রাষ্ট্রের প্রশ্রয়ে বাড়ছে ধর্ষণ!

0

প্রান্ত পলাশ:

স্বামী কারাগারে, তাকে জামিনে ছাড়িয়ে আনার আশ্বাস দিয়ে স্ত্রীকে বাড়িতে ডেকে ধর্ষণ করেছে নারায়ণগঞ্জের একদল পুরুষ। বড় দুঃখের দিনে মেয়েটির দুঃখমোচন করায়পুরুষকৃত ওই কর্মের জন্য রাষ্ট্র ওই পুরুষদের পুরস্কৃত করতে পারে! যেহেতু মেয়েটি গরিব, তাই তাকে একহাজার টাকা করুণা ক’রে দেওয়া যায়! স্বামী জেলহাজত থেকে ফিরলে তিনিই হয়তো স্ত্রীটিকে আরও বড় পুরস্কার দেবেন। চুলের মুঠি ধরে বলবেন, ‘আমারে ছাড়ানোর লিগা এত উইঠা পইড়া লাগছিলি ক্যান মাগী?’

এদিকে রাজধানীর বনানীর বিলাসবহুল হোটেল ‘দ্য রেইন ট্রি’-তে জন্মদিনের পার্টিতে আমন্ত্রণ ক’রে নিয়ে দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে ধর্ষণ করেছে আর একদল পুরুষ। অবশ্য এ পুরুষেরা উচ্চফলনশীল জাতের, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও মেয়েটির বন্ধু। তারাই অস্ত্রের মুখে জিম্মি ক’রে ধর্ষণ করেছে। শুধু ধর্ষণই করেনি, রাতভর মারধর করেছে। হত্যার ভয় দেখিয়েছে। উচ্চফলনশীল জাতের এ পুরুষেরা এসব করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা ধর্ষণের ভিডিও ধারণও করেছে। পুলিশ-র‌্যাবকে জানালে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দিয়েছে।

দুটি ‘ঘটনায়’ ধর্ষণের ক্ষেত্রে অশিক্ষিত-শিক্ষিত সবাই যে একজোট, একই চরিত্রের, তা থেকে আমরা কী বুঝলাম? উত্তর একটাই, সব পুরুষ এক না!

কিছুদিন আগেই আমরা এক ভয়াবহ দৃশ্যের মুখোমুখি হয়েছিলাম। গাজিপুরে রেললাইনের পাশে পড়ে থাকা মেয়ে-বাবার লাশ দেখে আমাদের চোখে জল এসেছিল। কেন ১০ বছরের মেয়েশিশু আয়েশা ও তার বাবা আত্মহত্যা করেছিলেন? বিচার না পেয়ে। বাবা হযরত আলী প্রথমে স্থানীয় ইউপি সদস্যের কাছে বিচার চান, কিন্তু পান না। এরপর বাবা থানায় জিডিও করেন। কিন্তু পুলিশ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। বরং তাকে আরও নির্যাতনের শিকার হ’তে হয়। তার তিন বিঘা জমির ওপর লোভ ওই ইউপি মেম্বারের। সম্বল গরুটিও ‘চুরি’ করে নিয়ে যায় কে বা কারা। বাড়ি ছেড়ে যেতেও হুমকি পেতে হয় দিনরাত। তো কী করবেন তিনি! আমরা সবাই মিলে কি তাদেরকে আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করিনি?

দলবদ্ধ কর্ম-কুকর্ম খুব জনপ্রিয় এদেশে। আমাদের সরকার-বিরোধী দল সবাই দলবদ্ধ। কেউ ১৪ দল তো কেউ ২০ দল। আগ বাড়িয়ে কিছু আগাছাও প্রেস ব্রিফিং ক’রে বলে, ‘আমরা৩০-৩১ দল নিয়ে আইতাছি।’ ইসলামিরাও পিছিয়ে নেই, তারাও নানা দলবদ্ধ। এত এত দল, কিন্তু সবাই দলবদ্ধ হয়ে কখনও ধর্ষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেনি। হয়ত এদলবদ্ধরাও দলবদ্ধ ধর্ষণ এনজয় করে, খবর দেখে লালা ঝরায়!

সুপ্রিম কোর্টের সামনে স্থাপিত এক ভাস্কর্য নিয়ে বেশ কিছুদিন হইহুল্লোড় পড়েছিল এ দেশে। যেন দেশে আর কোনো সমস্যা নেই। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ওই ভাস্কর্য সরানোর পক্ষে বলেছেন। শুধু তাই-ই নয়, যে লোকটি নারীকে ‘তেঁতুল’ ব’লে জিভে জল আসার মতো জঘন্য কথা বলেছিলেন, সেই ‘কুখ্যাত’ হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ আহমদ শফীকে গণভবনে নেমন্তন্ন করে ডেকে প্রধানমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, ভাস্কর্য সরাতে হবে। নারীকে ‘তেঁতুল’ বলা বুড়োটি যদি গণভবনে যাবার ‍সুযোগ পান, আর প্রধানমন্ত্রী নিজেই যদি নারী হোন, তা হলে এ লজ্জা আমরা কোথায় রাখি! এতে কি ধর্ষকদের রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রশ্রয় দেয়া হয় না? বিচারহীনতার সুযোগে রাষ্ট্রের প্রশ্রয়েই কি ধর্ষণ বাড়ছে না?

এই লেখাটা লিখতে না লিখতেই আরও একটি খবর: ঠাকুরগাঁও-এ মসজিদের ভেতরে কিশোরীকে ইমামের ধর্ষণ, হুজুরের নাম সাদ্দাম হোসেন। তো, মাহমুদা খাঁ নামে একজন ফেসবুকে লিখেছেন খবরটা শেয়ার করে যে, “আল্লাহতালার ঘরে হুজুর এই কুকাম করলো, অথচ আল্লাহতালা রক্ষা কেন করলেন না একটা মেয়ের ইজ্জত! ছোটবেলায় যখন মসজিদে যেতাম তখন শুনেছিলাম আল্লাহ্‌র ঘরে অন্যায় হয় না, কেউ করলে তার ওপর গজব পড়ে। তো, হুজুরে ধর্ষণ করলো সেটা কি গজবি কাজ নয়! উনি কি কেবল তামাশা দেখার জন্যই জাগ্রত? প্রতিবাদে নয় কেন!!

প্রতিদিন খবরের কাগজে এ ভয়াবহ-জঘণ্য ‘সংবাদ’ পড়তে পড়তে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। বিচার চাইতে চাইতে ওই আত্মহত্যাকারী বাবা হযরত আলীর মতো ক্লান্ত। তাই আর বিচার চাইছি না। জেনেছি, বিচার শব্দটি থেকে বহু আগেই ‘র’ বর্ণটি কেটে গেছে। এখন ‘বিচা’ ছাড়া আর কিছু নেই!

লেখক : কবি ও সাংবাদিক

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.4K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.4K
    Shares

লেখাটি ২,৬২২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.