নারী জীবনের সাতকাহন

0
দিনা ফেরদৌস:
সন্ধ্যা ও মাধবের বিয়ের চার বছর পরও যখন তাদের কোনো সন্তানাদি হচ্ছে না, তখন মাধবের মা সন্ধ্যার মুখ দেখা বাদ দিয়ে দিলেন। মাধবের মা তার দেখাশুনা ও রান্না-বান্নার জন্য কাজের ছেলে রাখলেন, যাতে সন্ধ্যার রান্না তাকে খেতে না হয়। অবশেষে নাতি-নাতনির মুখ না দেখেই তাকে মরতে হলো। সেই থেকে কাজের ছেলে লক্ষণ তাদের পরিবারেরই অংশ হয়ে আছে।
হিন্দি মুভি “দেহ” এর শুরুটা এই রকমই। মুভিটি মুক্তি পায় ২০০৭ সালে। প্রধান চরিত্রে অভিনয়ে আছেন জয়াপ্রদা, মহেশ মাঞ্জরেকার, অমৃতা আরোরা, ডিনো মারিয়া। পারিবারিক পছন্দেই মাধব (মহেশ মাঞ্জরেকার) ও সন্ধ্যার (জয়াপ্রদা) বিয়ে হয়। তখনও সন্ধ্যার গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট হয়নি। মাধব শর্ত দিয়েছিল বিয়ের পর গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করতে পারবে, কিন্তু চাকরি করতে পারবে না।
মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্ধ্যার জন্য বিয়েটা জরুরি ছিল ওই সময়ে। পরে আর গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট হয়নি, সংসারি হতে যেয়ে। তখন মাধব এ্যাড এজেন্সিতে কাজ করলেও এই ক বছরে সে নিজেই এ্যাড এজেন্সি খুলে বসেছে। সন্ধ্যাকে দেবার মতো এক মুহূর্ত সময় মাধবের হাতে নেই। কাজের পর সময় কাটে পার্টি আর নিজের সন্তানহীন দুঃখভরা কাহিনী শুনিয়ে উঠতি মডেলদের সঙ্গে সেক্স করে।
মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে সন্ধ্যা তার মায়ের কাছে গেলে মাধব তার কম বয়সী মডেলকে নিয়ে ঘরেই থাকা শুরু করে দেয়। ঘরে ফিরে সন্ধ্যা বুঝতে পারে কোনো মেয়ে ছিল তার ঘরে। কাজের ছেলে লক্ষণ এই ব্যাপারে বহুবার সন্ধ্যাকে সতর্ক করলেও সন্ধ্যা বিশ্বাস করেনি। সন্ধ্যার এই সরলতা ও ভালো মানুষির জন্য লক্ষণ তাকে দেবী বলে মনে করে প্রায় পূজা দেয়। মাধবের কাছে সত্যতা জানতে চাইলে মাধব বলে, সে সন্ধ্যার কাছে ডিভোর্স চায় এবং মডেল রিনিকে (অমৃতা আরোরা) বিয়ে করবে। সন্ধ্যা কিছু না বলে ডিভোর্স দিয়ে মাধবের মায়ের দেয়া গহনা ও মাধবের দেয়া সবকিছু দিয়ে চলে যায়।
পেয়িং গেস্ট হসেবে থাকতে গিয়ে সন্ধ্যার পরিচয় হয় তার থেকে বয়সে ছোটো এ্যানি’র (ডিনো মারিয়া) সাথে। সেখানে সন্ধ্যার সাথে এ্যানির ভালবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠে। সন্ধ্যা প্রেগনেন্ট হয়। ওদিকে মাধব আর রিনি বাইরে প্রতিদিন পার্টি-টার্টি নিয়ে ব্যস্ত হলেও ঘরে শান্তি নেই। মডেল বিয়ে করা যায়, কিন্তু বউকে মডেল হিসেবে দেখতে ভাল্লাগে না। সন্দেহ আর অশান্তিতে নতুন সংসার জীবনে মাধব যখন অতিষ্ট, ঠিক তখনই লক্ষণের মাধ্যমে খবর পায় সন্ধ্যা প্রেগনেন্ট। বুঝতে পারে আসলে বাচ্চা জন্মদানে সে নিজেই অক্ষম ছিল।
সন্ধ্যার কাছে ছুটে যায়। অনাগত বাচ্চাসহ সন্ধ্যাকে নিয়ে দূরে কোথাও চলে যেতে প্রস্তাব করে, যাতে কেউ জানতে না পারে মাধব নিজে বাচ্চা জন্মদানে অক্ষম। সন্ধ্যা ফিরিয়ে দেয় মাধবকে।

এদিকে কাজের ছেলে লক্ষণ তার দেবীরূপী ম্যাডামের প্রেগনেন্ট হওয়াটা মেনে নিতে পারছে না। সন্ধ্যাকে সে পতিভক্তি , বিদূষী, অবলা, সরল নারী হিসেবেই দেখে আসছে। যাকে সে দেখেছে সব অপমান অবহেলা সহ্য করে কোন প্রতিবাদ না করা নারী, আজ তার ভিন্ন রূপ দেখে ঘৃণায় সন্ধ্যার পেটের বাচ্চাকে মেরে ফেলার প্লান করে। স্যারের বদ অভ্যাস সম্পর্কে সে জানতো, তার খারাপ লাগলেও অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ম্যাডামকে সে’তো দেবীর আসনে বসিয়েছে, তাই তার এতো তিক্ততা। 

