শাস্তির ভয়ে নয়, মন থেকে ধর্ষণকে ঘৃণা করতে শিখুন

0
মালবিকা লাবণি শীলা:
বেশির ভাগ ধর্ষক পার পেয়ে যাবার মূল কারণ হচ্ছে, কেউ সাক্ষী রেখে এই অপরাধটি করে না। ধর্ষকের সহযোগী যদি কেউ থাকে প্রায় সময়ে সে-ও ধর্ষণে লিপ্ত হয়। যদি মেয়েটি ওদের দেখে ফেলে সেক্ষেত্রে ভিকটিমকে হত্যা পর্যন্ত গড়ায়। বেঁচে ফিরলেও ফিজিক্যাল এভিডেন্স রক্ষা করে মেডিক্যাল রিপোর্ট পাওয়ার জন্যে যেসব বিষয়ে জোর দেয়া উচিত, সেগুলো অনেকেই সংরক্ষণ করে না। যে জন্যে অপরাধীকে ধরা আর সম্ভব হয় না। ধরলেও নানান অজুহাতে পার পেয়ে যায় ধর্ষক।
ধর্ষণ হচ্ছে (বাংলাদেশের পিনাল কোড ১৮৬০, সেকশন ৩৭৫, ২০০০ সাল অনুযায়ী) যখন কোনো পুরুষ কোনো নারী অথবা চৌদ্দ বছরের কম বয়েসি শিশুর ইচ্ছের বিরুদ্ধে, ভয় দেখিয়ে, মিথ্যে বলে, অথবা জোর করে প্রবিষ্ট হয়। এর মধ্যে আরো ঘটনা আছে, স্ত্রীর বয়েস তেরোর কম না হলে স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ গ্রাহ্য হবেনা।
শাস্তি হিসেবে দেয়া আছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, স্ত্রী তেরো বছরের নীচে হলে (সেকশন ৩৭৬) স্বামীর দুই বছরের কারাদণ্ড এবং জরিমানা।
২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন পত্রিকা ও মামলার তথ্যানুযায়ী ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৫৫ জন, এর মধ্যে শিশু ১৩৫ জন যাদের মধ্যে ছয় বছরের নিচে ২৩ জন। (সিলেটভিউ২৪.কম)
একই বছর মহিলা পরিষদের মতে ছয় মাসে ধর্ষণের সংখ্যা ৪৩১ জন।
দুঃখজনক হলেও আমি নিশ্চিত প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। ধর্ষণের মামলা করা সহজ বিষয় নয়। কারণ,
১) প্রায় সময় ধর্ষক হয় এলাকার প্রভাবশালী অথবা বিত্তবান লোক। তার বিরুদ্ধতা করার সাহস অনেকেরই হবে না।
২) অজ্ঞতাবশত শারীরিক আলামত নষ্ট করে ফেলে অনেকেই, গোসলের মাধ্যমে অথবা কাপড় পাল্টে ধুয়ে ফেলে। ধর্ষণের বিরুদ্ধে মামলায় ফিজিক্যাল এভিডেন্স থাকাটা অত্যন্ত জরুরি।
৩) সামাজিকভাবে হেয় হবার আশঙ্কা, আমাদের মধ্যে অনেকেই ধর্ষিতাকে দায়ী করে নানাবিধ কথাবার্তা বলে থাকে, কাপড়চোপড় উস্কানিমূলক, রাতে ঘরে ফেরা, ছেলেদের সাথে মেশা.. ইত্যাদি ইত্যাদি।
৪) মামলা করতে গিয়ে হয়রানি, উপযুক্ত সাক্ষী প্রমাণের অভাবে কর্তব্যরত পুলিশ  কেইসটি গ্রহণ না-ও করতে পারে। গৃহীত হলেও ভিকটিমের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করতে হবে।
৫) ধর্ষক আর ধর্ষিতের নিজেদের মধ্যে টাকাপয়সা অথবা অন্যভাবে মীমাংসা হয়ে যাওয়া।
এরকম আরো অনেক কারণ আছে। মামলা কোর্টে উঠলে লোকজনের সামনে সেই বেদনাদায়ক ঘটনার পুনরাবৃত্তি, বিবাদী পক্ষের কৌঁসুলির কথার মোকাবিলা করার মতো মনের জোর অনেকেরই থাকে না।
এই ভয়ংকর বিষয়টি এড়াতে আমাদের প্রত্যেককেই সচেতন হতে হবে।  সবার আগে দরকার উপযুক্ত শিক্ষার। আশাপাশের মানুষকে হতে হবে সহানুভূতিশীল, সংবেদনশীল। শিক্ষা অথবা কর্মক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি, সাথে নারীকে চলতে হচ্ছে, পেশাগত কারণে যে কারো ঘরে ফিরতে দেরি হতেই পারে, হায়েনারা অপেক্ষায় আছে এই ভয়ে কি ঘর থেকে মেয়েরা বের হবেনা? আর পোশাকের কথা যে বলা হয়, বিশ্বের অনেক দেশেই মেয়েরা বিকিনি পরে সমুদ্রের ধারে নিশ্চিন্তে সারাদিন সানবাথ করছে, কই সেখানে ওদের ওপর তো কেউ ঝাঁপিয়ে পড়ছেনা!
আমাদের প্রথমে দরকার যুগোপযোগী শিক্ষা, যার শুরু হবে পরিবার থেকে, স্কুলে উপযুক্ত শিক্ষা দেয়া হবে, গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে মিটিং, সভা, রেডিও, টিভিতে শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হবে, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ এগুলো রোধ করতে হবে, চাইল্ড পর্নোগ্রাফির প্রচার, সংরক্ষণ নিষিদ্ধ করতে হবে। এগুলোর মূল লক্ষ্যই হবে, মানুষ যেন শাস্তির ভয়ে নয়, নিজের বিচার বিবেচনা থেকেই ধর্ষণকে ঘৃণা করতে শেখে।

লেখাটি ৬৪১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.