বিষন্নতা: মন খুলে কথা বলার জায়গাটুকু চাই

0

রোকসানা ইয়াসমিন:

সেদিন ম্যানহাটনে গিয়েছিলাম “ফিয়ারলেস গার্ল” দেখতে। মনে পড়ছিল, আমার মেয়েবেলার আমিকে। সেই ছোট্ট সাহসী মেয়েটা, আজ সমাজ সংসারের নানা টানাপোড়েনে দিন দিন কেমন সংকুচিত হতে হতে, ধীরে ধীরে ভীতু বনে গেলাম! 
ফেরার পথের ট্রেন ছাড়বে, এমন সময় একটি মেয়ে বন্ধ হয় হয় দরজার মাঝখানে হাত দিয়ে পুরোটা খুলে আমার পাশে এসে বসলো। দেখে মনে হলো, মেয়েটি বাঙালী। সবকিছু গুছিয়ে বসে মেয়েটি ফোন করলো কোথাও। বাড়ি ফিরছে, সে কথা কাউকে জানিয়ে দিল। শুদ্ধ উচ্চারণে বাংলায় কথা বললো। এখানে বেড়ে উঠছে ছেলেমেয়েগুলো কেমন যেন ইংরেজি মেশানো অদ্ভুত সুরে বাংলা বলে। মেয়েটি সেরকম বলেনি। ওর হাতে মনোবিজ্ঞান বিষয়ক একটি বই আমার দৃষ্টি কেড়ে নেয়। বয়স টিন পেরিয়েছে বোঝা যায়, বড়জোর ২৩-২৪ হবে।  
আগ বাড়িয়ে কারও সাথে কথা বলি না আমি। কিন্তু এই মেয়েটির কাছাকাছি বয়সের আমার একটি মেয়ে আছে, আর যে বইটি ওর হাতে, তাতে আর কৌতুহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম,  
– তুমি করেই বলছি, কোথায়, কীসে পড়ছো? 
জানালো, চাইল্ড সাইকোলজি এবং নিউরো সায়েন্স এই দুটো বিষয়ে মাস্টার্স করছে।
-আমারও খুব ইচ্ছে ছিল একবার মনোবিজ্ঞান নিয়ে পড়ি, পরে আর তা হয়নি। তো তুমি কেন আগ্রহ করলে এই সাবজেক্ট নিয়ে পড়তে?
– আমি নিউইয়র্কে এসেছি আমার বয়স যখন চৌদ্দ বছর। এখানে এসে সেভেন্থ গ্রেডে ভর্তি হয়েছিলাম। স্কুলে প্রথম প্রথম আমার খুব অসুবিধে হয়েছে। ভালো ইংরেজি বলতে পারতাম না। কারও সাথে মিশতে পারতাম না, ছেলেরা বাজে মন্তব্য করতো। এমন একটা দিন ছিল না যে, আমার মন খারাপ হতো না। প্রতিদিন মন খারাপ নিয়ে বাড়ি ফিরেছি। হাই স্কুল পর্যন্ত খুব কঠিন সময় গেছে আমার। বাড়ি ফিরে মাকে কিছু বলতে পারতাম না। স্কুলে যেতে ইচ্ছে করতো না, কিন্তু যেতেই হবে। রেজাল্ট ভালো করতাম, পড়াশুনা আর টিভি দেখেই সময় কাটতো আমার। বাবা-মা ব্যস্ত থাকতেন তাদের কাজ নিয়ে। আর চাইতেন আমি পড়ালেখায় সময় দিই বেশি। স্কুলের বাইরে কাছের বান্ধবীও কেউ ছিল না। দেশ ছেড়ে এখানে এসে সবকিছু নিয়ে হিমশিম খাচ্ছিলেন ওনারা, আমিও। এসব কিছু  মিলিয়ে আমার ভেতর হতাশা কাজ করতে থাকে, আরও কিছু সিম্পটমসও ছিল, কোনো কিছুই ভালো লাগতো না আমার, খেতে ইচ্ছে করতো না। একমাস প্রায় না খেয়েই ছিলাম। কী কারণ জানি না, মাঝে মাঝে আমার মরে যেতে ইচ্ছে করতো। হাই স্কুলের শুরুতে আমার রেজাল্ট খারাপ হতে থাকলে স্কুলের গাইডেন্স কাউন্সিলর আমার সাথে কথা বলেন।
ওনাকে সব বললাম। তিনি একদিন আমার প্যারেন্টকে ডেকে পাঠান, তখন ওঁরা জানতে পারেন আমার মানসিক অবস্থা সম্পর্কে। কিন্তু আমার বাবা কিছুতেই ব্যাপারটি মেনে নিচ্ছিলেন না। বাবার ধারণা, ওনার মেয়ে শান্তশিষ্ট, খুব লক্ষ্মী, তিনি যা বলেন তাই শোনে। লেখাপড়া ছাড়া অন্য কোনো দিকে ওর মন নেই, বিষন্নতায় ও কী করে ভুগবে! ওর স্বভাবই এমন। এটা বিষন্নতা নয়।
