সুন্দরীতমা আমার!

0

ফারজানা হুসাইন:

তোমরা যে বলো দিবস-রজনী

ভালোবাসা ভালোবাসা’— সখী,

ভালোবাসা কারে কয়!

খুব পছন্দের এই গান সোমলতার গলায় শুনতে শুনতে আর নিজে গুনগুনাতে পায়ের নখ রাঙাচ্ছিলাম এই মাঝরাত্রে। হঠাৎ মনে হোল যে স্বাধীনতা আর অধিকারকে আমি আমার প্রাপ্য বলে প্রতিদিন ভোগ করি, তার সবটুকুই কি নিজের যোগ্যতায় আমি অর্জন করেছি? নাকি গ্রহ নক্ষত্রের ফেরে আর সঠিক স্থানে, সঠিক সময়ে অবস্থানের জন্য অনেক কিছুই বিনা বাক্যব্যয়ে আমার হয়ে গেছে? আন্ডারলাইন করলাম সঠিক স্থান আর সঠিক সময়!

১. ছোটবেলায় মিনা কার্টুনে দেখেছি প্রতিবেলায় রাজু মিনার চেয়ে বেশি খাবার পায়, কারণ রাজু ছেলে। অথচ আফ্রিকার ছোট্ট দেশ মৌরিতানিয়ায় ছেলে সন্তানের চেয়ে মেয়েকে বেশি খাবার দেওয়া হয়। সেদেশে মেয়ে সন্তান শুধু বেশি খাবার পায় তাই না; কুসকুস, বাদাম, দুধ, খেজুরের মতো সুস্বাদু ও চর্বিযুক্ত খাবার দেওয়া হয় তাদের ছোটবেলা থেকেই।

এর পিছনের কারণটাও মজার বেশ।

আফ্রিকার আরো কয়েকটা দেশের মতো মৌরিতানিয়ায় মোটা মেয়ে মানেই সুন্দর, আর সম্ভ্রান্ত ঘরের বলে ধরে নেওয়া হয়। আর বিয়ের বাজারে মোটা মেয়ের কদর বেশি। সুতরাং শুধু বাড়িতে মেয়েদেরকে মোটাতাজা করার জন্য জোরপূবর্ক খাওয়ানো হয় তাই নয়, মৌরিতানিয়ার ওয়াইফ ফ্যাটেনিং ফার্মগুলোও বেশ জনপ্রিয়। এইখানে কোন মহিলার তত্ত্বাবধানে ছয় থেকে সাত বছরের কন্যা সন্তানকে বাবা-মা রেখে যায়। বাচ্চা মেয়েগুলোকে সকাল থেকে জোর করে খাওয়ানো শুরু হয় যা শেষ হয় রাতের বেলা। পরদিন আবারো সেই খাওয়া, আর কোন কাজই নেই ওদের। একেকটা বাচ্চা এভাবে খেয়ে খেয়ে ৬০ থেকে ১০০ কিলো পর্যন্ত ওজন পুট অন করে। তবেই না সে পাত্রপক্ষের চোখে সুন্দর!

মৌরিতানিয়ায় মেয়েদের উপর করা এই টর্চারটিকে মধুর বচনে বলা হয়, যে মেয়ে যতটা মোটা, সে তার স্বামীর হৃদয়ের ততখানি জায়গা জুড়ে থাকে! সরকার আর ইউএন এর হস্তক্ষেপে এখন এই ওয়াইফ ফ্যাটেনিং নামের টর্চার বা নির্যাতন কিছুটা কমেছে, যদিও প্রতি দশজনের একজন মেয়ে এখনো এই নিষ্ঠুরতার শিকার হয়।

২. নানী-দাদীদের তো বটেই, আমাদের মায়েদের সময়েও কোথাও কোথাও বিয়ের আগে পাত্রীকে পায়ের পাতায় রং মেখে হাঁটিয়ে দেখা হতো। কিছুদিন আগে চীনের শেষ কিছু লোটাস ফিটের অধিকারিণীর পায়ের ছবি দেখছিলাম। লোটাস ফিট মানে পা যেন পদ্মের মত সুন্দর। সবার তো ছোটখাটো সুন্দর পা হয় না, তবে চীনের বিখ্যাত লোটাস ফিট তৈরি করা যেত। কোন এক নতর্কীর রেশমের ফিতে বাঁধা পায়ের নাচ দেখে মুগ্ধ হলেন এক চৈনিক রাজা। সেই মুগ্ধতা থেকে পরবর্তিতে তার রানীদের পা ভেঙে লোটাস ফিট করা হয়, সেখান থেকে সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়েদেরকেও যেতে হয় ফুট বাইন্ডিং প্রসেসের মধ্য দিয়ে। দ্যাট ওয়াজ সো ইন ফ্যাশন!

ছোট ছোট মেয়েদের পায়ের বুড়ো আঙুলকে বাঁকিয়ে পায়ের পাতার হাড় ভেঙে সিল্কের ছোট্ট জুতোর মধে্য পা ঢুকিয়ে রাখা হতো। এই পদ্ধতিকে বলা হয় ফুট বাইন্ডিং। লোটাস ফিটের সবোর্চ্চ দৈর্ঘ্য হতে পারতো তিন (৩) ইঞ্চি! এতে করে অধিকাংশ লোটাস ফিটের অধিকারিণী পরবর্তীতে আর হাঁটাচলা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন কাজকর্মও করতে পারতো না ঠিকমতো। তাতে কী? বিয়ের পাত্রী হিসাবে লোটাস ফিটের অধিকারিণীর কদর ছিল সবার কাছে। প্রায় ১০০০ বছর ধরে এই জঘণ্য নিষ্ঠুরতার বলি হয়েছে চীনের মেয়েরা শুধুমাত্র ভালো বিয়ে হবার জন্য। ১৯১২ সালের দিকে মানে মাত্র একশ বছর আগে এই ফুট বাইন্ডিং প্রথা বন্ধ হয়।

বিঃদ্রঃ ক. আমার ওজন মধ্য পঞ্চাশের আশেপাশে আটকে আছে বহু বছর ধরে। আয়নায় মাত্র নিজের কণ্ঠার হাড়ের অট্টহাস্য দেখে সঙ্গে সঙ্গে গুগলে খোঁজ করলাম। একজন পূণর্ঙ্গ পুরুষের হৃদপিণ্ডের ওজন মাত্র ২৫০-৩৫০ গ্রাম, দৈর্ঘ্য ১২ সে মি, প্রস্থ ৮ সে মি ও ব্যাপ্তি ৬ সে মি।

খ. আমার পায়ের প্রসঙ্গে আর না বলি কিছু। ছয় নম্বর জুতা অনায়াসে পায়ে গলিয়ে নির্দ্বিধায় বাড়ি থেকে বের হয়ে যাই। পায়ের নখ নিজে কাটতে পারি না, তাই প্রায়শই কোণা ভাঙা, উল্টে যাওয়া, নীলচে নখ নিয়ে ঘুরে বেড়াই। তাই সুন্দর নর না খুঁজে নরসুন্দরকেই বেশি খুঁজি আমি।

আবারো সোমলতার গানে ফিরে আসি…

আমার মতন সুখী কে আছে।

আয় সখী, আয় আমার কাছে

সুখী হৃদয়ের সুখের গান

শুনিয়া তোদের জুড়াবে প্রাণ।

লেখকঃ ফারজানা হুসাইন, আইনজীবী, গবেষক, ব্লগার ও এ্যাক্টিভিস্ট।

ই-মেইলঃ [email protected]

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 351
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    351
    Shares

লেখাটি ২,৩৪৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.