তেঁতুল তত্ত্ব

সৈয়দ আবুল মকসুদ: আমরা বিভিন্ন তত্ত্বের কথা শুনেছি। ম্যালথাসের জনসংখ্যা তত্ত্ব, জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্ব, আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব। তার সঙ্গে এবার যোগ হলো আল্লামার তেঁতুল তত্ত্ব। এই তত্ত্বের উপজীব্য নারী। বিশেষ করে নারীর পর্দাপ্রথা।
নারীকে নিয়ে পুরুষদের কেউ কেউ গত ১০ হাজার বছরে নানা রকম আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। কিন্তু ১৪৩৪ হিজরির শাবান মাসে (২০১৩ ঈশায়ীর জুলাইতে) যে বাণী প্রচারিত হয় চট্টগ্রামের হাটহাজারী থেকে, তাতে ধারণা করি, গত সোয়া চৌদ্দ শ বছরে এ ধরনের কুৎসিত উপমা নারী সম্পর্কে আর কখনো ব্যবহূত হয়নি। মেয়েমানুষ তেঁতুলের মতো।

১৯২৩ সালে নবপ্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হলে, পরে যার নামকরণ হয় সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, গঠিত হয় একটি সংগঠন। তার নাম ‘অ্যান্টি-পর্দা লীগ’ বা পর্দাবিরোধী সংসদ। সেই সংগঠনের এবার ৯০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। আমি যখন সেই সংগঠনের পুরোনো কাগজপত্র ঘাঁটছি, তখনই কোনো টিভি চ্যানেল থেকে বার্ধক্যজনিত কমজোর গলায় উচ্চারিত হচ্ছিল—মেয়েমানুষ হলো ‘তেঁতুলের মতো, তেঁতুলের মতো, তেঁতুলের মতো।’ তাদের দেখলেই পুরুষ মানুষের দিল [হূদয়] থেকে লালা ঝরে। লালসার লালা। আগে জানতাম লালা ঝরে মুখ থেকে। এখন দেখছি দিল থেকেও লালা ঝরে।
খুবসুরত রমণী দেখলেই বিবাহ করে তাকে নিয়ে বাসরঘরে ঢোকার ইচ্ছা কোনো কোনো লম্পট পুরুষের থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু তাবৎ নারীকে দেখলেই পুরুষকুলের দিল-এ টস টস করে লালা ঝরবে—এ কথা পৃথিবীর কেউ কোনো দিন শোনেনি। আমরা আমাদের নানি-দাদি ও মাকে আমরা তেঁতুলজাতীয় পদার্থ কল্পনাও করতে পারি না। আমাদের মেয়েকেও নয়। কোনো নারীকেই নয়। এতকাল জেনে এসেছি নারীরা মানুষ। একজন কবি বা কলাম লেখক যেমন মানুষ, একজন নারীও তেমনি মানুষ। মানুষ ছাড়া অন্য কিছু নয়। লালা উদ্রেককারী তেঁতুল তো নয়ই।
১১০ বছর আগে যদি বেগম রোকেয়া নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও আইনগত অধিকার নিশ্চিত করতে লড়াই করেন। বলেছেন, পর্দাপ্রথা নারীর ব্যক্তিত্বের অবমাননা। রোকেয়া মেয়েদের বলেছিলেন, শিক্ষিত হও, সচেতন হও, বাইরে যাও। ১১০ বছর পরে তাঁর বিরোধিতা করার অধিকারও কারও আছে। কিন্তু পর্দাপ্রথার পক্ষে কথা বলা আর নারীকে মধ্যযুগে নিয়ে যাওয়া দুই জিনিস। এখন যদি কেউ বলেন, ‘কেলাস ফোর-ফাইভ পর্যন্ত লেখাপড়া করান’ যাতে ‘স্বামীর টেকা-পয়সা হিসাব করইতে পারে’—এ ফতোয়া দেওয়ার অধিকার থেকেও আমরা কাউকে বঞ্চিত করতে পারি না। কিন্তু নারীর চরিত্র নিয়ে কলঙ্ক রটালে আমরা তা কীভাবে মেনে নেব?