মেয়েটির নাম মল্লিকা। ও খুব স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে আমার সাথে কথা বলতে, জানি না কেন। যে বিষয় নিয়ে পড়ছে, মনোবল খুব দৃঢ় হতে হয় বোধ হয়! কথা বলে, সে কথায় বিশ্বাস তৈরি করে মন জয় করাই তো ওদের কাজ। মল্লিকা বলে যেতে থাকে,
– দিন দিন আমার মানসিক অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকলে স্কুলের গাইডেন্স কাউন্সিলের পরামর্শে আমাকে সাইকোলজিস্ট দেখিয়ে হতাশা  কাটিয়ে উঠতে থেরাপি নেবার জন্যে বাবা-মা রাজী হলেন। প্রাইমারি ডাক্তারের রেফারেল লাগবে। বাবা-মা গেলেন আমার প্রাইমারি ডাক্তারের কাছে। তিনি বাঙালী, মহিলা। বললেন, “বাচ্চাদের ঢং দেখলে আজকাল আর ভালো লাগে না! দেশে হলে কষে দুটো থাপ্পড় দিলেই সব ঠিক হয়ে যেতো।”
শুনে খুব কষ্ট হয়েছিল সেদিন। তিনি এদেশে লেখাপড়া করে একজন শিশু বিশেষজ্ঞ হয়েও কেমন করে ও কথা বলেছিলেন! তখন মনে হয়েছিল, সাইকোলজি নিয়ে পড়বো। তাই পড়ছি। মনের বিষন্নতার কারণগুলো এখন আমি জানি। আমাকে কোনও দু:খ আর কোনও রকমে কাবু করতে পারে না। পড়া শেষ করে দেশে ফিরে যাবার ইচ্ছে আছে, বাংলাদেশের শিশু কিশোরদের কিছুটা যদি হেল্প করতে পারি!
এখানে তো শিশু কিশোরদের মানসিক রোগের চিকিৎসার জন্যে ভালো ডাক্তার, থেরাপিস্ট আছে, ভালো হসপিটাল আছে। এখানে বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে দেখা হয়, বাংলাদেশে তো সেরকম সাঢ়অ পাওয়া যায় না পরিবার থেকে। অনেক বাবা মায়েরা সংকোচ করেন অল্পবয়সী মেয়েদের, ছেলেদের মানসিক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে, চিকিৎসা  করাতে। লোকে কী বলবে! জানাজানি হয়ে গেলে স্কুল কলেজে কেউ ভালো চোখে দেখবে না, পাগল বলবে। ছেলেমেয়ের বিয়ে হবে না, এ জাতীয় নানা কুসংস্কার এখনও গেঁথে আছে মানুষের মনে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে বড় ক্ষয় হতে থাকে, একটি অঘটন না ঘটা পর্যন্ত তাঁরা বুঝতে পারেন না।
মল্লিকা এখন নিউ ইয়র্কে এশিয়ান কমিউনিটিতে উইমেন এডাল্টদের জন্যে কাউন্সিলিং করছে। মেয়েদের নানা রকম মানসিক কষ্ট কমাতে কাজ করছে। দেশে যেতে পারছে না, দূরে থেকেও তবু দেশের মানুষদের সাহায্য করছে।
মল্লিকার স্টেশন এলে ও নেমে গেল। আমার শুভকামনা ওর প্রতি পদক্ষেপে থাকবে বলে জানালাম। আমি একা ভাবতে থাকি, দেশে ছেলেমেয়েরা ড্রাগ এডিক্ট হচ্ছে, আত্মহত্যা করছে, বদলে যাচ্ছে সামাজিক পরিবেশ। এই বদলে যাওয়া পরিবেশ শিশু-কিশোরদের মানসিক অবস্থাতেও নানারকম প্রভাব ফেলছে আজকাল। পেরেন্টসরা তার কতটুকু খেয়াল করতে পারেন!
