সন্তানের আকাঙ্খা বনাম পীর-ফকির এবং স্পার্মের ব্যবহার

0

শিল্পী জলি:

সেদিন পড়লাম, একটি মেয়েকে কেউ একজন জিজ্ঞেস করেছেন, তোমার বাচ্চা নেই….মানুষের বাচ্চা না থাকলে সেই জীবন আনন্দহীন, কোন সুখ নেই……অতএব…। মেয়েটি চরম আপসেট। লিখেছেন, ‘শিক্ষার অভাব, রুচির অভাব, ক্লাসের অভাব….প্রজ্ঞার অভাব।’

কারও বাচ্চা না হলে যারা বাচ্চা নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন করেন এবং এটা-ওটা বলেন, বেশীরভাগই আঘাত করার উদ্দেশ্যে নয়। তাই বিষয়টি পজেটিভ ওয়েতে নিয়ে সহজভাবে কথা বলার ক্ষমতা অর্জন করতে পারলে এতে লাভ ছাড়া ক্ষতির সম্ভাবনা নেই। বরং এতে নানাবিধ তথ্যের সরবরাহ ঘটে।

কোনো দম্পতির চেয়ে বাচ্চা না হলে জীবনে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এটি একটি কষ্টকর অভিজ্ঞতা, কিন্তু কোনো লজ্জা বা অপমানজনক ঘটনা নয়। তাই সময় নিয়ে নিজেকে সেভাবে তৈরি করে বিষয়টিকে মেনে নিতে শেখা জরুরি। সেইসাথে কোন গ্রহণযোগ্য অপশন বাদ থাকলে সেটা চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে যেন কোনদিন মনে না হয় ঐ চেষ্টাটি করলে হয়তো কাজ হতো।

তারপরও যদি কোনো ফল না আসে তাহলে চাওয়াটিকে এক সময় ছেড়ে দিতে হয়। ঠিক যেমন করে কোলের শিশুটিকে দিনে দিনে একটু একটু করে বাবা-মা বিশ্বের দরবারে ছেড়ে দেন। কিছুদিন আগে এলাকার এক আপা তার সাথীদেরকে সামনে এগুতে বলে আমাকে অন্ধকারে একপাশে টেনে নিয়ে গিয়ে বললেন, তোমার সাথে আমার ভীষণ জরুরি একটি কথা আছে। ভাবলাম, কী এমন জরুরি কথা অন্ধকারে টেনে নিয়ে– হয়তো জিজ্ঞেস করবেন, কী করে বিদেশে যাওয়া যায়!

আমাকে ভুল প্রমাণিত করে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘বাচ্চা নেবে, বাচ্চা?’ বলি, কেন–বাচ্চা আছে নাকি? তাহলে তো আতিককে জিজ্ঞেস করতে হবে…আইনের ঝামেলা…। থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আরে না না…আতিককে জিজ্ঞেস করতে হবে না, শুধু তোমার পিরিয়ড হলেই হবে, আগে বলো, এখনও পিরিয়ড হয় কিনা?’ আমি হাসি। হাসি থামিয়ে দিয়ে বলেন, আমার চেনাজানা চার/পাঁচজনের ইতিমধ্যেই বাচ্চা হয়ে গিয়েছে, যাদের এতোদিন কোন কিছুতেই বাচ্চা হচ্ছিল না। আমার সাথে শুধু যাবে ব্যস, পিরিয়ড হলেই…. আমার হাসি থামে না।

ভাবী, শুধু পিরিয়ড হলেই বাচ্চা–কয় কী? আর কিছুরই দরকার নেই? এগ, স্পার্ম, শুয়ে থাকা, সেক্স, ইউটেরাস– কিছুই না? বড়ই চিন্তার বিষয়, কোথা দিয়ে কখন যে কী হয়ে যাবে….মায়েরা বুঝলেও আর বলার পথ থাকবে না। অথচ খোলাখুলি আলোচনা করতে জানলে এই দম্পতিদের কতো কীই না হতে পারতো– পরস্পরকে সহযোগিতা, বোঝার, এবং শেয়ারেরও পথ থাকতো। যাদের বাচ্চা হয় না তাদের অনেককেই সাধু, সন্ন্যাসী , পীর, ফকির, হজুরের দরবারে হানা দিতে নিয়ে যাওয়া হয়। স্বামী বা তার পরিবার রাতে বা আল্লাহর ভোরে বউকে পাঠান হুজুরের এবং হক্-মাওলা শুনতে। অতঃপর কয়েক মাসের মধ্যেই তারা ফিরে আসেন পেট ফুলিয়ে– কী করে?