ইটভাটা থেকে শুরু করে, ফুটপাতে বসে ইট ভাঙা পর্যন্ত এবং সব পেশায় নারীর আজ বিচরণ সত্ত্বেও, গর্ব করে বলতে পারি, পৃথিবীতে বাংলাদেশের নারীই সবচেয়ে সংযত জীবন যাপন করে। তার পরেও তাকে উপদেশ দিলে তা বিষাক্ত তিরের মতো গিয়ে তাদের কলিজায় বেঁধে। বাংলার পুরুষদের মধ্যে বরং নির্যাতনস্পৃহা ক্রমাগত বাড়ছে। তিনি বলেছেন, ‘এডলা ফ্রত্যেকদিন মাইয়াফুয়া, মরদফুয়া আঁরাত্তে আইয়েদ্দে (প্রতিদিন মেয়েমানুষ ও পুরুষমানুষ আমাদের এখানে আসছে)। তাদের আরজি, ‘ছেলে হয় না, একটা তাবিজ দাও’। কন্যাসন্তান নয়, ছেলেসন্তানের জন্য শিক্ষিতরাও যান। তিনি ধমক মারেন, ‘জানো, ছেলে কেন হচ্ছে না?’
বাৎসায়ন বা ফ্রয়েড বা মাস্টার্স এবং জনসনরা যা জানতেন না, আল্লামা তা জানেন। যৌন বিষয়ে তাঁর অগাধ এলেম। তাঁর ধারণা, নারী-পুরুষের প্রজননক্ষমতা যে কমে যাচ্ছে তার একমাত্র কারণ মেয়েরা বেপর্দা হয়ে বাইরে ঘোরাফেরা করে। অফিস করে। মার্কেটে যায়। পনেরো শ হিজরির এই বেলেল্লাপনার কারণে মানুষের শুক্রঘাটতি দেখা দিয়েছে। পুত্রসন্তান কম পয়দা হচ্ছে। এর থেকে বাঁচার পথ একটাই: মেয়েদের ঘরে আটক করো। একেবারে ঘরে খিল এঁটে তাদের বন্দী করে রাখো। দেখবে, আরও ছেলেতে ভরে যাবে দেশ।
শুরুতে অ্যান্টি-পর্দা লীগের কথা উল্লেখ করেছি। ওই সংগঠনের সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের একতরফা প্রেমিকা ফজিলাতুন্নেসাও ছিলেন। তবে নেতৃত্বে ছিলেন ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর আবুল হুসেনসহ অনেকে। অ্যান্টি-পর্দা লীগের নেতা-নেত্রীরা শুধু ঘরোয়া আলোচনা নয়, ঢাকা নগরের মুসলমান পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে পর্দার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে মেয়েদের বোঝাতেন। তাঁরা নগরের বিভিন্ন এলাকায় মেয়েদের জন্য নৈশ বিদ্যালয়ও খুলেছেন। তাঁরা চাইতেন অবরোধের অন্ধকার থেকে নারী মুক্তি পাক। সমাজে পুরুষের মতো নারীও অবদান রাখুক। তাঁদের সেই শুভ উদ্যোগ ৯০ বছর পরে ১৪৩৪ হিজরিতে এসে প্রচণ্ড ধাক্কা খেল।
হেফাজত নেতার ফতোয়া থেকে ধারণা করি, নারীর প্রতি অসীম দরদ থেকে তাঁদের পক্ষেই তিনি বলছেন। কেন তাঁরা বাজার করতে গিয়ে কষ্ট করবেন, গার্মেন্টসে কষ্ট করে চাকরি করার দরকার কী? তাঁরা ঘরের ভেতরে পায়ের ওপর পা তুলে বসে থাকবেন। আর খুব বেশি হলে রান্নাঘরে গিয়ে খুন্তিটা নাড়াচাড়া করবেন। হেফাজত থেকে তাঁদের বাড়িতে মাসে মাসে টাকা পাঠিয়ে দেবে।