আসলে মাঝে মাঝে কড়া কথা, শাসন, থাপ্পড় দিয়েও কিছু মানসিক অবস্থা ঠিক করা যায় না। অনেক সময় প্রফেশনাল হেল্পের দরকার হয়। মল্লিকারও হয়েছিল। হাই স্কুলের শেষে থেরাপি নিয়ে, ও ওর সেই মানসিক অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পেরেছিল। ওর মতো কত কত মেয়ে, ছেলেরা ঘরে বাইরে প্রতিনিয়ত নানা রকম  সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে এবং মস্তিষ্কে কেমিক্যাল ইমব্যালেন্স জনিত সমস্যার কারণেও বিষন্নতা নামক রোগে ভুগছে, জীবনের সৌন্দর্যময় রঙিন দিকগুলো ওদের কাছে কেবল কালো অন্ধকার। কারও কাছে মন খারাপের  কথাগুলো বলতে না পেরে একা একা মনের কষ্টে ভোগে, ভুগতে ভুগতে কোনোদিন কোনো ঘটনায় চরমভাবে কিছু একটা বিষয় ট্রিগার করলে মুহূর্তেই কখনও ইচ্ছে করে মরে যেতে, অথবা মনে যে যন্ত্রণাটা হতে থাকে, তার থেকে মুক্তি পেতে শরীরকে যে ব্যথাটুকু দিয়ে তা ওরা কমাতে চায় , সেই আঘাতটুকু বেশি মাত্রায় হয়ে গেলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। 
আমরা এমন করেই বলি, ‘আমার মেয়ে একটু মুডি, সহজে কারও সাথে সহজ হতে পারে না। ছেলেটা কারও সাথে খুব একটা মেশে না, কথা বলে না, হাসিখুশি থাকে না।’ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে এসব ফেলে দিয়ে ওদের অস্বাভাবিকতা গুলোকে আমরাই যুক্তিসঙ্গত করে নিয়ে স্বাভাবিক ভেবে নিশ্চিন্ত হয়ে থাকি।
অথচ আমাদের উচিত কারণগুলো খুঁজে বের করা। ওদের সত্যিকার ভাবে সাহায্য করা। কী করে সন্তানদের মানসিক অবস্থা আন্দাজ করা যায়, বাড়ির পরিবেশ কেমন রাখা উচিত, কেমন ভাষায় ওদের সাথে কথা বলা উচিত এসব জানতে পেরেন্টসদের জন্যেও শিক্ষামূলক কাউন্সিলিং এর ব্যবস্থা করা উচিত।
বাংলাদেশে স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটিগুলোতে গাইডেন্স কাউন্সিলরের কোনও পদ আছে কিনা আমি জানি না, থাকলেও ওই পদটিতে নিযুক্ত ব্যক্তি ঠিক কী কী কাজ করেন তাও আমার জানা নেই। আমাদের সময়ে স্কুল কলেজে আমরা পাইনি। পড়ালেখায় খারাপ করলে বা ব্যক্তিগত কোনও খারাপ আচরণের জন্যে কমপ্লেইন চলে যেত সরাসরি গার্ডিয়ানের কাছে।আমার মন খারাপ হলে, সেই মন খারাপের বিষয় নিয়ে কথা বলবার জন্যে বন্ধুরা ছিল।
আমি যখন ক্লাস এইটে পড়ি, আমার ক্লাসের একটি মেয়ে আত্মহত্যা করেছিল। কাউকে হয়তো বলতে পারেনি ও ওর কষ্টের কথাগুলো। অনেক সময় হয়তো বন্ধুদেরকে বললেও কষ্ট দূর হয় না, বিষণ্ণতা কাটে না। প্রফেশনাল হেল্পের দরকার হয়।   