মুভির কাহিনীটি বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, যা বলতে চাই তার জন্য এই মুভিটি চমৎকার একটি উদাহরণ। আমাদের সমাজে বিয়ে না হওয়াকে মেয়েদের এক ধরনের অযোগ্যতা হিসেবেই দেখা হয় অন্য যতোই যোগ্যতা থাক না কেন। আবার বিয়ের পর মেয়েরা যত মনোযোগ দিয়েই সংসার করুক না কেন, যদি বাচ্চা দানে অক্ষম থাকে তো তার সব যোগ্যতাই মাটি।
পুরুষের সমস্যার কারণে বাচ্চা না হলে মেয়েদের হাহাকার না থাকলেও, মেয়েদের কারণে বাচ্চা না হলে স্বামীদের আফসোসের সীমা থাকে না। স্বামীর কোনো সমস্যা থাকলে, বা স্বামীর দ্বারা স্ত্রী মানসিকভাবে নির্যাতিত হলেও তা প্রকাশকে আমাদের সমাজ ভালো দৃষ্টিতে দেখে না। স্বামী যদি সমাজের গণ্যমান্য, জ্ঞানী ব্যক্তি হয়ে থাকেন তো কথাই নেই।
গুণীজনদের সম্মান দিয়ে, তাদের কাছ থেকে সম্মান পেয়েই সকলে ধন্য। তাই গণ্যমান্য স্বামী সম্পর্কে কিছু বলে সাধারণ বৌয়ের সমাজে টিকে থাকা মুশকিল। তার থেকে সহজ সমাধান দেন অনেকেই, পারলে ডিভোর্স দিয়ে চলে যাও, না পারলে নীরবে ঝাঁটার বাড়ি খাও। তবু ভদ্রলোকের বউ হয়ে ঘরের কথা বাইরে প্রকাশ করো না। কিছু না পারলে আত্মহত্যা করো, তবুও লোক জানাজানি যেন না হয়। পরে টাকা দিয়ে বা ক্ষমতা দিয়ে প্রচার মাধ্যম বন্ধ করে সব চাপা দেয়া যাবে। আর না পারলে চলে গিয়ে একা থেকে দেখিয়ে দাও, তুমিও কম নয়। মানে সমাজকে দেখানোর বুদ্ধি দিয়ে তাকে একা জীবন পার করার সিদ্ধান্ত পর্যন্ত দিয়ে দিলেন। মুভির কাজের ছেলে লক্ষণ যেভাবে সন্ধ্যাকে দেবী বানিয়ে ছিল।
নারীর শরীর বা মন বলতে কিছু যে একটা আছে, তা নিয়ে ভাবার টাইম নেই। এখন সে যদি প্রেম করে বা তার নিজের পছন্দমতো জীবন বেছে নিতে চায়’তো সারা জীবনের সব পূণ্যের সাধনার ফল এখানেই শেষ। স্বামী ছাড়তেই মেয়েটি প্রেম করে বেড়ায়, ঘরে বউ রেখে স্বামী যে এতো প্রতারণা করে আসছেন এতোদিন, তার সব মাফ। মেয়েদের প্রেম পরকীয়া, দেখতে খারাপ লাগে। স্বামী-স্ত্রী দু’জনের পরকীয়া আছে জানা গেলে ,তখন বলা হয় কারোরই কাজটি উচিত নয়। শুধু স্ত্রীর আছে শুনলে সবারই ঘৃণা লাগে, স্বামীর ঘরে থেকে পরকীয়া …।
সমাজ দিয়ে না পারলে ধর্ম দিয়ে মাইর দেয়া হয়। অথচ ব্যক্তির শরীর, ব্যক্তির চাহিদা যা পূরণের অধিকার তার আছে। দিনের পর দিন যখন কোনো মেয়ে সেই সমাজের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য ডিভোর্স দিতে পারছে না, আবার স্বামীর সঙ্গেও শারীরিক সম্পর্ক থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, তখন সমাজ বা ধর্ম কিছুই করতে পারে না। বাপ- ভাইয়ের সংসারে নিরাপদে থেকে বা স্বামীর সোহাগে থেকে বহু কিছুই বলতে পারেন। কিন্তু একা থেকে দেখিয়ে দেয়া বা ফাইট করে যাওয়া কতোটা কঠিন, তা যারা কোন সাপোর্ট ছাড়া থাকেন একমাত্র তারাই ভাল জানেন।
আজও আমাদের সমাজে কোনো নারীকে একা বাসা ভাড়া নিতে হলে বহু বিশ্রী প্রশ্নের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, একা কোনো নারীকে সন্ধ্যার পরে ঘরে ফিরতে দেখলে নানাজনের ভিতরে নানা রকমের চিন্তা কাজ করে। একদল আসেন সুযোগ নিতে, তো আরেক দল আসেন সুযোগ দেয়ার নামে সুযোগ নিতে। একটি মেয়ের নিরাপত্তার দায়িত্ব যেন তার একার।

মেয়েদের কেমন হওয়া উচিত, কেমন দেখতে বিশ্রী লাগে সব সেটাপ করে রাখা। যা দীর্ঘদিন ধরে আমাদের মগজে গেঁথে দেয়া হয়েছে। যা বলি তার কিছুই নিজ উপলব্ধি থেকে বলার যোগ্যতা আমাদের নেই। যা দেখে অভ্যস্ত হয়েছি ,যা আমাদের অভ্যাসের সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে আফিমের মতো, তাই আমাদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে। আমরা তাই বিশ্বাস করি, যা আমরা বলি। অথচ তা আমাদের উপলব্ধির কথা না। তা আমাদের নারীদের নিজেদের কথা না। আর এইসব কিছুই আমাদের পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা-ভাবনার ফল, যা নারী- পুরুষ বেশিরভাগই ধারণ করে থাকি। 

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 275
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    275
    Shares

লেখাটি ২,২৬২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.