তাঁর ভাষায়, ‘আপনি স্বামীর ঘরে থাইকা আসবাবপত্র হেফাজত করবেন। বাইরে কেন যাবেন? আপনার কাজ ঘরে থাইকা ছেলেসন্তানের দেখাশোনা করা। মার্কেটিং করতে যাবেন না। স্বামী আর ছেলেকে মার্কেটিং করতে পাঠান। আপনার মেয়েকে কেন গার্মেন্টসে চাকরি করতে পাঠান?’ তিনি মা-নারীদের বলেছেন ছেলেসন্তানকে দেখাশোনা করতে, কন্যাসন্তানকে নয়।
মেয়েদের চাকরি করাতে তাঁর আপত্তির কারণ, তারা ‘ফজরে সাতটা-আটটা বাজে গার্মেন্টসে যায়। রাতের আটটা-দশটা-বারোটায়ও ফিরে না, কোন পুরুষের লগে ঘুরাফিরা করতেছে তা তুমি জানো না। কতজনের মধ্যে মুত্তালা হচ্ছে আপনার মেয়ে, আপনি তো জানেন না। জেনা কইরা কইরা টাকা রোজগার করে—।’
নারীকে নির্যাতন করা হচ্ছে হাজার হাজার বছর ধরে। কিন্তু মানবজাতির ইতিহাসে নারীজাতি সম্পর্কে এতটা অশ্লীল ও অশ্রদ্ধেয় কথা আর কোনো দিন উচ্চারিত হয়নি। যেসব মেয়ে জীবিকার জন্য চাকরি করেন, রাত ৮-১০টায়ও ঘরে ফিরতে পারেন না, তাঁরা ‘জেনা কইরা টাকা রোজগার’ করেন। কী নির্মম উক্তি। ছি ছি ছি!
তিনি এক অমোঘ সত্য কথা বলেছেন। যিনি যত ‘বুজুর্গই’ হোন, সুন্দরী মেয়েলোক দেখলে দিলের মধ্যে ‘কু-খেয়াল আইসা যাবে’। যেকোনো নরজাতির তেঁতুলে আসক্তি আছে তাতে তিনি নিশ্চিত। জইফ বুড়ো হাবড়াদের মধ্যেও কামভাব না থেকে পারে না। তাঁর ভাষায়: ‘কেউ যদি বলে, বুড়া মানুষ, হুজুর, মহিলা দেখলে আমার বুকের ভিতর খারাপ [ইচ্ছা] হয় না, কু-খেয়াল আসে না, তা হইলে আমি বইলব, ভাই হে বুড়া, তোমার […] বিমার আছে। তোমার ফুরুষত্ব নষ্ট হইয়া গেছে।’ অর্থাৎ পুরুষত্ব থাকলেই নারীকে তেঁতুল মনে হবে।
মৌলভি শফী সাহেব মুরব্বি মানুষ। তাঁর ফতোয়া অমান্য করা বেয়াদবি। তবে বাংলাদেশের মেয়েরা যদি তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী কাল থেকে অন্দরে গিয়ে ঢোকে, পরশু দিন গোটা দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো ধসে পড়বে রানা প্লাজার মতো। তা না হয় পড়লই, কোনো ক্ষতি নেই, ইসলামের তো হেফাজত হবে। কিন্তু তারপর বাংলাদেশ বিশ্বভুবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। চট্টগ্রামও বাংলাদেশের মধ্যে। সেখানেও টাকাপয়সার অনটন দেখা দেবে। দুবেলা চুলাও ঠিকমতো জ্বলবে না। মাদ্রাসা-এতিমখানা চালানো তো দূরের কথা।
গ্রামগঞ্জে ধর্ম ব্যবসায়ীদের কথা বেশ উপভোগ্য, যদিও অশিক্ষিত ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ তাতে বিভ্রান্ত হয়। কিন্তু যাঁরা কোনো মস্ত বড় ধর্মীয় সংগঠনের নেতা, তাঁদের থেকে আলেমসুলভ দায়িত্বশীল বক্তব্যই প্রত্যাশিত। ১০ হাজার বছর বঙ্গীয় নারী মুখ বুজে অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেছে। এখন আর কোনো নতুন অপমান সইতে সে প্রস্তুত নয়।
