কই হিজাব? ”
আমি তখন আর চুপ করে না থেকে উত্তর না দিয়ে পালটা প্রশ্ন করলাম । ”কেনো বলুন তো? আমি হিন্দু কি খ্রিস্টান ,হিজাব নেই কেন সে কথা জেনে আপনি কি করবেন? তাছাড়া যা দেখে আপনি নিজে বুঝতে পারছেন না তাতো না জানাই ভালো তাইনা? পথচারীকে পথরোধ করে ধর্ম জানতে চাওয়ার অধিকার আপনার কি আছে আন্টি? এটি শিষ্টাচার বহির্ভূত আচরণ। আপনি মাতৃসম বয়োজ্যেষ্ঠ নারী। কিন্তু সাধারণ শিষ্টাচার জানেন না দেখে যারপর নেই দুঃখ লাগছে। তাছাড়া আমি যে ধর্মের মানুষই হই না কেনো ,আপনি আমার পরিচিত নন। একজন অপরিচিত মানুষকে রাস্তায় থামিয়ে তাঁর ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে জবাব দিহিতা চাওয়া এক ধরনের অনধিকার চর্চা। সে যাই হোক, আপনি কি বলতে পারবেন কোন সুরায় নারীদের হিজাব পালনের কথা নির্দেশ করা আছে ?”
আমার প্রশ্ন শুনে এবার ভদ্রমহিলার মুখে যেন জোকের মুখে চুন পরে গেল। আমি ধৈর্য নিয়ে বললাম ”এই দেশটি শুধু একটি ধর্মের মানুষের নয় আন্টি! এই দেশটি হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ , খ্রিস্টান, ধর্মহীন সকলের। ” তাকে বললাম “আন্টি আপনাদের ভুল আচরণ আর শিক্ষা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে”। মানুষের প্রয়োজনেই ধর্ম । ধর্মের প্রয়োজনে মানুষ নয়। আর পোশাক দিয়ে বিশ্বাসের বিচার না করে সৎ চিন্তা আর ভালোবাসা দিয়ে বিশ্বাস অর্জন অনেক বেশী সহজ।

লেখাটি ৩,১৭৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.