তারা যদি কোনো খাবার-টাবার অন্য কারও হাত দিয়ে বউটির কাছে পৌঁছাতেন তাহলে আমার কোনো সন্দেহ থাকতো না উক্ত ব্যক্তি নারী শরীরকে কোনো খাদ্য দিয়ে হরমোনকে প্রভাবিত করেছেন– এগ রিলিজ ঘটেছে। কিন্তু নারী যদি নিজে গিয়ে হুজুরের সদয়দৃষ্টি পেয়ে কৃতকার্য হয়ে আসেন, তাহলে তার উপর L O V E বা R A P E ই বর্ষিত হয়েছে। ঐ যাত্রায় হুজুর বা তার চেলাগণ নারীকে সোহাগ বা রেপ বা অজ্ঞান করে যোনিপথে সিমেন ইনসার্ট করে প্রেগনেন্টের বীজ বপণ করেছে।

এ অবস্হায় সমাজে যদি এই বিষয়টি নিয়ে খোলাখুলি আলোচনার পরিবেশ থাকতো, তাহলে অনেক মেয়েকেই যুগ যুগ ধরে ঘোমটায় আবৃত হয়ে যেচে গিয়ে ‘রেপড’ হয়ে আসতে হতো না–তারা রেপ বা সেক্স ছাড়াই বাচ্চার মুখ দেখতে এবং পরিবারকে দেখাতে পারতেন। এমনকি তখন বাচ্চাটিও হয়তো আরও বেশি পছন্দমতো পাওয়া যেতো।

যারা পীর-ফকিরের দরবারে গিয়ে দেখিয়ে বাচ্চা পেতে সফল হোন, সেই সব মায়েদের গর্ভবতী হতে মূলত তেমন কোনো সমস্যা থাকে না। তারা শুধু স্পার্মের কাঙাল। হয়তো কোন বৈধ/ সমাজ স্বীকৃত পথে সুস্হ স্পার্মের সরবরাহ থাকে না তাদের। পীর-ফকিরগণ কথা বলে এই বিষয়টিতে পরিস্কার হয়ে ব্যবস্হা নেয় নারীর বাচ্চা ধারণের সঠিক সময়টি (Ovulation বা Fertile period ) কখন। অতঃপর যেমন করেই হোক ঐ টাইম পিরিয়ডে/সময়ে নারীর যোনিপথে স্পার্ম ঢুকিয়ে দেবার ব্যবস্হা নেয়। Fertile Period–নারীর শরীরে এগ রিলিজ (ডিম ছাড়া/ Ovulation) এবং তার আগের কয়েকদিন সময়কে ধরা হয়। এই সময় নারীর যোনিপথে পিচ্ছিল তরল (ডিমের সাদা অংশের মত) নির্গত হয়, যা স্পার্মকে পুষ্টি যোগায়, শরীরের মধ্যে ৪/৫ দিন বাঁচিয়ে রাখতে পারে, এবং সাঁতার কেটে এগের সাথে মিলিত হতে সাহায্য করে।

এই সময়টিতে মেয়েদের জরায়ুমুখ (cervix) শরীরের আরও গভীরে/ভেতরের দিকে ঢুকে যায় এবং সফট থাকে, যেনো স্পার্ম সহজে ইউটেরাসে ঢুকতে পারে। জরায়ুমুখ যোনিপথের উপরের দেয়ালে অবস্হিত। ডিম ছাড়ার / Ovulation এর পর ডিমটি ১২-২৪ ঘন্টা বাচ্চা জন্মদানের জন্যে উপযুক্ত থাকে। এই সময়ের এর মধ্যে স্পার্ম ডিমটি ভেদ করে মিলিত হতে না পারলে ঐ সাইকেলে/মাসে আর বাচ্চা হবে না। বরং ১৪ দিন পর আবার পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব হবে। পরের মাসের পিরিয়ডের শুরুর দিন থেকে ১৪ দিন বিয়োগ করলে ওভুলেশনের আনুমানিক দিনটি বের করা যায়।

যেসব দম্পতি যে কোন মূল্যে বাচ্চা পেতে হুজুর/ফকির ধরেন তারা নিজেদের মধ্যে খোলাখুলিভাবে আলোচনা করে খুঁজতে পারেন একজন সুস্হ, নিরাপদ ডোনার– ইনসেমিনেশনের ( এগ এবং স্পার্মের মিলন) জন্যে। ডোনারের মেডিকেল এবং যৌনবাহিত রোগ সম্পর্কিত চেকআপসহ, বংশ, গোত্র সব জেনে ব্যক্তিকে নিরাপদ মনে হলে স্পার্ম চেয়ে নিতে পারেন এবং মান-সম্মান বজায় রেখে বউকে পরপুরুষের সাথে সেক্সে বা রেপে বাধ্য না করেই বাচ্চার মুখ দেখতে এবং দেখাতে পারেন। তথাপি বাচ্চা জন্মদানের চাপে থাকায় যে সব বর সেক্স করতে গিয়ে ইজাকুলেশনে ব্যর্থ হোন, তারাও এই ইনসেমিনেশন পদ্ধতিতে উপকৃত হতে পারেন। এতে পুরুষদের ভূমিকা হলো পরিস্কার করে হাত ধুয়ে-মুছে- শুকিয়ে মাস্টারবেশনের মাধ্যমে ঝকঝকে শুকনা কাপে সিমেন সংগ্রহ করা (যেমন করে প্রস্রাব কাপে সংগ্রহ করা হয়)।