হেফাজতের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশ মেয়েদের হেরেমে নিয়ে ঢোকাও। তাদের বাইরে যাওয়া বারণ। কিন্তু ৮৮ বছর আগে কবি নজরুল ডাক দিয়েছিলেন—‘জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা’। তিনি মেয়েদের জাগতে বলেছিলেন কোন বিবেচনা থেকে তা তিনিই ভালো জানতেন। তবে নারীকে জাগবার ডাক যখন দিয়েছিলেন, তখন তিনি পাগল হননি। ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের পরে বললে আমরা মনে করতাম, ওসব পাগলের প্রলাপ। তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় ও-কথা বলেছেন। যেনতেনভাবে জাগ্রত হওয়া নয়, তিনি আরও বলেছিলেন—‘জাগো হতভাগিনী ধর্ষিতা নাগিনী’।
অত বড় কবি নজরুল। কত রকম উপমা ব্যবহার করেছেন নারী সম্পর্কে, কিন্তু মেয়েদের সম্পর্কে তেঁতুলের মেটাফোর তাঁর মাথায় আসেনি। তিনি নারীকে দেখেছেন মা হিসেবে, মেয়ে হিসেবে, বন্ধু হিসেবে, সহধর্মিণী হিসেবে এবং বোন হিসেবে। নজরুল মেয়েদের জ্বলে ওঠার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন:
ধু ধু জ্বলে ওঠো ধূমায়িত অগ্নি,
জাগো মাতা, কন্যা, বধূ, জায়া, ভগ্নি।
নজরুল নারীকে বলেছেন, ‘চির-বিজয়িনী জাগো জয়ন্তিকা।’ একটিবারও তেঁতুলের কথা বলেননি।
নজরুল ইসলাম সুবিধার লোক ছিলেন না। হিন্দুদের সঙ্গে ঘেঁষাঘেঁষি করতেন। তাই কাঠমোল্লারা তাঁকে বলতেন ‘কাফের’। তিনি কিছুটা নারীঘেঁষাও ছিলেন। তাই বলেছেন, ‘আমার চক্ষে পুরুষ রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই।’ তাঁর চোখে ভেদাভেদ না থাকলে কী হবে, বঙ্গীয় বহু পুরুষের চোখে নারী আজ অতি নিকৃষ্ট প্রাণী। প্রায় শত বছর আগে তিনি বলেছিলেন:
বেদনার যুগ, মানুষের যুগ, সাম্যের যুগ আজি
কেহ রহিবে না বন্দী কাহারও, উঠিছে ডঙ্কা বাজি।
যেসব পুরুষ জীব নারীকে গৃহবন্দী করে দাসী বানিয়ে রাখতে চায়, তাদের সম্পর্কে পাগলা কবি কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করছিলেন:
নর যদি রাখে নারীরে বন্দী, তবে এর পর যুগে
আপনারি রচা ঐ কারাগারে পুরুষ মরিবে ভুগে শোনো মর্তের জীব।
অন্যেরে যত করিবে পীড়ন, নিজে হবে তত ক্লীব।
আমি নিজে কিছু বলতে চাই না। ধর্ম বিষয়ে আমার বিশেষ জ্ঞান নেই। নজরুলের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলব, যেসব পুরুষ নারীকে ঘরের কারাগারে বন্দী রাখতে চায়, তাদেরই ঠাঁই হওয়া উচিত নাজিমউদ্দিন রোড বা কাশিমপুরের পাঁচিলঘেরা দালানে।

সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।
লেখাটি প্রথম আলো থেকে নেয়া।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.