“ছেলেবাচ্চা তো অমনই হয়”-কথাটা সত্য নয়

0

জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা:

বাচ্চারা একসাথে হৈচৈ-খেলাধুলায় মত্ত হলে, একটু পরেই দেখা যায় – মন কষাকষি কিংবা মারামারিও কিঞ্চিৎ শুরু করে দিয়েছে। সে হতেই পারে! শুধু খেয়াল রাখি, মাত্রাতিরিক্ত কিছু না হলেই হলো! কিন্তু তবু বিশ্রী রকমের এগ্রেসিভ, ভায়োলেন্ট সিচুয়েশনও প্রায়শই দেখা যায়।

অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে- সেসব বিধ্বংসী কাজকর্ম মেয়ে বাচ্চাদের তুলনায়, ছেলে বাচ্চাদের দ্বারাই বেশি হয়! …কেন? এ নিয়ে একসময় খুব ভাবতাম। ট্র্যাডিশনাল ভাবনা – ‘ছেলেরা তো একটু অমন হবেই’ ~ কেন যেন বিশ্বাস হতো না! কেননা নিজে ‘মা’ হবার পরে দেখেছি~ বাচ্চা, তার মা-বাবা-পরিবার এর শিক্ষাতেই বড় হয়। কিংবা হতে চায়। তাহলে?

তাহলে কি ছেলে বাচ্চা’র মা-বাবা’ই তাদের ‘ছেলে সন্তান’কে এমন বিধ্বংসী রূপে বড় করতে চান? আক্ষরিক অর্থেই কিছুটা হয়তো সত্য কথাটা। প্রমাণ দেই? সেদিন এক দাওয়াতে গিয়েছি। বেশ খানিকটা আলাপ হতেই এক ভদ্রমহিলা আমার মেয়ে’র বাংলা কথাবার্তা ও আচার-আচরণে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। বারবার বলতে লাগলেন, “মেয়ে বাচ্চা’র মায়েরা যে কী লাকি! কিছু মনে করবেন না, আপনাদেরকে দেখলেই আমি খুব জেলাস ফিল করি …!”

আমি বললাম, “নাহ কিছু মনে করছি না। তবে কী জানেন আপু, ‘মেয়ে বাচ্চা’ বা ‘ছেলে বাচ্চা’ কেউই মায়ের পেট থেকে পড়েই, জেন্টেল আর রিজনেবল হয়ে যায় না! আপনি যেভাবে চাইবেন, মনে মনে ভাববেন, আপনার সন্তান তেমনই হবে। আমার মেয়ে না হয়ে, ছেলে হলেও তাকে কিন্তু এভাবেই মানুষ করতাম! আমার পছন্দ দুষ্টু, চঞ্চল এবং একই সাথে ভদ্র একটি বাচ্চা। …আমি যদি আমার বাচ্চাকে সময় দেই, তাকে পৃথিবী-প্রকৃতি নিজের হাতে চিনিয়ে দেই, আর সাথে সাথে বুঝিয়ে দেই তার কাছে আমি কী এক্সপেকট করি, তাহলে অবশ্যই সে আমার এক্সপেক্টেশনের কাছাকাছি পৌঁছাবে, (বড় কোনো অঘটন, দুর্ঘটনা বা ব্যতিক্রম ছাড়া)।

ভদ্রমহিলা একেবারেই মানলেন না আমার কথা। বললেন, “নাহ…ঠিক না! নাই তো ছেলেবাচ্চা, তাই বোঝেন না!” তখনই হঠাৎ আমাদের এক বন্ধু’র মেয়ে আসলো আমাদের আড্ডায়, কাঁদতে কাঁদতে। আসলো, ওই ভদ্রমহিলার ছেলের নামে নালিশ নিয়ে। তাঁর ছেলে (নামগুলো এখানে উল্লেখ করছি না) নাকি খেলনা কেড়ে নিয়েছে আচমকা। মেয়েটা প্রোটেস্ট করতেই ওই ছেলে নাকি তাকে আবার জোরে লাথিও দিয়েছে একটা!

ভদ্রমহিলা মেয়েটির মাথায় একটু হাত বুলিয়ে বললেন, “তুমি এইখানে বসে খেলো। ওর দিকে আর যেও না। ছেলেরা তো জানোই, দুষ্টু|” আর চুপ থাকতে পারলাম না! বললাম, “আপু, একটা কথা বলি? আপনি এখন যেই সমাধান দিলেন, ঠিক সেই কারণেই ‘ছেলেবাচ্চা’গুলো এমন হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন! আমার ছেলে যদি এরকম অন্যায় আচরণ করতো, তাহলে তাকেই আমার কাছে এনে বসিয়ে রাখতাম। আর মেয়েটিকে তার খেলনা ফিরিয়ে দিয়ে, খেলতে যেতে বলতাম!”