আর নারীর কাজ, খালি সিরিঞ্জ একবার টেনে-বন্ধ করে কাজ করছে কিনা যাচাই করে নিয়ে বিশ/পঁচিশ মিনিট পর সিমেন কিছুটা তরল হলে সিরিঞ্জে ভরে যোনিপথে ঢুকিয়ে দেয়া, ধীরে ধীরে চেপে তরল ইনসার্ট করা, এবং আধা ঘন্টার মতো শুয়ে থাকা। উল্লেখ্য ঠাণ্ডা পরিবেশে শরীরের বাইরে স্পার্ম এক ঘন্টা ভালো থাকতে পারে এবং এই কাজে সুই ছাড়া ৫ বা ৩ সিসি ফিডিং সিরিঞ্জে (বাচ্চাদের খাওয়াবার সিরিঞ্জ) স্পার্ম ভরে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে নারীর ধর্ষণ, দর্শন ,বা সঙ্গম ছাড়াই বাচ্চা হওয়া সম্ভব।

এমনকি এতে বাচ্চার বায়োলজিক্যাল বাবারও জানার পথ থাকে না, কে তার সন্তান যদি স্পার্ম ব্যাংক থেকে নিরাপদ স্পার্ম সংগ্রহ করার কোন উপায় থাকে। এখানে স্পার্ম ব্যবহৃত হয় শুধুমাত্র একটি উপকরণ হিসেবে। ফোকাস হয়, দম্পতিদের সন্তান চাওয়ার তীব্রতা, প্রাপ্তি, পিতৃত্ব এবং মাতৃত্ব। দত্তকের চেয়েও হয়তো কিছুটা বেশী প্রাপ্তি ঘটে এই পদ্ধতিতে, যদি দম্পতিদের নিজেদের মাঝে বন্ডিংটা প্রবল হয়, এবং আলোচনা এবং সহমতের মাধ্যমে তাদের দু’জনেই ফিল করেন সন্তান চাই-ই- চাই এবং এতে তাদের একজনের অন্তত অংশগ্রহণ রয়েছে। তখন বন্ধন হয়তো আরও বেশী দৃঢ় হয় , প্রাপ্তি হয় ডাবল, এবং বউটিও নিরাপদ থাকে।

একটি ভিডিও দেখলাম, যেখানে মেয়েটির গর্ভাশয়/ইউটেরাস নেই, ডিম্বাশয় আছে। সে এগ দিতে পারলেও বাচ্চা বহন করার ক্ষমতা নেই। তার শুধু একজন মেয়ে লাগবে যে তার বাচ্চাটি নিজের গর্ভাশয়ে (বাচ্চা থলি) বহন করতে রাজী হবে। বরের কোন সমস্যা নেই। দু’জনেই বাচ্চা চায়, অতি দুঃখী। বিষয়টি জেনে ৪৮ বছর বয়সী মেয়েটির মা, মেয়ের জন্যে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাচ্চা বহনে রাজী হয়ে যান। মা বলেন, আমার জীবন গেলে যাক, আমার মেয়ে মা হবে, বাচ্চার মুখ দেখবে, বিয়েতে সুখী হবে এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড়। সারোগেসির মাধ্যমে দু’টি মেয়ে হয়েছে তাঁদের। বাচ্চা দেখে বাচ্চার বাবা-মা কান্না থামাতে পারছে না। নানিও সুখী– মেয়েকে জীবনে যতটা আদর দেবেন বলে স্বপ্ন দেখেছিলেন তার চেয়েও বেশী কিছু দিয়ে গেলেন।

এক সময় বাচ্চা না হলে বউকে ছেড়ে দেয়া হতো অথবা একের পর এক বিয়ে করা হতো। বাচ্চা না হবার নানাবিধ কারণ থাকতে পারে। সমস্যা ছেলে/মেয়ে/ বা দু’জনেরই থাকতে পারে। যার বেশীর ভাগই আজকাল কাটিয়ে ওঠা সম্ভব যদি সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপটি নেয়া যায়। তবে, বলতে বাধা নেই, এই বিষয়ে দম্পতিদের প্রধান সমস্যার ক্ষেত্রটি হলো সামাজিক– আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা। বিষয়টি অতি স্পর্শকাতর হওয়ায় অনেকেই আলোচনায় ব্যর্থ হন।

দম্পতিদের মাঝে সেক্স না হওয়া এবং বাচ্চা না হওয়া সমস্যা দু’টি একই গোত্রের–আলোচনা করলেও মুশকিল, না করলেও মুশকিল। সে যাই হোক, সেক্স / সব ‘না পাওয়ার’ মতই একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বাচ্চা না হবার দুঃখ নিঃসন্তান দম্পতিদের বইতে হয়। সম্ভাব্য সব উপায় গ্রহণের পরও যদি সফলতা না আসে, তাহলে চাওয়াটিকেও তখন মুক্তি দিতে হয়, বিকল্প কিছু খুঁজে নিতে হয়। জীবন তেমনই–দুঃখকে জয় করতে জানলে কোন দুঃখই চিরন্তন নয়।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 604
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    604
    Shares

লেখাটি ৬,৪১৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.