শিক্ষিত গৃহিণী মায়ের অাত্মত্যাগ…

0

অনন্যা নন্দী:

কল্পনা অনার্স পড়েছে উদ্ভিদ বিজ্ঞানে। পাস করার সাথে সাথেই বিয়ে হয়ে যায় একজন সরকারি চাকরিজীবী ছেলের সাথে।স্বামীর বদলির চাকরি, তাই তাকে থাকতে হয় শ্বশুরবাড়িতে। স্বামী জেলায় জেলায় ঘুরতে থাকে, কিন্তু তাকে ব্যস্ত থাকতে হয় সংসার নিয়ে। ছেলেমেয়ে, শ্বশুর-শাশুড়ি এবং ননদের সব দায়িত্ব তার। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তার সংসার সামলাতেই কেটে যায়। তাই অার চাকরি করা হয়ে উঠে না। ইদানিং ফেসবুকে তার কর্মজীবী বান্ধবীদের হাসিমাখা ছবি দেখলেই চোখের জল গড়িয়ে পড়ে। বেচারির তখন এতো পড়ালেখা বৃথা মনে হয়।

উপরের কাহিনীটি অামাদের দেশের অত্যন্ত পরিচিত ঘটনা।
বহু মেয়েই কল্পনার মতো নিজের “বৃথা শিক্ষা”র গ্লানি নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। বিশ্ব এগিয়ে গেলেও অামাদের দেশের এই দৃশ্যপট পরিবর্তন হচ্ছে না। একটা সংসার তো স্বামী-স্ত্রী দু’জনেরই সমান দায়িত্ব। তবে কেন অাত্মত্যাগটা কেবল মেয়েদের কাছ থেকে চাওয়া হয়?
ছেলেদের কখনও কেন বলা হয় না, “তুমি এই ধরনের চাকরি করলে তোমার বাচ্চাদের কে দেখবে?”
কিন্তু মেয়েদের বেলায় এইটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারন অলিখিতভাবে এটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে যে এটা মেয়েদের দায়িত্ব।
কিছু কিছু পরিবার ছেলে ভাল চাকরি করলেও বৌদের চাকরি করতে দেয়া হয় না। অনেক ভেবেও বরের ভাল চাকরির সাথে বৌয়ের চাকরি না করার যোগাযোগটা বুঝতে পারলাম না। যুগ যুগ ধরে এই রীতি চলে অাসছে, শৃঙ্খল ভাঙার প্রয়াস মাঝে-মধ্যে দেখলেও এর ফলাফল হয় ভয়াবহ।
সবচাইতে দুঃখ লাগে তখন, যখন দেখি এই শিক্ষিত গৃহিণী মায়েদের অাত্মত্যাগ অামাদের চোখেই পড়ে না। কেবল দায়িত্ব বলে এই ত্যাগ সবার কাছে স্বীকৃত। যে শ্রম একজন মেয়ে তার সংসারকে দেয়, তার মূল্যায়ন অামাদের কাছে কেবল “দায়িত্ব” নামক শব্দে বাঁধা।
বাংলাদেশের সমাজ কেন জানি মেয়েদের এই অাত্মত্যাগকেই স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখে। কখনও কাউকে উচ্চবাচ্য করতে দেখলাম না। অামরা কেন স্বামীদের বলি না, “তোমার ক্যারিয়ারের মতো অামার ক্যারিয়ারও গুরুত্বপূর্ণ। তাই তুমি যতটা সময় দিবে সংসারকে, অামিও ঠিক ততোটা সময় দিব।” জানি শুরুর দিকে অনেক সমস্যা হবে কিন্তু স্বামী-স্ত্রী দু’জন মিলে কী একটা পরিবার ভালভাবে চালানো যাবে না?
এই সমাজ শিক্ষিত গৃহিণীদের কখনও মূল্যায়ন করবে না, তাদের অাত্মত্যাগকে কেবল “দায়িত্ব” বলে চাপিয়ে দিবে। তাই শিক্ষিত গৃহিণী মায়েদের এই রীতি থেকে বের হয়ে অাসতে হবে। তাদের বলতে হবে, “অামরা পড়াশুনা করে কেবল সংসার সামলাবো না। অামাদের ক্যারিয়ার অামাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। “
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.