ফর্সা ভদ্রমহিলা রাগে কিংবা অপমানে কিংবা হয়তো এমনিতেই লাল হয়ে আমার দিকে তাকালেন। আমি একটু থেমে আবার বললাম, “সব বাচ্চাই তার নিজের ভালো লাগার বিষয় বা খেলনাটি নিজের করে পেতে চাইবে। চাইতেই পারে! কিন্তু মেরেধরে, অন্যেরটা কেড়ে তা পেতে পারে না! আমি যদি আমার বাচ্চাকে ভুলটা না বুঝিয়ে দেই, উল্টো তার সামনেই বলতে থাকি, ‘ছেলেরা তো এমনই! মেয়েদেরকেই বুঝে এবং সাবধানে চলতে হবে’, তাহলে ছেলেটা কিন্তু অমনই থাকবে। তার কোনো দোষ নেই। দোষ আমাদের প্রি-অকুপাইড ভাবনার!”

ভদ্রমহিলা আমার কথা নিতে পেরেছিলেন কিনা জানি না। তবে পাশেই বসা আমার একজন পূর্বপরিচিতা মিনমিন করে বললেন, “তুমি হয়তো ঠিকই বলেছো! তবে কী জানো, ‘ছেলেবাচ্চা’রা একটু মারপিট করেই।” আমি বললাম, “আপু আবারও বলছি, আপনার প্রি-অকুপাইড ধারণা আপনার বাচ্চাকে এফেক্ট করে। আপনি যদি তাদের সামনে বলেন, ছেলেবাচ্চারা এমন’ আর ‘মেয়েবাচ্চারা অমন’, তাহলে তারা সেটাই লালন করবে নিজেদের মাঝে।”

জানি না, স্বভাব-বিরুদ্ধ হয়ে কেন এমন জোরালো তর্ক করলাম সেদিন! শুধু জানি, প্রতি মুহূর্তে এমন ‘রেডিমেড বিশ্বাস’ আঁকড়ে চলা মানুষ দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। ‘ছেলেবাচ্চা’ বা মেয়েবাচ্চা’ নয়; জাস্ট ‘বাচ্চা’ হিসেবে বড় হচ্ছে, এমন তিনটি ছেলের কথা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে! ‘রেনে’, ‘ঋদ্ধ’ আর ‘ফাইয়াদ’| এদের নামে এখনো পর্যন্ত কেউ এ ধরনের (‘লাথি দিয়ে খেলনা কেড়ে নেয়া’ টাইপ) কমপ্লেইন করেছে, দেখিনি! কিংবা শুনিনি! তাই বলে, তারা যে খুবই শান্ত – তাও কিন্তু না! তারা চঞ্চল, দুষ্টু এবং দুরন্তপনার ওস্তাদ! মজার বিষয় হলো – তারা খেলনা হিসেবে যাই পেত, তাই নিয়েই খেলতে পারতো। বন্দুক আর গাড়ি নিয়ে তারা যেমন খেলেছে; তেমনি খেলেছে টেডি বিয়ার, কিচেন সেট, লেগো, রং-পেন্সিল নিয়েও! তারা ছবি এঁকেছে। মা-বাবার সাথে কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড করেছে। তারা তাদের বাবা-মা’র কাছ থেকে অনেক কিছুই পেয়েছে। শুধু ‘ছেলেবাচ্চা’ হিসেবে, যা ইচ্ছা তাই করবার লাইসেন্সটা তারা পায়নি!

একটু ভাবলেই কিন্তু বুঝতে পারি– আজ আমাদের যে ‘ছেলে শিশু’টি সংযত আচরণ শিখে বড় হবে, সে-ই কিন্তু পরিণত বয়সে এক আদর্শ জীবনসঙ্গী এবং পরবর্তীতে চমৎকার এক পিতা রূপে অধিষ্ঠিত হবে। নিদেনপক্ষে, কোনো কন্যার কান্না’র কারণ সে হবে না!

আমরা বাবা-মা’রাই পারি, মেয়েদের জন্য ক্রমশ নৃশংস হয়ে ওঠা পৃথিবীটা বদলে দিতে। নারী-পুরুষ, সবার একটি স্বাভাবিক মানবিক জীবন গড়তে! শুধু হৃদয় দিয়ে একবার বোঝা’র চেষ্টাটুকু করা চাই!!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 3.8K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3.8K
    Shares

লেখাটি ১১,৫৮৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.