আমি নিউ ইয়র্কে আছি অনেক বছর। আমার মেয়ে এখানেই স্কুল শুরু করেছে। হাই স্কুলে ও কয়েকটি সোশ্যাল অর্গানাইজেশনের সাথে জড়িত ছিল। তাই কয়েকবার ওর স্কুলে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গাইডেন্স কাউন্সিলরদের সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল আমার। এই পদে থেকে যে সকল কাজগুলো ওঁরা করেন, স্কুল কলেজের স্টুডেন্টসদের জন্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে আমার মনে হয়।
১৯২০ সালে নিউ ইয়র্কের স্কুলগুলোতে ছাত্র ছাত্রীদের সুবিধার্থে প্রথম কাউন্সিলর পদের জন্যে অনুমতি মেলে। ১৯৯০ সালে পদটির দায়িত্ব আরও বাড়ানো হয়েছে। স্কুল কাউন্সিলর স্টুডেন্টদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে সাহায্য করেন। কখনও কখনও সামাজিকভাবে নানারকম প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন হতে হয় শিশু কিশোরদের। ইভ টিজিং আর সাইবার বুলিং তো অহরহই ঘটছে। এতে দুর্বল মনের অনেকের মানসিক অবস্থার অবনতি হয়। কাউন্সিলর তখন ব্যক্তিগত পর্যায়ের সে সকল সমস্যা সমাধানেও এগিয়ে আসেন। লার্নিং ডিফিকাল্টিস ADHD ডায়াগনোসিস করে, সে অবস্থা কাটিয়ে উঠতেও বিভিন্নভাবে সাহায্য করেন। 
সেদিন বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বিশ বছরের একটি মেয়ে হাবিবা সুলতানা কনক। কেন করবে মেয়েরা এমন আত্মহত্যা? যে কারণে কষ্ট হয়, মরে যাবার মতো ঘটনা ঘটে,  সেই কারণগুলোকে তুচ্ছ করে দেখবার মতো, দেখিয়ে দেবার মত কেউ একজনকে ওরা কেন পাশে পায় না? কেন সেই দূরত্বকে আমরা মা-বাবা হয়ে, সবচেয়ে কাছের মানুষজন হয়েও সন্তানের বিষন্ন মনের পাশে দাঁড়াতে পারি না! ওদেরকে মৃত্যুর কাছ থেকে জীবনের বুকে আগলে রাখতে পারি না! 
যদি বাংলাদেশে স্কুল কলেজে গাইডেন্স কাউন্সিলরের পদটি না থাকে তবে তৈরি করা হোক। ভালো একজন সাইকোলজিস্ট এবং সোশ্যাল ওয়ার্কারকে এ পদে নিযুক্তি দিলে, স্টুডেন্টরা তাদের সামাজিক সমস্যা ও মনের কষ্ট খুলে বলবার মতো বিশ্বস্ত কেউ একজনকে অন্তত কাছে পাবে।
নিজে না বলতে পারুক, বন্ধুরা আছে, টিচাররা আছেন গাইডেন্স কাউন্সিলারকে জানানোর জন্যে। তিনি গার্ডিয়ান ডেকে বাকি ব্যবস্থা করতে পারবেন। এতে করেই যে সকলের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, আত্মহত্যা একেবারেই বন্ধ হয়ে যাবে তা নয়। আশা করবো, কিছুটা হলেও তো কমবে। তবে এইটুকুন চেষ্টা করতে অসুবিধে কী! শুরুটা তো করি!

লেখাটি ৫,৬৮২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.